আজ পহেলা ফাল্গুন: বসন্ত এসে গেছে… – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

আজ পহেলা ফাল্গুন: বসন্ত এসে গেছে…

প্রকাশিত: ১২:৫৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৭

আজ পহেলা ফাল্গুন: বসন্ত এসে গেছে…

প্রকৃতির দক্ষিণা দুয়ারে বইছে ফাগুনের হাওয়া। কোকিলের কণ্ঠে আজ বসন্তের আগমনী গান। ফুলে ফুলে ভ্রমরও করছে খেলা। গাছে গাছে পলাশ আর শিমুলের মেলা। সব কিছুই জানান দিচ্ছে আজ পহেলা ফাল্গুন।

ফাল্গুনের হাত ধরেই ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতির আজ এতো বর্ণিল সাজ। বসন্তের এই আগমনে প্রকৃতির সাথে তরুণ হৃদয়েও লেগেছে দোলা। সকল কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে, বিভেদ ভুলে, নতুন কিছুর প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে বসন্তের উপস্থিতি। তাই কবির ভাষায়- ‘ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত’।

প্রকৃতির বীণায় কে যেন গো সুর বেঁধে দিয়েছে। কেউবা কী নেশার টানে বনে বনে ফুলেল আগুন ছড়িয়ে দিয়েছে। বনানী জুড়ে নব পল্লবের জয়গান। বাংলা প্রকৃতি এখন স্নিগ্ধময়ী, বাসন্তী বাস পরা। শীতের জরাগ্রস্থতা কাটিয়ে নতুন পাতায় ঋব্ধ হয়ে উঠছে রিক্ত বৃক্ষাদি। বেশুমার বনফুল হতে গুনগুন রবে মৌ-পরাগ আহরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মধুমক্ষিকার দল। বিচিত্র সব মুকুলের মদির সুবাসে মানব মন মাত্রই অন্যরকম হিন্দোলিত হয়ে উঠছে। আদিগন্ত ফাগবেশ আর ব্যঞ্জনাময় উৎসব আমেজ মোহাবিষ্ট করে দারুণভাবে। এই জন্যই বসন্তের মাথায় স্মরণাতীতকাল ধরে ঋতুরাজ তথা ঋতুশ্রেষ্ঠর মুকুট।

ভূগোলবিদ ও পঞ্জিকা বিশারদরা ঈসায়ী বর্ষের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারি ও বঙ্গাব্দের একাদশ মাস ফাল্গুনের সাথে মৈত্রী তৈরি করে দিয়েছেন। তাই ঈসায়ী বর্ষ ‘অধিবর্ষ’ হলে ঐ বছর ফেব্রুয়ারি একদিন বেড়ে ঊনত্রিশ দিনে হয় এবং একই সময়ে ফাল্গুন মাসও ত্রিশ দিন থেকে বেড়ে একত্রিশ দিনে হয়। এ বছর এমনটিই হচ্ছে। ফাল্গুন পেরিয়ে বসন্ত তার যৌবনের চৌকাঠ মাড়িয়ে চৈত্রে পদার্পণ করবে। ফাল্গুন মাসের নাম ‘ফাল্গুনী’ তারা আর চৈত্র মাস ‘চিত্রা’ তারার নামের সঙ্গে মিল রেখে রাখা হয়েছে। এ সময় মহান আল্লাহপাকের অপার সৃষ্টি মহিমায় দক্ষিণ গোলার্ধ পরিভ্রমণ শেষে সূর্য তার কক্ষপথে উত্তর-অভিমুখে ধাবিত হতে থাকে। আপনা হতেই প্রকৃতিতে লাগে পরিবর্তনের হাওয়া। উত্তরী বায়ুর যাত্রাপথ রুদ্ধ হয়ে দখিনা মৃদুমন্দ সমীরণ লহর তোলে। তরুলতা পুরানো পাতা ঝেড়ে ফেলে নববধূরূপে মুকুলিত হয়। পত্রপল্লবে সুশোভিত হয় সবুজ উদ্যান। সত্যিই বসন্তের আমোদনে ফাল্গুনের ঝিরি ঝিরি হাওয়া, নির্মেঘ রোদ্দূর নতুন মাত্রা যোগ করে নিসর্গে। কোকিলের কুহুতান তো বসন্তেরই মর্মগান।

52

ফাল্গুন আসার আগেই অবশ্য আমমঞ্জরী কোষগুলো পরিণত হতে থাকে। কাঁঠাল গাছের শাখায় শাখায় ধরে মুছি (মুকুল)। লিচু গাছগুলোও ফলবতী হয়ে উঠেছে এর চেয়েও বেশি বসন্তকে উপলব্ধি করা যায় রক্তিম পলাশ, শিমুল, কাঞ্চন, পারিজাত, মাধবী, গামারী আর মৃদুগন্ধের ছোট ছোট বরুণ ফুলে। এছাড়া গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়াসহ হাজারো নামের বর্ণালী ফুল তো বসন্তের সাজ আভরণ হিসেবেই বিবেচ্য। পŠষ-মাঘের জরা-ব্যাধির আসর এসে পড়ে পরের মাসেও। গরম অনুভূত তথা ঋতু বদলের বাতাস বইতে না বইতে ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, পানিবসন্ত ইত্যাদি রোগ দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা এ সময়ে সর্বসাধারণকে সচেতন হয়ে চলার পরামর্শ দেন।

খুব বেশি না হলেও কৃষির সাথে ফাল্গুনের যোগসূত্র রয়েছে। ‘যদি বর্ষে ফাল্গুনে/ চীনা কাউন দ্বিগুণে’, ‘ফাল্গুনে গুড় আদা বেল পিঠা/ খেতে বড় মিঠা’ এমনি আরও অনেক কৃষিবিষয়ক খনার বচন রচিত হয়েছে বাংলা বর্ষের একাদশ মাসকে ঘিরে। কৃষক ফাল্গুনের দেয়ালে পিঠ রেখে তাকিয়ে থাকে চৈতালী ফসলের দিকে। এই ফাল্গুনেই দিগন্তজোড়া মাঠের বোরো ধান সোনালি রূপ পেতে থাকে। ফাল্গুনের স্বরূপ কবি-সাহিত্যিক, চিত্রকর, সঙ্গীতশিল্পী, সাংবাদিক সকলকেই মুগ্ধ করে।

এর বাইরে ফাল্গুনের আরেক পরিচয় ভাষা শহীদদের তপ্তশোতিক্ত মাস। ঊনিশশ’ বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ আটই ফাল্গুন মাতৃভাষা ‘বাংলা’ প্রতিষ্ঠার জন্য রফিক, সালাম, জববার প্রমুখ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। বারবার ফিরে আসে ফাল্গুন, আসে বসন্ত। শোক নয়, সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী মোকাবিলার দুর্বিনীত সাহস আর অপরিমেয় শক্তি নিয়ে। বীর সন্তানদের অমর গাঁথা নিয়ে। যে কোন বিচারে এ এক অনন্য মাস, ঋতু। নৈসর্গিক ক্যানভাসে রক্তাক্ত বর্ণমালা যেন এঁকে দেয় অনির্বচনীয় সুন্দর এক আল্পনা। প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে উদার সড়কের বুকে। দেয়ালগাত্র থেকে লোহিত ধারার মোহনা শহীদ মিনার পর্যন্ত। আজ পহেলা ফাল্গুনে পাশ্চাত্য অনুকরণপ্রিয় তরুণ-তরুণীরা বেসামাল উন্মাদনায় মেতে উঠবে।