আমাদের সন্তান যেন না হারায় অন্ধকারে – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

আমাদের সন্তান যেন না হারায় অন্ধকারে

প্রকাশিত: ২:৩৫ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২০

আমাদের সন্তান যেন না হারায় অন্ধকারে

পারভীন বেগম:

প্রত্যেক সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন পিতা-মাতা, পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজন। সন্তানের জন্য সকল বাবা-মায়ের চিরাচরিত প্রত্যাশা বা শুভ কামনা। কিভাবে সন্তান ভালো থাকবে, সুখে-শান্তিতে থাকবে। সন্তান যখন এক পা, দু’পা করে স্কুলগামী হয় তখন অন্য এক জীবন শুরু করে বাবা-মা। কোন স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করানো যায়, কোথায় ভালো পড়াশোনা হয়, ভালো মানের স্কুল না হলে তো সব শেষ। সন্তানের শিশুকালেই শুরু হয় ভর্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে সন্তানের চেয়ে বাবা-মায়ের ভূমিকাই বেশি থাকে। বাবা-মায়ের নিরন্তর চেষ্টা সন্তানকে একাডেমিক জ্ঞানে প্রথম করার।

সে চেষ্টায় কাগুজে বইয়ের স্তূপে নীরবে হারিয়ে যায় সন্তানের শিশুকাল, শৈশব ও কৈশোর। বই, খাতা ও অন্যান্য উপাদান বোঝাই ব্যাগ টানতে টানতে মেরুদণ্ড সোজা হবার বদলে বেঁকে যায় শিশুকালেই। বাবা-মায়ের আর কোনো কিছুই চাওয়া নেই। চাওয়া একটাই— যেভাবেই হোক চাই ভালো ফলাফল। অমুক, তমুক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক হওয়াটা যে বেশি জরুরি সেটা ভাববার ফুরসত কোথায়? বাবা-মায়ের এই ফলাফলকেন্দ্রিক একমাত্রিক অতি চাওয়ার কারণে সন্তানের শিক্ষাজীবনে মানবিক, ধর্মীয় ও সামজিক মূল্যবোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো অনুপস্থিত থেকে যায়।

সন্তানের মাঝে ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবিক গুণাবলী, সামাজিক রীতিনীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, প্রতিবেশী, সমাজ, দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ শিক্ষাদানের উত্তম ক্ষেত্র তো পরিবারই। সত্যিকারের মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার মূল্যবান যে ভিত সেটা তো গড়ে দিতে হবে বাবা-মাকেই। এই দায়িত্ব জন্মদাতা হিসাবে প্রত্যেক বাবা-মায়ের ওপরই বর্তায়। শুধু ফলাফল কেন্দ্রিক শিক্ষা দেওয়ার প্রবণতা অতিমাত্রায় পোষণ করায় অন্যান্য অতি দরকারি আবশ্যক বিষয়গুলো শিক্ষার বাইরে থেকে যায়। যার ফলাফল সন্তান শিক্ষিত হলেও সুশিক্ষার ব্যাপারটি থাকে সুদূরপরাহত। ফলে আমরা সমাজে বিভিন্ন ভয়ংকর ঘটনার মুখোমুখি হই সময়ে, সময়ে। সমাজে নষ্ট হবার উপাদানের অভাব নেই। একবার জড়িয়ে পড়লে ফিরে আসা দুরূহ।

সমাজে নষ্ট ও ভ্রষ্ট মানুষদের এই ধ্বংসাত্মক আহ্বান চিরতরে শেষ করে দিচ্ছে আমাদের সম্ভাবনাময় সন্তানদের। বাবা-মায়ের যথাসময়ে যথোপযুক্ত মনিটরিংয়ের অভাবে আদরের সন্তান অসময়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। গর্বের সন্তান একসময় ঘৃণার পাত্রে পরিণত হচ্ছে। বাবা-মায়ের প্রতিদিনকার ব্যস্ততায় অনেক সন্তানের জীবন মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে। আমাদের সন্তানদের সত্যিকারের মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য যেসব সুব্যবস্থা থাকা দরকার তা আজ আর সহজপ্রাপ্য নয়, যতটা সহজে পাওয়া যায় খারাপ হওয়ার উপাদান। সমাজে খারাপ হওয়ার আয়োজনের অভাব নেই।

কিন্তু ভালো হওয়া বা ভালো থাকার পরিবেশ ও সুযোগের বড্ডো অভাব। একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলার সুযোগের অভাব, সুস্থ বিনোদন ও সংস্কৃতিচর্চার অভাব, ভার্চ্যুয়াল সুবিধার লাগামহীন ব্যবহার, শিক্ষাব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ, ধর্মীয়, মানবিক ও নৈতিকশিক্ষার অনুপস্থিতি, দেশীয় কৃষ্টি-কালচারচর্চা ও লালন-পালনে অনীহা, পাশ্চাত্যের জীবনধারার প্রতি সীমাহীন মোহ, বাবা-মায়ের অতি উচ্চাভিলাষী মনোভাব, সমাজে চলমান বিভিন্ন অসুস্থ প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে আমাদের সন্তানদের বিপথগামী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

ফলে সম্ভাবনাময় প্রজন্ম মাদকের নেশা, সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অসামাজিক ও দেশবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ছে। অসময়ে হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান জীবন। যে সন্তানকে ঘিরে বাবা-মায়ের স্বপ্ন, সাধ-আহ্লাদ আবর্তিত হয়। তার প্রতি আরো বেশি মনোযোগের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা জরুরি। ভালো-মন্দের পার্থক্য সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা দিতে হবে।

সাধারণ একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে ধর্মীয়, নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক শিক্ষাদান। সন্তানকে অহেতুক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া থেকে প্রত্যেক বাবা-মায়ের বিরত থাকা উচিত। জীবনকে গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করার শিক্ষা দিতে হবে সন্তানকে। তাকে দুধে-ভাতে রাখতে গিয়ে তার পাত্রে বিষ তুলে দিচ্ছি কি না সে ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •