আওয়ামীলীগের মন্জু_মিয়া_ মরিয়া প্রমান করিলেন তিনি জিবিত ছিলেন! – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

আওয়ামীলীগের মন্জু_মিয়া_ মরিয়া প্রমান করিলেন তিনি জিবিত ছিলেন!

প্রকাশিত: ৬:১৬ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২১

আওয়ামীলীগের মন্জু_মিয়া_ মরিয়া প্রমান করিলেন তিনি জিবিত ছিলেন!

 

তওহীদ ফিতরাত হোসেনঃ
নেতা ছিলেন না তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু প্রেমিক। দিন রাত একই তপস্যায় ব্যস্ত দেখেছি তাকে। জয় বাংলা শ্লোগান ছিল তার একমাত্র প্রিয় কবিতা। তিনি মন্জু মিয়া। বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে বৈরাগীর জীবন স্বেচ্ছায় গ্রহনকারী সিলেটের মন্জু মিয়া। কেউ কেউ বলেন মাইক মন্জু। তিনি আওয়ামীলীগের মন্জু মিয়া। তিনি একজনই সিলেটের সকলের প্রিয় মন্জু মিয়া। গত পরশু ৬ই জুন শনিবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। দাফন হয়েছে
মানিকপীর সাহেবের টিলায় গতকাল । সিলেট আওয়ামীলীগের একটি ইতিহাসের কবর হয়েছে মানিক পীরের টিলায়।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু’র নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশে জরুরী আইন , মিটিং মিছিল বন্ধ , জয় বাংলা শ্লোগান তখন সম্পূর্ন নিষিদ্ধ । সিলেটের রাজপথে রাতের অন্ধকার চীরে হঠাৎ শোনা যেত জয় বাংলা শ্লোগান। রিক্সা ছুটে যেত গলির ভেতর ঝড়ের বেগে। রিক্সার আরোহী একজন ছোটখাট লিকলিখে গড়নের মানুষ। সাথে আরও এক বা দুইজন। নাম তার মন্জু মিয়া। জয় বাংলা শ্লোগান এই ছোটখাট হাড্ডিসার মানুষটির কন্ঠে সিংহের গর্জন হয়ে প্রতিধ্বনি তুলত শহরে হঠাৎ হঠাৎ। পুলিশ ও সামরিক পেটুয়া বাহিনী ধরে নিয়ে যেত কিছুদিন পরপর। তবুও তাকে দমানো যেতনা। মন্জু মিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চান । রাসেল হত্যার বিচার চান। তার সেই আশা পূর্ন হয়েছে।
১৯৭৮ বা ৭৯ সালে একদিন আমি বাই সাইকেল চালিয়ে বাসায় যাচ্ছি। তখন সেভেনের ছাত্র। মন্জু মিয়া শিবগঞ্জ বাজারের সামনে আমার সাইকেলের সামনের খাচায় একটি লিফলেট ছেড়ে দিলেন। বাসায় এসে দেখি লিফলেটে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও শেখ রাসেলের ছবি। কেন ১০ বছরের শিশু রাসেলকে হত্যা করা হল এবং তাঁর হত্যার বিচার কেন হবে না। এই বিচারের দাবী। সেই সময় এইসব লিফলেট বা রিক্সা ভাড়া করে শ্লোগান দিতে যত খরচ হত তা মন্জু মিয়া নিজেই বহন করতেন। মনিরুল ইসলাম চৌধুরী মাঝে মাঝে তাকে সাহায্য করতেন।
ধীরে ধীরে যখন জেনারেল জিয়ার সামরিক আইন শীতিল করা হল কিন্তু সাদা লেবাসে জান্তা শাসন অব্যাহত। তাই সহসা কেউ মাইকিং করতে সাহস পেতেন না। মন্জু ভাই অসম সাহসে বের হতেন মাইক নিয়া। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু মাইকে শুনলেই বুঝা যেত মন্জু মিয়া আগামী কালকের মিটিং বা হরতালের জন্য এনাউন্স করছেন। কোর্ট পয়েন্টে মাইক লাগাতে কেউ সাহস করে যেতেন না। মন্জু মিয়া একা একা মাইক লাগাতেন। শুরু করতেন ম্যারাথন বক্তৃতা । ধীরে ধীরে মানুষ জড় হলে লিডারেরা চুপ করে এসে বক্তৃতা দিয়ে চলে যেতেন। একমাত্র অকুতোভয় মন্জু মিয়া দাড়িয়ে থাকতেন।
তার পর কত চন্দ্রভুখ অমাবশ্যা কেটে গেল। বঙ্গবন্ধু’র খুনীদের ফাঁসির রায় হল। বিচার হল। দল কতবার ক্ষমতায় এল গেল। সুরমা নদী তার স্রোত হারালো।
শামীম ভাইয়েরা যোগদান করলেন। কামরান ভাই যোগ দিলেন চেয়ারম্যান – মেয়র হলেন । জহুর চৌধুরীর বাম থেকে মধ্যে এলেন। সভাপতি হয়ে গত হলেন। আওয়ামীলীগ আর কষ্টের আওয়ামীলীগ রইলনা। এখন নেতা হলে ধনীও হওয়া যায়। আমরা প্রেমের মরা। জলেই থাকলাম। ডাঙ্গা পাইলামনা। ক্ষমতার আওয়ামীলীগ হয়ে গেল দাপটের আওয়ামীলীগ। পুরাতন কর্মীরা অকেজো মাল। নিবেদিত মন্জু মিয়াদের খবর খরচের খাতায় চলে গেল। একদিন তামাদী হবে।
পাঁচ বছর আগে হঠাৎ সিলেট থেকে দুই তরুন এগিয়ে এলেন মন্জু ভাইকে জীবিত করতে। প্রথমে জয় , মনির মামার ছেলে। মনির মামাকে চিনেননা সিলেটে এমন মানুষ নাই। বঙ্গবন্ধুর মনির মামা। আওয়ামীলীগ নেতা মনির মামা। অনেকেই তখন জানে মন্জু ভাই জীবিত না। রাহাত তরাফদার ও মাহফুজ চৌধুরী জয়। দুজনের পরিচয় সাবেক ছাত্রনেতা কিন্তু তাদের বড় পরিচয় পোড় খাওয়া আওয়ামীলীগের জন্য নিবেদিত দুই পরিবারের সন্তান তারা। তাদের ডাকে সাড়া দিলেন সৈয়দ তাহমিমুল হক। মন্জু ভাইকে নিয়ে লিখলেন হৃদয় নিংড়ানো কলাম। এগিয়ে এলেন আমার বাল্যবন্ধু সুয়েব আদমজী। দুজনেই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। তারা যোগাযোগ করলেন চ্যারিটি বিশেষজ্ঞ মিজানুর রহমানের সাথে। আমেরিকা থেকেও আমাদের সাবেক ছাত্রনেতারা কয়েকজন এগিয়ে এলেন। রাহাত তরাফদার মহানগর ছাত্রলীগ থেকেও এগিয়ে আসলেন। চেষ্টা করলেন তারা কিন্তু খুব বড় কিছু না হলেও মোটামুটি লাখ তিনেক টাকার ব্যবস্থা হল। কেউ কেউ সরাসরি তাকে কিছু সাহায্য করলেন অবশ্য। অনেকেই ছুটে গেলেন তাকে দেখতে। ফটো সেশনও কিছু হল। জগত জানলো মন্জু মিয়া মরে নাই।
জয় ও রাহাত আমার সাথেও যোগাযোগ করলেন। আমি তখন খুব নাজুক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে। তবুও সাধ্যমত সকলকে যোগাযোগ করলাম। সোস্যাল মিডিয়ায় পোষ্ট দিলাম। অনবরত সহযোদ্ধাদের খবর দিলাম। আজ খুব কষ্ট হচ্ছে যদি আরও একটু সক্রিয় হতাম তবে হয়তোবা তার জিবিতকালীন মন্জু ভাইয়ের আত্মতৃপ্তির কারন হতাম। একটু ভাল থাকার ব্যবস্থা অবশ্যই করা যেত। এই যাতনা আজীবন বয়ে যাব একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আরেকজন অসামান্য অগ্রজ নিবেদিত যোদ্ধার জন্য।
মন্জু ভাইরা সিলেটের অবস্থাপন্ন পরিবার ছিলেন। মন্জু ভাই বঙ্গবন্ধু’র প্রেমে বৈরাগী। যৎসামান্য যা পরিবার থেকে ভাগে যা পেয়েছিলেন সবই তার ব্যয় হয়েছে মিটিং এর মাইক আর নিজ জিবন ধারনে। একসময় নিঃস্ব হয়েছেন। মরহুম ইফতেখার শামীম ও যুবলীগ নেতা নজরুল ইসলাম একটি মাইক কিনে দিলেন সম্ভবত ১৯৯৯/২০০০ সালে। মাইক থেকে কিছু আয়ের ব্যবস্থা হলে শেষ বয়সে বিয়ে করেছিলেন। সেই পরিবার ছাড়া পাশে শেষ সময়ে অনেকদিন কেউ ছিলনা।
২০০১ সালের পর জোট সরকারের পুলিশ মাইকটি একদিন ছিনিয়ে নেয়। সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের প্রথম আহব্বায়ক হাবীব সেলিম আবার একটি মাইক কিনে দিলেন। কিন্তু তাও কয়েকদিন পরে পুলিশ নিয়ে যায়। দিন চলে যায় আওয়ামীলীগ ২০০৮ সালের পর ক্ষমতায় আসে , মন্জু মিয়া প্যারালাইজড্ হয়ে শ্বশুর বাড়ীতে হন আশ্রিত। যাদের জন্য মাইকিং করতেন মন্জু মিয়া তারা বড় থেকে বড় হলেন সাথে ভুলে গেলেন মাটি কামড়ে পড়ে থাকা মুজিব সৈনিকটিকে।
২০১৫ সালে রাহাত ও জয় যখন তাকে সামনে আনলো অনেকেই আকাশ থেকে পড়লেন। মন্জু মিয়া জীবিত এটা তারা বিশ্বাসই করলেন না। রাজপথের মন্জু ভাইয়েরা এমনই হারিয়ে যায়। কেউ মনে রাখেনা। ক্ষমতার এই আওয়ামীলীগ মনে রাখেনা তার দুঃসময়ের কর্মীদের। নেতারা পদপদবীর পিছে ছুটতে থাকেন। ভাই ভাগ্নাদের প্রতিষ্ঠিত করতে হন ব্যস্ত। দল বেচে তসকরেরা শত কোটির হয় মালিক। নিবেদিতরা ধুকে ধুকে প্য্যারালাইজড হতে থাকে। তাইত শিক্ষিত রূচীশীল তাহমিমুল হক আবেগ সামলাতে পারেনা। চিৎকার করে গালি দিতে চায় কলাম লিখে।
সারা বাংলাদেশে ওমন লক্ষ লক্ষ মন্জু মিয়া ছিল বলে আজ আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। চাইলে নেতারা প্রধানমন্ত্রীর কানে দিতে পারতেন মন্জু মিয়াদের খবর। বিপ্লবী নেতাকে শালার বাড়ীতে আশ্রিত হয়ে মরতে হতনা বিনা চিকিৎসায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের নেত্রী জনদরদী নেতা শেখ হাসিনা যদি জানতেন অবশ্যই মন্জু মিয়া ও তার পরিবারের জন্য কিছু করতেন। যা মন্জু মিয়াকে করত গর্বিত ও সুখী। কেউ সেদিন তার খবর নেননি , তাকে পাদপ্রদীপে আনেননি। কিসের ভয়ে জানিনা। তবে এটা জানি একদিন আমিও ষ্ট্রেচারে উঠতে পারি। আমাকেও চলে যেতে হবে। শুধু একটু সম্মান একটু স্বীকৃতি জীবিত আমাকে দিতে পারে তৃপ্তির মৃত্যু । মন্জু ভাইয়ের এটা প্রাপ্য ছিল। আজ তার বিধবাকে আমরা কি দিতে পারি সেই তৃপ্ত ও গর্বিত জীবন ?

তওহীদ ফিতরাত হোসেন
সাবেক জিএস
সিলেট এমসি কলেজ ছাত্র সংসদ।
ইংল্যান্ড।