অজানা পথে – ৩২ : টিলাগড়ে আর কত মায়ের বুক খালি হবে ? – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

অজানা পথে – ৩২ : টিলাগড়ে আর কত মায়ের বুক খালি হবে ?

প্রকাশিত: ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২০

অজানা পথে – ৩২ : টিলাগড়ে আর কত মায়ের বুক খালি হবে ?

লতিফ নুতন
আবার মায়ের কুল খালি হল টিলাগড়ে। সন্ত্রাসের জনপদ মৃতুপূরী টিলাগড়ে আর কত লাশ হবে। বাবা হবে ছেলে হারা, মা হবে সন্তান হারা, ভাই বোন হবে ভাই হারা। পাড়া প্রতিবেশী হবে প্রতিবেশী হারা। টিলাগড় আর কত লাশ হবে? প্রশাসনের ভূমিকা নিরব কেন? ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরাজমান দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে কত মায়ের কূল খালি হবে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের গড়ফাদাররা নিরাপদে। দলীয় পরিচয় থাকায় কি গড়ফাদারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। সর্বশেষ সদ্য শেষ হওয়া সরস্বতী পূজায় কথা কাটিকাটির জের ধরে টিলাগড়ে বিবাদমান আওয়ামী লীগ নেতা রঞ্জিত গ্রুপের দুইটি গ্রুপের আধিপত্য বিস্তার কে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় সিলেট নগরীর টিলাগড়ে অভিষেক দে দ্বীপ নামের ছাত্রলীগ কর্মী খুন হল গত বৃহস্পতিবার ২০২০ইং। পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সৈকত রায় সমুদ্র (২২) নামের এক ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত অভিষেক দে দ্বীপ নামের ওই কর্মী গ্রীনহিল স্টেট কলেজের ছাত্র। সে নগরীর শিবগঞ্জ সাদীপুর এলাকার দীপক দে’র ছেলে। জানা যায় বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে টিলাগড়ে আরেক ছাত্রলীগ কর্মী সৈকতের নেতৃত্বে ৩-৪জন যুবক দ্বীপ ও তার সাথে থাকা সহকর্মী শুভর উপর উপর হামলা চালায়। এসময় দ্বীপকে ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যায় তারা। আশংকাজনক অবস্থায় সিলেট এমএজি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দ্বীপকে মৃত ঘোষণা করেন। গত সরস্বতি পূজার সময় গোপালটিলায় একই সংঘের সাথে পূজা উদযাপন করে দ্বীপ ও সৈকত। কিন্তু পূজার পরে আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে সৃষ্টি হয় দ্বন্ধ। পরে আয়-ব্যয়ের হিসাব থেকে সৃষ্ট এ দ্বন্ধ গড়ায় সিনিয়র-জুনিয়রে। গত কয়েকদিন ধরে তাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কয়েক দফা সমস্যা হয়েছে। এরই সুত্র ধরে বৃহস্পতিবার রাতে মারামারিতে জড়ায় দু’পক্ষ। এসময় সৈকত ও তার সাথে থাকা কয়েকজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে দ্বীপ ও শুভর উপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় দ্বীপকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তাক মৃত ঘোষণা করেন। দ্বীপের লাশ ময়না তদন্তের জন্য ওসমানী হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়না তদন্ত শেষে রিপোর্ট ও পরিবার থেকে এজাহার পেলে পরবর্তি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে হবে পুলিশের বক্তব্য। বক্তব্য দিলে হবে না টিলাগড়ে একের পর এক লাশের মিছিল বন্ধ করতে হবে। রাজা গৌড়গোবিন্দের গড়ের টিলা থেকে ‘টিলাগড়’ এলাকার নামকরণ। সিলেট নগরের একটি উপকণ্ঠ। সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের মোড়। এক পাশে রয়েছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমসি কলেজ ও সরকারি কলেজ। অপর পাশে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য টিলাগড় এলাকার রয়েছে শিক্ষার্থীদের মেসবাড়ি। অন্তত ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর বসবাস এখানে। টিলাগড় ঘিরে ছাত্র সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা নতুন কিছু নয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিনে অস্ত্রের মহড়ার জের ধরে ছাত্রলীগ কর্মী তানিম খান হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ঘটেছে আরও তিনটি হত্যাকান্ড। সিলেট নগরের টিলাগড় কেন্দ্রিক ছাত্রলীগের এক পক্ষে সক্রিয়তা ছিল তানিমের। তানিম হত্যাকান্ডের জন্য নগর আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক, সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজাদুর রহমানের অনুসারী ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দায়ী করা হয়েছিল। এরপূর্বে মণিপুরি ছাত্র উদয়েন্দু সিংহ ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এমসি কলেজের গণিত বিভাগের ছাত্র উদয়েন্দু মুক্তিযোদ্ধা বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন। ২০১০ সালের ১২ জুলাই দুপুর বেলা তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করেছিলেন ছাত্রলীগেরই একদল কর্মী। একের পর এক ঘটনা ঘটেছে টিলাগড়ে। সূত্রপাত এমসি ও সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসের আধিপত্য নিয়ে। টিলাগড়ে ছাত্রলীগ খুব শক্তিশালী। যেখানে তানিম খুন হন, সেই একই স্থানে একই বছরের ১৬ অক্টোবর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়া ছাত্র ওমর মিয়াদ খুন হন। ওমর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ পক্ষের কর্মী ছিলেন। হিরণ জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রণজিৎ সরকারের অনুসারী। ১৩ সেপ্টেম্বর টিলাগড়ে ছোট ভাইকে জিম্মি করে বড় ভাই জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুমকে শিবগঞ্জে এনে হত্যা করা হয়। মাসুম ছাত্রলীগের ‘সুরমা গ্রুপ’–এর কর্মী ছিলেন। উদয়েন্দু সিংহ, জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম, ওমর মিয়াদ,তানিম খান সর্বশেষ দ্বীপ হত্যাকান্ড ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দলের শিকার। সহ পাঁচ খুনের স্থান একটি এবং খুনিও একই বলে মন্তব্য করলেন টিলাগড়ের অনেক বাসিন্দা। অনেকে বলেন বলেন, ‘আক্ষেপ একটাই, পুলিশ স্থান আর লোকগুলোকে চেনার পরও গ্রেপ্তার করতে পারে না। এ জন্য একের পর এক হত্যা, সন্ত্রাসও থামছে না টিলাগড়ে।’ খুন ছাড়াও অস্ত্রবাজির ক্রমিক ঘটনাও ঘটেছে টিলাগড় এলাকায়। ২০১৩ সালের ১৯ মে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার ছবি ২০ মে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে সংবাদ ছাপা হয়। এরপর ২০১৬ সালের ৭ মার্চ আরেক দফা অস্ত্রবাজি হয়। সেই অস্ত্রধারীরা শনাক্ত হয়নি প্রায় দুই বছরেও। গত বছরের ২রা জুলাই নগরীর খাদিমপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা অ্যাডভোকেট আফছর আহমদ ও জাহাঙ্গীর আলমের অনুসারীদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী রুহিত বাহিনী পুলিশের উপর গুলিবর্ষণ ,হামলা ও ভাংচুর করে। শাহপরান এলাকায় সংঘর্ষেও জের ধরে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে পুঙ্গত্ব নিয়ে বেঁচে আছে আজিজ আহমেদ আদিত । সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ এ অবিস্থিত শাহিন স্কুল এন্ড কলেজের ৮ম শ্রেণী ছাত্র । সিলেট সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ইউনিয়ন এর মেজরটিলা এলাকায় পিতা আফজল আহমদের ছেলে তার চাচা যুবলীগ খাদিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট আফছর আহমেদ। যুবলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দল নিয়ে বিরাজমান যুবলীগ নেতা রুহিত বাহীনীর হাতে স্কুল ছাত্র আদিত পুঙ্গ। আদিত রাজনীতি করে না। ঐদিন শহরতলীর শাহপরাণে যুবলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৪ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায় মামলা দায়ের করে পুলিশ। এতে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমসহ ৩৬ জনকে আসামী করা হয়। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি টিলাগড়, মেজরটিলাসহ প¦ার্শবর্তী এলাকায় বার বার খুনাখুনী কবে বন্ধ হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহীনীকে আরো কঠোর হতে হবে। টিলাগড়ে আওয়ামীলীগে বর্তমানে দুটি গ্রুপ বিরাজ করছে। একটি গ্রুপে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কাউন্সিলর নগর আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুর রহমান অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রঞ্জিত সরকার। দ্বীপ হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে রঞ্জিত গ্রুপের উপ গ্রুপের জন্ম হয়েছে। টিলাগড় বাসী শান্তি চায় সংঘাত নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হস্তক্ষেপ না করলে আর টিলাগড় লাশের মিছিল বন্ধ হবে না। প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। লাশের মিছিল বন্ধ হউক। সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল