অজানা পথে – ৪৭ : আমার গ্রাম মছকাপুর – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

অজানা পথে – ৪৭ : আমার গ্রাম মছকাপুর

প্রকাশিত: ৭:৩১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০

অজানা পথে – ৪৭ :  আমার গ্রাম মছকাপুর

লতিফ নুতন

আমার গ্রাম সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ৩ নং ফুলবাড়ী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের হেতিমগঞ্জ বাজারের সন্নিকটে মছকাপুর। মছকাপুর গ্রাম ঐতিহ্যে ভরপুর। বলতে পারি মছকাপুর গ্রাম নিয়ে গর্ব করতে পারি। ওলি,আলিম,ওলামা,শিক্ষক,পাইলট,চেয়ারম্যান মুক্তিযুদ্ধা,প্রবাসী,রাজনীতিবিদ এলাকা নিয়ে গ্রামটির ঐতিহ্য রয়েছে।

মছকাপুর গ্রামে উত্তর পাড়া,দক্ষিন পাড়া,মাইজপাড়া,জায়ফরপুর,মশাহিদ হাঠি,নিজতফা নামে নানা মহল্লা রয়েছে। অনেক দিন ধরে ভাবছি অজানা পথে আমার গ্রাম নিয়ে লিখবো। অনেকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন।

পীর এ কামিল আতাহারিয়া আঠারো সৈয়দ যেখানে শায়িত মছকাপুর গ্রামের মরহুম মাওলানা লুৎফুর রহমান,মরহুম মাওলানা এখলাসুল মোমিন,মাওলানা জয়নাল আবেদীন কঠাই মিয়াকে শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করিছি।

মছকাপুর গ্রামে ঐতিহ্যবাহী আতহারিয়া স্কুল এন্ড কলেজ, হেলি মিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়,আতহারিয়া ফযলে জলিল মাদ্রাসা,তিনটি মসজিদ ঈদগাহ,ঐতিহ্যবাহী ডামপালের বন্দ। ডামপালের বন্দে রয়েছে কয়েক শত জমি। প্রবাসী অধ্যাষুত এলাকা হিসাবে পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন অসংখ্য প্রবাসী। সেখানে শেষ নেই। দেশের রেমিটেন্স যুদ্ধা আর রাজনীতি,ব্যবসার সাথে জড়িত থেকে সুনামের সাথে আমার মছকাপুর বলতে গর্বিত মনে হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে মছকাপুর গ্রামকে পিছিয়ে ফেলা যাবে না। আর অনেক রেমিটেন্স যুদ্ধারা দেশের টাকা দিয়ে ভরপুর করে রেখেছে। বিভিন্ন দেশে রাজনীতির সাথে অনেকে সক্রিয় ভাবে জড়িত।

প্রথমে শুরু করি মছকাপুর গ্রামের উত্তরপাড়া অর্থ্যাৎ আমার পাড়া নিয়ে। এই পাড়ায় অনেক রত্নগর্ভা মায়ের সন্তান জন্ম হয়েছে। গ্রামের প্রথম বাড়ীটি হচ্ছে আমাদের বাড়ী। আমার দাদা মরহুম হাজী আব্দুল ওয়াহিদ ছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী,কিছু দিন জাহাজে কাজ করেছেন। দাদার চাচাতো ভাই মরহুম ফুরকান আলী ছিলেন গোলাপগঞ্জের একজন সুনামধন্য সালিশ ব্যক্তিত্ব। তার সুযোগ্য সন্তান মরহুম আহমদ হোসেন সুয়াই মিয়া ছিলেন বাংলাদেশ বিমানের পাইলট স্কুলের প্রশিক্ষক। আমার চাচাতো ভাই পাইলট সেলিম বাংলাদেশ বিমান থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের বিমানে কাজ করেছেন। বর্তমানে অবসর জীবনে আছেন। মরহুম আহমদ হোসেনের পরিবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আছেন। মরহুম ফুরকান আলীর মেজ ছেলে মরহুম হাজী মাহমুদ হোসেন ছানু মিয়া ছিলেন একজন রাজনীতিবীদ। দীর্ঘ ৩৩ বছর গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি’র দায়িত্ব পালন করেছেন। মরহুম ছানু মিয়া তিনি শুধু বঙ্গবন্ধু’র আদর্শের একজন সৈনিক ছিলেন না তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। মছকাপুর গ্রাম থেকে ফুলবাড়ী ইউনিয়নের প্রথম চেয়ারম্যান হন মরহুম ফুরকান আলীর ৪র্থ পুত্র এমদাদ হোসেন টিপু। এমদাদ হোসেন হোসেন টিপু তিনি শুধু টিপু চেয়ারম্যান নন তিনি একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। সিলেট জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ও অবশেষে মহানগর যুবদলের সভাপতি’র দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি লন্ডনে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন। মরহুম ছানু মিয়ার প্রথম পুত্র এমরান হোসেন ন্যাদালেন্ড আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি’র দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্র জীবনে তিনি মদন মোহন বিশ্ব বিদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগ ও সিলেট জেলা ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। আমার দাদা হাজী মরহুম আব্দুল ওয়াহিদ যুক্তরাজ্য প্রবাসী থাকলেও আমার চাচারা সবাই সামাজিক ভাবে প্রতিষ্টিত। আমার পিতা মরহুম আবুল হোসেন ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগ করতেন। এক সময়ে ছিলেন বিদুৎ উন্নয়নের প্রৌকশলী পরবর্তী যুক্তরাজ্য স্থায়ী ভাবে দীর্ঘ ৪০বছর বসবাস করেন। মরহুম হাজী আব্দুল ওয়াহিদের বড় পুত্র মরহুম কমরেড আনোয়ার হোসেন ছিলেন একজন বাম রাজনীতিবীদ। ভাসানী ন্যাপ,ছাত্র ইউনিয়ন,সাম্যবাদী দল করেছেন। তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংঘঠক। সিলেট জেলা অটো রিক্স্রা শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্টাতা সাধারন সম্পাদক ও এক প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা। আমার চাচা হোসেন আহমদ বাচ্চু মিয়া দীর্ঘ দিন ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে অবসরকালীন সময়ে জীবন যাপন করছেন। আমার চাচা হাজী আতাউর রহমান একজন রাজনীতিবীদ,সমাজসেবী দীর্ঘ দিন প্রবাস জীবন শেষে দেশে অবস্থান করছেন। ছোট চাচা এডভোকেট কবির আহমদ বাবর সিলেট জেলা বারের একজন সুনামধন্য আইনজীবি। জেলা বারের নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছেন। আমার ভাই গোলাম রব্বানী কানন যুক্তরাষ্টে ব্যবসা করছেন। একজন রেমিটেন্স যোদ্ধা। অপর ভাই গোলাম মোস্তফা লিমন উচ্চ শিক্ষা নিয়ে স্বপরিবারে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন একজন সফল ব্যবসায়ী ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার। ছোট ভাই গোলাম রসুল ইমন একজন আইটি ইঞ্জিনিয়ার। আমার দাদার চাচাতো ভাই কুটু মিয়া সারেং পাকিস্থান আমলে জাহাজে চাকুরী করেছেন। আমার দাদার চাচাতো ভাই নেওয়ার আহমদ মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংঘঠক। তিনির ভাই মরহুম ফারুক আহমদ বিভিন্ন চা বাগানে নিষ্টার সাথে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এখন বলতে হয় আরো কথা উত্তরপাড়ার মরহুম আব্দুস সত্তারের পুত্র আনোয়ারুল মোমিন জাহাঙ্গীর আতহারিয়া হাই স্কুলে দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা করেছেন। আরেক পুত্র মরহুম জয়নাল আবেদীন বিআইডিসিতে দীর্ঘ চাকুরী করেছেন। দীর্ঘ দিন তিনি প্রবাস জীবনে একজন রেমিটেন্স যুদ্ধা ছিলেন। একই বাড়ির আব্দুল ওদুদ দুদু মিয়া অবসরপ্রাপ্ত বিডিআরের সুবেদার ছিলেন। গ্রামের অন্যতম সালিশ ব্যক্তিত্ব আব্দুর রউফ ফুরুক মিয়া সরকারী চাকুরী করে প্রবাস জীবন শেষে অবসর কালীন জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি’র ভাই মরহুম আব্দুর রব মুটুক প্রখ্যাত ন্যাপ নেতা ছিলেন। তাদের চাচাতো ভাই মরহুম ডাঃ নজরুল ইসলাম নজিব আলী এলাকার স্বাস্থ্য সেবায় অবদান রেখে গেছেন।

আমাদের পীরের বাড়ী একটি ঐতিহ্যবাহী বাড়ী শাহ সিকন্দর আলী পীর ও শাহ ফরমুজ আলী পীর এই দুই ওলি আমাদের গ্রামে শায়িত। পীরের বাড়ীর মরহুম ফয়জুর রহমান,মরহুম আলতাফুর রহমান,মরহুম হাবিবুর রহমান জাহাজে চাকুরী করতেন। পীরের বাড়ীর মরহুম পীর জিয়া উদ্দিন ন্যাপ নেতা ও শিক্ষকতা করতেন। জিয়া উদ্দিন স্যার বললে সবাই এক নামে পরিচিত। এই বাড়ীর মরহুম নোমান উদ্দিন একজন সুনামধন্য ব্যাংকার ছিলেন। এছাড়া মরহুম জালাল উদ্দিন পুলিশ বিভাগে আর মরহুম গৌছ উদ্দিন সিএন্ডবিতে,মরহুম সাহাব উদ্দিন,মরহুম মঈন উদ্দিন,আলা উদ্দিন সরকারী চাকুরী করতেন। বিশিষ্ট সালিশ ব্যক্তিত্ব আনসার আহমদ লখন একজন সফল ব্যবসায়ী। ছোট ভাই সরওয়ার জাহান সুজন আর মাহমদ জাহান সুমন উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন।

আমাদের খাঁর বাড়ী। বলতে মাইজপাড়া। গোলাপগঞ্জের তথা আমাদের গ্রামের সালিশ ব্যক্তিত্ব মরহুম জহুর উদ্দিন খান জরিফ আলী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সফল সংঘঠক। তারই পুত্র আব্দুল গফফার খান উনু মুক্তিযুদ্ধের একজন সংঘঠক,সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য,নগরীর ১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশ নিলেও তিনি সাটিফিকেট নেননি। রাজনীতিবীদ উনু ভাই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য তার বন্ধু বান্ধবকে নিয়ে অংশ নেন একজন সংঘঠক হিসেবে। মরহুম জহির উদ্দিন খান জরিফ আলী ছিলেন যুদ্ধকালীন সময়ে গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক। তিনির পুত্র আব্দুল আহাদ খান পুলিশ বিভাগে চাকুরী করতেন। তিনির পুত্রদের মধ্যে আবু নাসের খান জামাল মিশিগান আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি,অপর পুত্র এনামুল হক খান নেফা সিলেট জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন বর্তমানে যুক্তরাজ্য বাহিংহাম আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত। আবু তাহের খান কানু আতহারিয়া হাই স্কুল এন্ড কলেজের কমিটি’র সদস্য। একই বাড়ীর মাহবুবুল হক খান লিলু মিয়া আমেরিকা প্রবাসী। খাঁর বাড়ীর শামছুল হক সিলেট সরকারী পাইলট স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। মরহুম নজরুল হক খান নজির মিয়া খুলনা জুট মিলের কর্মকর্তা ছিলেন,মরহুম নুরুল হক খান চেরাগ মিয়া স্যার আতহারিয়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন।

আমাদের কোনার বাড়ীর ইউছুফ ভাই পাকিস্থান সেনাবাহীনীতে করলেও তাকে পাক সেনারা তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।

দক্ষিন পাড়ার আমার দাদা অর্থ্যাৎ আমার দাদীর আপন ভাই মরহুম ফজলুর রহমান ছিলেন মছকাপুর তথা গোটা গোলাপগঞ্জের মধ্যে প্রথম আমেরিকা প্রবাসী। তিনি’র ভাই মরহুম আকলু মিয়া নামজাদা দলিল লেখক। একই বাড়ী মরহুম মখলিছুর রহমান সালিশ ব্যাক্তিত্ব একজন স্কুল শিক্ষক। এক ছাড়া সালিশ ব্যাক্তিত্ব মরহুম আতিকুর রহমান ও মুহিবুর রহমান ছিলেন আমেরিকা প্রবাসী।

আমাদের মিয়াছবের বাড়ীর মরহুম মাওলানা হেলি মিয়া,মাওলানা মরহুম হাবিবুর রহমান (বড় মিয়াছাব ) মাওলানা মরহুম আইয়ুবুর রহমান (ছোট মিয়াছাব ) কে সবাই শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করে। তার বংশধর মরহুম আব্দুস সহির কলা মিয়া দীর্ঘ দিন আতহারিয়া হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। মরহুম সহিদ উদ্দিন দলা মিয়া পুলিশ বিভাগে নিষ্টার সাথে কাজ করেছেন।

নোয়াবাড়ীর অধ্যক্ষ মরহুম কামাল উদ্দিন আজাদ একজন শিক্ষক ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করতে গিয়ে ভারতে গ্রেফতার হন। তারপর তিনি কিছু দিন ভারতে অবস্থান করে দেশে ফিরেন। তিনি’র বড় ভাই যুক্তরাজ্য প্রবাসী সুয়াই মিয়ার পুত্র এডভোকেট মনসুর রশীদ সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি’র দায়িত্ব পালন করেছেন। নোয়াবাড়ীর অধ্যক্ষ মরহুম কামাল উদ্দিন আজাদের ভাই মরহুম গৌছ উদ্দিন লাল মিয়া মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ছিলেন। তার পুত্র আব্দুল মন্নান কয়েস দীর্ঘ ফুলবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তিনি আতাহারিয়া হাই স্কুল এন্ড কলেজের গভনিং বডির আহবায়ক।

শেষ কথা হল অজানা পথে তথ্য সংগ্রহে ভূল থাকলে ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন।

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল