আজ স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে উদ্বেগ্ব-উৎকণ্ঠা : কাতালানরা স্বপ্নে বিভোর হলে ও স্পেনের মানুষ ক্ষুব্ধ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

আজ স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে উদ্বেগ্ব-উৎকণ্ঠা : কাতালানরা স্বপ্নে বিভোর হলে ও স্পেনের মানুষ ক্ষুব্ধ

প্রকাশিত: ১০:৫৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৭

আজ স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে উদ্বেগ্ব-উৎকণ্ঠা : কাতালানরা স্বপ্নে বিভোর হলে ও স্পেনের মানুষ ক্ষুব্ধ

স্পেন থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার দাবিতে উত্তাল দেশটির স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল কাতালোনিয়া। আজ সোমবার কাতালন পার্লামেন্ট বসলে সেখান থেকে ঘোষণাও আসতে পারে। এই অবস্থায় পক্ষে-বিপক্ষে পথে নেমেছে হাজার হাজার মানুষ। কাতালোনিয়ার মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হলেও স্পেনের মানুষ ক্ষুব্ধ। কাতালোনিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বসলে কী ঘটবে, তা নিয়ে উদ্বেগ্ব-উৎকণ্ঠা, ভয়ে আছে তারা।
স্বাধীনতার দাবি থেকে সরে আসতে কাতালোনিয়াকে বারবার বলে আসছে কেন্দ্রীয় সরকার। কাজ না হওয়ায় গতকাল রোববার হুমকিও দিলেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাজয়। তিনি বলেছেন, তাদের স্বাধীনতার ঘোষণা যেকোনো মূল্যে ঠেকানো হবে। প্রয়োজনে কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।

১ অক্টোবর গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেয় কাতালনবাসী। আজ সোমবার কাতালোনিয়া পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকা হয়েছিল। কিন্তু সাংবিধানিক আদালত এ অধিবেশন স্থগিত করেন। তবে এই স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে অধিবেশন বসবে কি না তা পরিষ্কার করেনি কাতালন কর্তৃপক্ষ।
সংকটময় এই অবস্থায় দেশ রক্ষা ও জাতীয় ঐক্যের জন্য আলোচনার আহ্বান জানিয়ে গতকাল এবং গত শনিবার বড় বড় বিক্ষোভ হয়েছে স্পেনের মাদ্রিদ, বার্সেলোনাসহ বিভিন্ন শহরে। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি ‘দেশ রক্ষার’ দাবির পাশাপাশি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা প্রকাশ করে মিছিলকারীরা।
রাজধানী মাদ্রিদের কেন্দ্রে মিছিলে অংশ নেন হাজারো মানুষ। ড্রাম বাজিয়ে, চিৎকার করে তারা ‘জাতীয় ঐক্যে’র ডাক দেন। মাদ্রিদের কোলোন স্কয়ারমুখী সমাবেশ থেকে তরুণেরা চিৎকার করে বলেন, ‘রাজয়, দেশ বাঁচান’। একপর্যায়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ছোটখাটো সহিংসতায়ও জড়িয়ে পড়েন তাঁরা।
বিক্ষোভকারীরা বলছে, কাতালানের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা স্পেনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আর কেন্দ্রীয় সরকার এসব হতে দিয়েছে বলেও মত দেয় তারা।
গণভোটের দিন কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশি সহিংসতার জন্য সরকার ক্ষমা চাওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে পিছিয়ে আসবে না বলে জানিয়েছেন কাতালান নেতা কার্লোস পুজেমন। কিন্তু স্বাধীনতার দিকে না এগোলেই আলোচনা শুরু হবে বলে জানিয়ে রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী হুমকি :
গত কাল স্পেনের প্রধানমন্ত্রী কাতালান নেতাদের হুমকি দিয়ে বলেছেন যে, স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল কাতালুনিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণায় কোনো কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না। বরং প্রয়োজনে কেড়ে নেয়া হতে পারে স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতাও।
এল-পাইয়েস সংবাদপত্রকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ সতর্কবাণী স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী মারিয়ান রাজোয় । স্বাধীনতার দাবির প্রতিক্রিয়ায় কাতালুনিয়ার স্বায়ত্তশাসন বাতিলে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগেরও হুমকি দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী মারিয়ান রাজয় বলেন, “স্পেন স্পেনই থাকবে। সুদূর ভবিষ্যতেও স্পেন ভেঙে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কাতালুনিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার কোনো কার্যকর ফল যেন দৃশ্যমান না হয় তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করবে স্প্যানিশ সরকার। কোনো অবৈধ সিদ্ধান্ত বা উগ্রপন্থা মেনে নেয়া হবে না। অখণ্ড স্পেন ধরে রাখতে প্রয়োজনে কাতালুনিয়ার স্বায়ত্তশাসন বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতেও বাধ্য হতে পারি আমরা।”

স্পেনের অখণ্ডতার বিষয়ে অনড় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এ সমস্যার সমাধানে কোনো মধ্যস্ততা বা আলোচনার সম্ভাবনা নেই। এর আগে কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে বড় এ রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আলোচনার দাবি জানিয়ে মাদ্রিদ ও বার্সেলোনায় জনসমাবেশে অংশ নেয় লাখো মানুষ।
মাদ্রিদভিত্তিক সংবাদপত্র এল পাইসকে তিনি আরো বলেন, ‘‘আমি সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করবো… আমি চাই স্বাধীনতা ঘোষণার হুমকি যত দ্রুত সম্ভব প্রত্যাহার করা হোক৷’
প্রসঙ্গত, স্পেনের সর্বোচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গত পহেলা অক্টোবর কাতালোনিয়া স্বাধীনতা বিষয়ক গণভোটের আয়োজন করেন স্থানীয় নেতারা৷ গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেন অধিকাংশ মানুষ৷ ফলে এক রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয় স্পেনে৷
এদিকে, শনিবার স্পেনের বিভিন্ন শহরে কাতালোনিয়া স্বাধীনতার পক্ষের এবং বিপক্ষের গোষ্ঠী রাজপথে বিক্ষোভে অংশ নেয়৷ তারা মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনার মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে৷


মাদ্রিদে বিক্ষোভে ‘‘কাটালুনিয়া, উই লাভ ইউ” লেখা ব্যানার প্রদর্শন করেন বিক্ষোভকারীরা৷ তবে কোনো কোনো বিক্ষোভকারী কাতালোনিয়া স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহারের ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন৷
উল্লেখ্য, কাতালোনিয়া সরকার শুক্রবার জানিয়েছে যে গণভোটে অংশ নেয়াদের নব্বই শতাংশই স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছেন৷ তবে মাত্র ৪৩ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন৷ স্থানীয় গণমাধ্যমের দাবি, যারা স্বাধীনতার পক্ষে নন, তারা এই গণভোটে অংশ নেননি৷ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৪ হাজার বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করেছে স্পেন সরকার।

কাতালানরা কেন তারা আলাদা হতে চায় ?
স্পেনের অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল কাতালোনিয়া। এর লিখিত ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। স্পেনের গৃহযুদ্ধের আগে এই অঞ্চলের ছিলো স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনের সময় কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসনকে নানাভাবে খর্ব করা হয়। পরে ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর সেখানকার জাতীয়তাবাদ আবার শক্তিশালী হতে শুরু করে। এরপর তীব্র আন্দোলন ও দাবির মুখে ওই অঞ্চলকে স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আর সেটা করা হয় ১৯৭৮ সালের সংবিধানের আওতায়।

স্পেনের সংসদে ২০০৬ সালে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়, যেখানে কাতালোনিয়াকে আরো কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়। কাতালোনিয়াকে উল্লেখ করা হয় একটি ‘জাতি’ হিসেবে। কিন্তু সংবিধানে কাতালোনিয়াকে দেওয়া অনেক ক্ষমতা পরে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত বাতিল করে দেয়; যা কাতালানদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
স্বায়ত্তশাসন কাটছাঁট করার ফলে ক্ষুব্ধ কাতালানরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, সরকারি খরচ কমানোসহ বিভিন্ন ইস্যু। স্বাধীনতার দাবি তৈরি হয় মূলত: এসব কারণ থেকেই।

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল