আমাদের সিলেট জ্ঞানী-গুণী যারা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

আমাদের সিলেট জ্ঞানী-গুণী যারা

প্রকাশিত: ৯:৫৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০

আমাদের সিলেট জ্ঞানী-গুণী যারা

পারভীন বেগম:
আমাদের সিলেট। প্রিয় সিলেট। জন্মভূমি সিলেট। এই সিলেটের রয়েছে বিশ্বজুড়ে সুনাম ও খ্যাতি বাংলাদেশের অতিপরিচিত জেলা অধ্যাত্বিক রাজধানী ক্ষেত্রে সিলেট। ওলিকুলের শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রহ.), হযরত শাহপরাণ (রহ.) সহ ৩৬০ আউলিয়ার পদধূলিতে ধন্য হবার কারণেই সিলেটকে বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী বলা হয়ে থাকে। সিলেট অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা, সংস্কৃতি ও রীতিনীতির কারণেই বাংলাদেশের অন্যান্ন যে কোন অঞ্চল থেকে সহজেই সিলেটকে আলাদা চেনা যায়।

সিলেট অঞ্চল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ভরপুর এছাড়াও প্রবাসী অধ্যুষিত হওয়ার কারণেই সিলেট অঞ্চল বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অর্থনৈতিকভাবেও বেশ সমৃদ্ধশালী একটি জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সিলেটের পরিচিতি আজ শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং বিশ্বের বিভিন্নস্থানে সিলেটের নাম ডাক ছড়িয়ে পড়েছে। সিলেটের সমৃদ্ধশালী প্রাকৃতিক, খনিজ ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার মতোই সিলেটের সুপ্রাচীন হাজার হাজার বছরের ইতিহাসও বেশ স্বচ্ছল ও সমৃদ্ধশালী। বেশ কিছু দিন থেকেই সিলেটের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে একটা ধারাবাহিক লেখা প্রকাশের ইচ্ছা ছিলো কিন্তু নানান প্রতিকূলতায় তা এতোদিন হয়ে উঠেনি। বেশ কিছু বই ঘাঁটাঘাঁটি করে এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমার এই ধারাবাহিক লেখা সাজানোর চেষ্টা করেছি।

লেখার প্রথম পর্বে বইয়ের সিলেটের কিছু জ্ঞানী ও গুণী জনের কথা তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। ধারাবাহিক পর্বে আশা করছি সবকিছু আমরা প্রকাশ করতে পারবো। সিলেট বিভাগ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত একটি প্রশাসনিক অঞ্চল, যা সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ- এই চারটি জেলা নিয়ে গঠিত। এই চার জেলা নিয়ে গঠিত সিলেট বিভাগ। আর সিলেট বিভাগে জন্ম হয়েছে অসংখ্য জ্ঞানী ও গুণীর। সিলেট বহু বিখ্যাত লোকের জন্মস্থান। হাসন রাজা, মেজর জেনারেল এম এ রব, রাজা গিরিশচন্দ্র রায়ের মতো অনেক বিখ্যাত লোকের জন্মস্থান সিলেট। আজ পরিচিত হবো এমনই কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাথে।

গিরিশ চন্দ্র রায়: রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় সিলেটের প্রথম রায়বাহাদুর ও একমাত্র রাজা খেতাব প্রাপ্ত ব্যক্তি। শিক্ষার প্রসারকল্পে গিরিশ চন্দ্রের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বৃটিশ সরকার ১৮৯৫ সালে তাকে রায়বাহাদুর ও ১৮৯৯ সালে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেন। সিলেট রায়নগরের বিখ্যাত জমিদার দেওয়ান মানিকচাঁদের পুত্র মুরারীচাঁদের সন্তানহীনা কন্যা ব্রজ সুন্দরী দেবী, গিরিশ চন্দ্রকে দত্তক নিয়েছিলেন। এভাবে তিনি রায়নগরের জমিদার মুরারীচাঁদের বিশাল সম্পত্তির মালিক হন। নিজে নিরক্ষর হলেও শিক্ষার প্রসারে তিনি তার সমস্ত বিত্ত-সম্পদ ব্যয় করেন। তিনি সিলেটের তথা আসামের প্রথম কলেজ এম.সি. কলেজ ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি সিলেট মুরারোচাঁদ কলেজ এবং ১৮৮৬ সালে রাজা গিরিশ চন্দ্র হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

হাসন রাজা: অহিদুর রেজা বা দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী (ছদ্মনাম) বাংলাদেশের একজন মরমী কবি এবং বাউল শিল্পী। তার প্রকৃত নাম দেওয়ান হাসন রাজা। হাছন রাজার জন্ম ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর (৭ পৌষ ১২৬১) সেকালের সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ শহরের নিকটবর্তী সুরমা নদীর তীরে লক্ষণছিরি (লক্ষণশ্রী) পরগণার তেঘরিয়া গ্রামে।

মেজর জেনারেল এম এ রব: মেজর জেনারেল এম এ রব, মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড, বাংলাদেশের প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান ও সাবেক সংসদ সদস্য।

শাহ আবদুল করিম: উস্তাদ শাহ আবদুল করিম কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী, সুরকার, গীতিকার ও সঙ্গীত শিক্ষক। তিনি বাউল সঙ্গীতকে অনন্য উচ্চাতায় নিয়ে গেছেন। কর্মজীবনে তিনি পাঁচশ’র উপরে সংগীত রচনা করেছেন। শাহ আবদুল করিম ইব্রাহিম আলী ও নাইওরজানের ঘরে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন।

আগা মোহাম্মদ বেগ: সিলেটে ব্রিটিশ বিরুধী আন্দলোনের সংগঠক ও নেতৃত্বদাতা।

সৈয়দ মোস্তফা কামাল: সৈয়দ মোস্তফা কামাল লেখক, ঔপন্যাসিক, গবেষক, ঐতিহাসিক। সৈয়দ মোস্তফা কামালের জন্ম ২৫ শে জানুয়ারি ১৯৪৩ ইংরেজি সনে, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার মসাজান গ্রামে।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ: দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, দার্শনিক, সাহিত্যিক ও সমালোচক। তিনি সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন।

শ্রীচৈতন্যদেব: শ্রীচৈতন্যদেব একজন হিন্দু সন্ন্যাসী এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক।

দুর্বিন শাহ: দুর্বিন শাহ বাংলাদেশের একজন মরমী গীতিকবি, বাংলা লোক সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার, বাউলসাধক। তিনি ১৩২৭ বঙ্গাব্দের ১৫ কার্তিক (১৯২০ খ্রিস্টাব্দ এর ২ নভেম্বর) ছাতকের সুরমা নদীর উত্তর পারে নোয়ারাই গ্রামের তারামনি টিলায় জন্মগ্রহণ করেন।

আরকুম শাহ: শাহ আরকুম আলী একজন আধ্যাত্মিক সাধক ও সূফী। তার জন্ম ১৮৭৭ সালে সিলেটে।

এছাড়াও এ জেলায় জন্মগ্রহণকারী অন্যান্য প্রখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন: মুক্তিযোদ্ধের সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী, রামকানাই দাশ, সুষমা দাস, রফিক উদ্দিন আহমেদ (বিজ্ঞানী), শিতালং শাহ (গিতিকার), গজনফর আলী খান, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সুহাসিনী দাস, খান বাহাদুর এহিয়া চৌধুরী, মৌলভী আবদুল করিম, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, রাধারমণ দত্ত, এনামুল হক মোস্তফা শহীদ। আরো অনেক গুনি লোকের জন্মস্থান সিলেট। যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে দেশের উন্নতির জন্য কাজ করে গেছেন। তাদের কথা জাতি দীর্ঘদিন শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করবে। ধারাবাহিক পর্বে আমরা সবার কথা তুলে ধরার চেষ্ঠা করব।

প্রিয় পাঠক, এখানে আমি অল্প কিছু তুলে ধরেছি। তবে এই অল্প জানার মাধ্যমে আমরা সিলেট সম্পর্কে আরো বেশি জানতে সচেষ্ট হলে মূলত বাংলাদেশকেই জানা হবে। এই সিলেট বাংলাদেশেরই অংশ। এর ঐতিহ্য বাংলাদেশেরই ঐতিহ্য। তারপরও প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের তার নিজের সংস্কৃতি ঘেঁষে থাকা এলাকায় আলাদা টান অনুভব করে। এ টান শিখড়ের টান।

আমরা সিলেটি হিসেবে সিলেটের আরো আরো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের খোঁজ রাখার পাশাপাশি আমাদের দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের খুঁজ রাখবো। আমরা যেনো আমাদের ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ঐতিহ্য না ভুলি এবং আমাদের দ্বারা যেনো আমাদের প্রকৃতি, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ঐতিহ্য ধ্বংস না হয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •