অজানা পথে- ৩৪: সিলেটে ২৯ বছরে ২৮ ছাত্রদল নেতা খুন, আজও বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

অজানা পথে- ৩৪: সিলেটে ২৯ বছরে ২৮ ছাত্রদল নেতা খুন, আজও বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে

প্রকাশিত: ৯:১৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

অজানা পথে- ৩৪: সিলেটে ২৯ বছরে ২৮ ছাত্রদল নেতা খুন, আজও বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে

লতিফ নুতন:
ছাত্রদল মানে সন্ত্রাস,৯১ থেকে ৯৬ সাল আর ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল সিলেট ছিল সন্ত্রাসের নগরী সিলেট শহর। ছাত্রলীগ কে অনেক মোকাবেলা করতে হয়েছে। তৎকালীন ছাত্রলীগের সূর্য সন্তানরা জীবন বাজী করে সিলেটে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত করেছে। তৎকালীন সময়ে ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে ছাত্রলীগের জন্য কাজ করেছি। সে সময়কার কথা মনে হলে আজ শিয়রে কাঁপন ধরে। কিন্তুু আজ সিলেটে ছাত্রদল নিরাপদ। ৯১ থেকে ৯৬ সাল আর ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল আমাদের প্রাথমিক মৃত্যু হয়েছে গেছে। বর্তমানে আল্লাহ’র ভরসায় অবসর জীবন নিয়ে বেঁচে আছি। গত ২৯ বছরে সিলেটে ২৮ ছাত্রদল নেতা খুন হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আরিফুল হক চৌধুরীর বিজয় মিছিল শেষে নিজ দলের কর্মীদের হাতে খুন হন মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-প্রচার সম্পাদক ফয়জুল হক রাজু। একই বছরে ছাত্রদলের প্রতিষ্টা বার্ষিকীর মিছিলে ব্যানারের আগে যাওয়া নিয়ে সিনিয়র জুনিয়র দ্বন্ধে নিহত হন মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হাসনাত শিমু।

ছাত্রদলের রাজনীতি করতে গিয়ে সিলেটে গত ২৯ বছরে ২৮ জন নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। কেউ খুন হয়েছেন নিজ দলের কোন্দলের কারণে আবার অনেকে ছাত্রলীগ ও ছাত্র শিবিরের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। তবে বেশীরভাগ নেতাকর্মী খুন হয়েছেন নিজ দলীয় ক্যাডারদের হামলায়। একটি হত্যাকান্ড হলেও বিচার হয়েছে মাত্র। আজকাল নিহত পরিবার পরিজনের সাথে কথা বললে নিহত কয়েকজন ছাত্রদল নেতার পরিবারের আক্ষেপ করে বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে নিহত হলেও দলের কেউ খোঁজ নেয় না পরিবারের। কিংবা মামলায় সহায়তা করতে দলের সিনিয়র নেতাদের সহযোগিতা না পাওয়ায় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত সিলেটে ছাত্রদলের কেউ খুন হননি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথম খুন হন সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্রদল নেতা মাহবুব। এ হত্যাকান্ডের জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করা হয়। ৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সিলেটের জাসদ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী বিরাট অংশ ছাত্রদলে যোগদানের পর সিলেটে শুরু হয়েছিল হত্যাকান্ড। সে সময় ঘন ঘন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত। সৃষ্টি হয়েছিল ছাত্রদলে একাধিক গ্রুপ। শক্তির জানান দিতে তারা প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাদের সহিংস তৎপরতায় নগরবাসী থাকতেন টেনশনে। সিলেটে এখনো ছাত্রদলের একাধিক গ্রুপ রয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলের অভ্যন্তরীন কোন্দলের কারণে সংঘর্ষের ঘটনা কমে এলেও খুন হয়েছেন একাধিক নেতাকর্মী।

এর আগে ২০১৩ সালের ২৭ জুলাই নগরীর পাঠানটুলায় গোবিন্দগঞ্জ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাবেক নেতা জিলু হত্যার শিকার হন নিজ দলের নেতাকর্মীদের হাতে। ২০১২ সালের ২২ মার্চ ছাত্রদলের অভ্যন্তরীন কোন্দলে নিহত হন ছাত্রদল নেতা মাহমুদ হোসেন শওকত। একই বছরে নিজ দলের নেতাকর্মীদের হামলায় মারা যান ছাত্রদল নেতা মেহরাব সিদ্দিকী সজিব।

দশম শ্রেণীর ছাত্র সৌরভ আহমদ খুন হন ২০১০ সালে। নগরীর উপশহরে ছাত্রদলের একটি গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের বলি হয় সে। মা বাবার একমাত্র পুত্র সৌরভকে হারিয়ে পরিবারের মাঝে এখনো চলছে শোকের মাতম। ওই বছরের ৬ মে নগরীতে অভ্যন্তরীন কোন্দলে মারা যান ছাত্রদল কর্মী সাজু আহমদ। ২০০৫ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণে খুন হন ছাত্রদল নেতা এনাম আহমদ। তিনি তৎকালীন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি এমরান আহমদ চৌধুরী গ্রুপের সমর্থক ছিলেন। মিজান গ্রুপের নেতাকর্মীদের হামলায় এনাম নিহত হন।

এনাম হত্যার দায়ে ৫ জনের কারাদন্ড হয়েছিল। একই বছরের ১৪ জুলাই দলের অভ্যন্তরীন কোন্দলে মারা যান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতা লিটন আহমদ। ২০০৪ সালে বিএনপি জামাত সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে শিবির ক্যাডারদের হামলায় সিলেট ভেটিরিনারি কলেজ ছাত্রদল নেতা রফিকুল ইসলাম সোহাগ নির্মমভাবে খুন হন। ৩১ আগস্ট এ খুনের পর সিলেট ছাত্রদল ও শিবিরের মাঝে অভ্যন্তরীন সম্পর্কে ফাটল ধরে। ঠিক আগের বছর নগরীর কলবাখানী এলাকায় ছাত্রদলের দু’ গ্রুপের বন্ধুক যুদ্ধে নিহত হন ছাত্রদল নেতা সাহাদ আহমদ।

সবচেয়ে বেশী খুন হয় ২০০২ সালে। এ বছরে ৩ ছাত্রদল নেতা খুন হন। ৯ সেপ্টেম্বর মদন মোহন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রদল কর্মী আব্দুল হামিদ খান দোয়েলকে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে খুন করে ইসলামী ছাত্র শিবির। একই বছরের ২৮ জুলাই সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ গেটে জাহাঙ্গীর শামিম নামের এক ছাত্রদল নেতাকে খুন করে শিবির ক্যাডাররা। এক বছরের মাঝে শিবিরের হাতে দুই ছাত্রদল নেতার খুনের ঘটনায় সিলেটের রাজিনীতিতে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০০২ সালের ২৭ জানুয়ারি ছাত্রলীগের হাতে নিহত হন ছাত্রদল নেতা মুমিন। বাসা থেকে ডেকে বের করে মদন মোহন কলেজ ছাত্রদল নেতাকে খুন করা হয়।

২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলের অভ্যন্তরীন কোন্দলে প্রাণ হারান ছাত্রদলের ২ কর্মী। ১০ অক্টোবর ফখরুল ইসলাম ও ৩ মে আব্দুল হালিম নামের এক ছাত্রদল কর্মী মারা যান নিজ দলের নেতার হাতে। ১৯৯৯ সালে ৩ জন ছাত্রদল নেতা খুন হন। নভেম্বর মাসে নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় খুন হন ঝুটন মজুমদার নামের এক ছাত্রদল নেতা। ঠিক ২ মাস পূর্বে জগলু নামে ছাত্রদল কর্মী নিহত হন। জগলু হত্যাকান্ডের জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করা হয়। আর আগস্ট মাসে গ্রুপিং দ্বন্ধে মারা যান ছাত্রদল নেতা বকুল ধর।

ছাত্রলীগের সাথে সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা রহুল আমিন মারা যান ১৯৯৭ সালে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথম খুন হন এমসি কলেজ ছাত্রদল নেতা বাবুল আহমদ রাহী খুন। রাহী হত্যাকান্ডের জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করা হয়। মূলত রাহী তাদের অভ্যন্তরীন কোন্দলে মারা যায়। ১৯৯৫ সালের ২১ নভেম্বর এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে দলের অভ্যন্তরীন কোন্দলে প্রাণ হারান ছাত্রদল নেতা মুহিন খান। একই বছরের নিজ দলের কর্মীদের হাতে খুন হন ছাত্রদল নেতা মুরাদ চৌধুরী সিপার।

১৯৯৪ সালে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীন কোন্দলে সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকান্ড ঘঠে। ছাত্রদলের অভ্যন্তরীন কোন্দলের বলি হন শহর ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক এনামুল হক মুন্না। ১৯৯৩ সালের ২৩ মে সিলেট সরকারি কলেজ গেটে নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় নিহত হন ছাত্রদল নেতা দুলাল। ৯২ সালে সিলেটের বিশ্বনাথে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীন কোন্দলে প্রাণ হারান বিধান নামের এক কর্মী। আজও বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। ছাত্রদল কূল হারা কলনকিনি। সকল হত্যাকান্ডের বিচার চাই। আর চাই না কোন মায়ের কূল খালি হউক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল