আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস : বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যম বহুদূর – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস : বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যম বহুদূর

প্রকাশিত: ৬:৫৫ অপরাহ্ণ, মে ৩, ২০১৬

আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস : বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যম বহুদূর

jornalistগণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংগঠনের সূচকে দেখা গেছে, বাংলাদেশে স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা এখনো বহুদূরের পথ। দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরাও এমনটি মনে করেন। তাঁরা এ জন্য দুর্বল গণতন্ত্রকে দায়ী করে বলেছেন, গণতন্ত্র যত বিকশিত হবে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও তত বাড়বে।

আজ ৩ মে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’ বা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘তথ্যভান্ডারের অধিগম্যতা’।

যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুক্ত গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে যে দেশগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ, সেই দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা ২০১৫ সালের স্বাধীন গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের নম্বর ৭ পয়েন্ট কমেছে। তবে সাংবাদিকদের প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচক-২০১৬ তে মুক্ত গণমাধ্যমের সূচকে বাংলাদেশ এগিয়েছে দুই ধাপ। বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪, গত বছর যা ছিল ১৪৬।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকার প্রতিবেদন ২০১৫-এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা একের পর এক মুক্তমনা ব্লগারদের হত্যা করছে। সংবাদপত্র এবং মতপ্রকাশের ওপর কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপও এ দেশের অন্যতম মানবাধিকার সমস্যা। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিশোধমূলক হামলার ভয়ে সাংবাদিকেরা নিজেরাই সেন্সরশিপের দিকে ঝুঁকছেন। আর কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়া দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম।

এ রকম প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের জন্য প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগ চলছে। পাশাপাশি নতুন সম্প্রচার নীতিমালা ও আইন এবং অনলাইন সংবাদপত্রের জন্য নীতিমালা করছে সরকার। কাজও এগিয়েছে অনেকটা। এই আইন ও নীতিমালাগুলো নিয়ে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের কর্মীদের মধ্যে সমালোচনা আছে। কেউ বলছেন, সরকার গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। অন্যদিকে সরকার বলছে, নিয়ন্ত্রণ নয় বরং গণমাধ্যমের জন্য প্রচলিত আইনগুলো যুগোপযোগী করা ও নিয়মের মধ্যে আনতে নীতিমালা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি গণমাধ্যমের ওপর সরকার নানাভাবে চাপ তৈরি করছে বলেও সমালোচনা রয়েছে। বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ িহসেবে পরিচিত সাংবাদিক শফিক রেহমানকে সম্প্রতি একটি হত্যা ও অপহরণ চেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার করার পর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তা ছাড়া ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনামের বিরুদ্ধে একের পর এক ৭৯টি মামলা দায়েরের ঘটনাতেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত, মুক্ত, বিকাশমান ও দৃঢ়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে বাংলাদেশ এগিয়েছে। এটা একটা স্বীকৃতি। এখন পত্রিকার প্রকাশনা নির্বাহী আদেশে বন্ধ করা যায় না। সাংবাদিকদের লেখনীর জন্য আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন না।’ তিনি বলেন, গণতন্ত্রের বিকাশের সঙ্গে সাংবাদিকতার স্বাধীনতাও বাড়বে। তবে গণতন্ত্র বিকাশের জন্য সাংবাদিকদেরও কাজ করতে হবে।

অবশ্য সরকারের এই উপদেষ্টার বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ইংরেজি দৈনিক নিউজ টুডেএর সম্পাদক রিয়াজউদ্দীন আহমেদ। তিনি বলেন, গণতন্ত্র যেখানে দুর্বল, সেখানে স্বাধীন সংবাদপত্র থাকতে পারে না। বাংলাদেশে সংবাদপত্র চাপের মধ্যে আছে। দৃশ্যত কোনো চাপ নেই। কিন্তু এখানে গণমাধ্যমগুলো নিজেরাই সেন্সরশিপ করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে এ কথা ঠিক যে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সরকার কোনো কালাকানুন করেনি। সম্প্রতি কিছু আইন করার উদ্যোগ, ভয়ভীতি, প্রশাসনিক চাপ, বিজ্ঞাপনদাতাদের ব্যবহার করার মাধ্যমে গণমাধ্যমকে অর্থনৈতিক চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এরশাদ সরকারের পতনের পর গণমাধ্যমের বিকাশে যে আলোকরশ্মি দেখা গিয়েছিল, এখন তা কমে আসছে।

একুশে টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন নয়। এটা আংশিক স্বাধীন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। একটি রাষ্ট্রীয় চাপ, অন্যটি রাষ্ট্রের বাইরের চাপ। তিনি বলেন, ‘সরকার সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গণমাধ্যমের ওপর নানাভাবে হুমকি আসছে, সাংবাদিকেরা খুন হচ্ছেন। অথচ এর বিচার হচ্ছে না, গণমাধ্যমের হুমকিদাতাদের ধরা হচ্ছে না। এই দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। তাই বলা যায়, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মধ্যবর্তী অবস্থানে আছে।’ তিনি বলেন, তথ্যভান্ডারে অধিগম্যতা বেড়েছে কিন্তু মৌলবাদীদের হুমকি রয়ে গেছে।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাটকোর মহাসচিব ও চ্যানেল আইয়ের বার্তা পরিচালক শাইখ সিরাজ বলেন, ‘প্রতিটি গণমাধ্যমের একটি আচরণবিধি বা দিকনির্দেশনা থাকা উচিত ছিল। তাহলে সরকার বুঝতে পারবে, ওই গণমাধ্যমটি কী করছে, কী করছে না বা তারা কী করে। কিন্তু সেটি হয়নি। এখন সরকার একটি সম্প্রচার নীতিমালা করছে। তবে এটি যদি নীতিমালা না বলে গাইডলাইন বলা হতো, তাহলে হয়তো অনেক ভুল-বোঝাবুঝির অবসান হতো।’

শাইখ সিরাজ বলেন, ‘গণমাধ্যম স্বাধীনতা ভোগ করছে। যা দেখাতে চাচ্ছে, দেখাতে পারছে। গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে, এমনটা বলার কারণ দেখছি না। গণমাধ্যম নিজেরা সচেতন ও দায়িত্বশীল না হলে স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করবে।’

দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ এবং সংবাদকর্মীদের ওপর হয়রানি বা দায়িত্ব পালনে বাধা দূর করা সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে, এমন কোনো আইনি, প্রশাসনিক, নীতি বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার থেকে সরকারের বিরত থাকা উচিত।’