অপরাধ-অপরাধী ও নাগরিকের ভূমিকা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

অপরাধ-অপরাধী ও নাগরিকের ভূমিকা

প্রকাশিত: ৮:২৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২০

অপরাধ-অপরাধী ও নাগরিকের ভূমিকা

পারভীন বেগম:
‘অপরাধ ও অপরাধী’ শব্দ ২টির সাথে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। আর অপরাধ করতে করতে সৃষ্টি হয় অপরাধী। তা এক দিনে হয় না একজন অপরাধী অপরাধ করতে করতে অপরাধীতে পরিণত হয়। আর তার জন্য আমারা দায়ি। যদি এই অপরাধীর প্রথম অপরাধের সময় অমরা ঐক্যবন্ধভাবে প্রতিহত করতাম তা হলে সে ২য় বার সেই অপরাধ করার সুযোগ পেত না। আমারা ঐক্যবন্ধ হয়ে প্রতিবাদ না করার কারণে সমাজে অপরাধী সৃষ্টি হচ্ছে। অপরাধীকে একা দায়ী করলে হবে না অপরাধের জন্য। সমান ভাবে আমরাও দায়ি অপরাধী সৃষ্টিতে।

আমাদের সমাজে অপরাধের মাত্রা বাড়তে বাড়তে এটি এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য শুধুমাত্র অপরাধীর দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ না করে। কেন সে অপরাধ সংঘটিত করছে? কেন সে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে? অপরাধ দমন কিংবা নির্মূল করতে গেলে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা খুবই জরুরি। সামাজিক অপরাধের সবচেয়ে বেশি শিকার হয় নারী ও শিশুরা। রাজনৈতিক অপরাধ বা সহিংসতার শিকার পুরুষরাই বেশি। কিন্তু কেন এ নির্মমতা, নৃশংসতা, অপরাধ ও পাশবিকতা?

অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিচারহীনতা, প্রযুক্তির প্রসারের ফলেই ঘটছে এসব ঘটনা। কিন্তু কেন বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়? এসব থেকে পরিত্রাণের উপায়ই বা কি? যদ্দিন পর্যন্ত এসব প্রশ্নের সুরাহা না হবে ততদিন এ সমস্যার মূলোৎপাটনও হবে না। রোগ নির্নয় করতে না পারলে নিরাময়ও সম্ভব হবে না। নাগরিকের নিরাপত্তা দেয়ার দায়্ত্বি রাষ্ট্র তথা সরকারের-এ কথা সত্য। কিন্তু ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে নাগরিক নিরাপত্তা দেয়া রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কোনো দেশেই এটি সম্ভব হয়নি।

মাদক কিংবা অন্য যে কোন ধরনের অপরাধের বেলায় আমরা শুধু অপরাধী ও তার শাস্তির বিষয়টি নিয়ে এতবেশি ব্যস্ত থাকি যার ফলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার নেপথ্যের কারণ খোঁজার সুযোগ থাকে না। মাদকাসক্তি, মাদক ব্যবসা আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলোর অন্যতম। মাদকের ছোবলে আমাদের যুবসমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তরুণসমাজ ও অনাগত ভবিষ্যত প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মাদকবিরোধী অভিযান বহু আগেই প্রত্যাশিত ছিল।

যাই হোক, দেরিতে হলেও মাদকের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপকে সবাই সাধুবাদ জানিয়েছিল। কেননা মাদক নির্মূলের উদ্দেশ্যটি ছিল খুবই মহৎ। অনেক অপরাধী দিনের পর দিন থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। যারা ধরা পড়ছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার আইনের ফাঁকফোকর গলে জামিন নিয়ে বের হয়ে আসছে। এজন্য আমরা বিচার বিভাগকে দায়ী করছি। কিন্তু দিনের পর দিন যদি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হয়, চার্জর্শিট না হয়, বা হলেও দুর্বল চার্জশিট দেয়া হয় তাহলে তো বিচার বিভাগকে দায়ী করে লাভ নেই। তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি, বিচারক বদলি, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ইত্যাদি নানান কারণেও বিচার বিলম্বিত হয়, ব্যাহত হয়। কিন্ত তাই বলে তো হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে চলবে না!

অপরাধীর হাত যতো লম্বাই হোক, আইনের হাত তার চেয়েও লম্বা। রাষ্ট্র চাইলে, রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা চাইলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, সম্ভব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। দ্রুততার সাথে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নজিরও আমাদের কম নয়। আমরা দেখেছি শিশু রাজন হত্যার দ্রুত বিচার হয়েছে। এরকম নজির আরো আছে। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি, সেটির পথ চিরতরে রুদ্ধ করতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি ও নৃশংসতার মাত্রা দিনকে দিন যেনো বেড়েই যাচ্ছে। আগে খুন হতো সপ্তাহে একটা, তারপর দিনে একটা। এখন প্রায় প্রতিদিনই এখানে-ওখানে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। তাই অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। একাজে সরকারের সাথে সাথে সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •