উচ্চমাত্রায় রাজনীতিকীকরণের কারনে সন্ত্রাস দমনের ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

উচ্চমাত্রায় রাজনীতিকীকরণের কারনে সন্ত্রাস দমনের ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই

প্রকাশিত: ১১:১১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০১৬

উচ্চমাত্রায় রাজনীতিকীকরণের কারনে সন্ত্রাস দমনের ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই

voiceদক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, দেশটির ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাস বাগে আনতে বাংলাদেশ দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ফরেন সার্ভিসের সহযোগী সম্পাদক ক্রিস্টিন ফেয়ার ভয়েস অব আমেরিকার এশিয় উইকলিপড কাস্ট এ আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেছেন, দেশটির পুলিশ ও বিচার বিভাগে উচ্চমাত্রায় রাজনীতিকীকরণ ঘটার ফলে বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়ে আছে।‘বাংলাদেশ যে সংকট মৌলিকভাবে মোকাবিলা করছে সেটা হলো, তাদের জাতি বলতে কি বোঝায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই ধরনের ভাষ্য আছে। আর সেটাই স্পষ্ট করে যে, দেশটি দুভাগে ভাগ হয়ে আছে। বিএনপি অনেকটাই মধ্য ডান, যারা বিশ্বাস করে যে, রাজনীতিতে ইসলামের একটি ভূমিকা আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাকে খাটো করে দেখে।’সন্ত্রাস মোকাবিলা ও তার তদন্তে বাংলাদেশ সরকার বিদেশি সরকারের কাছ থেকে সহায়তা নিতে পারে। কিন্তু যখন সেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ সরবরাহ করে তখন তার ফলাফল মিশ্র হয়ে পড়ে। উপরন্তু এর উপরে রয়েছে অপরাধের দৃশ্যপট সামাল দেয়ার ব্যবস্থাপনাতেও তারা অদক্ষ। কোনো একটি ঘটনায় যদি নির্দিষ্ট কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ চাওয়া হয়, তখন ওই দৃশ্যপট থেকে সেটা উদ্ধার করা সম্ভব না-ও হতে পারে।
ঢাকা থেকে প্রায় ১৪০ কিমি দূরবর্তী কিশোরগঞ্জের ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন এলাকায় সন্ত্রাসী হামলার পরে মিজ ফেয়ার বাংলাদেশ সম্পর্কে কথা বলছিলেন। একজন পুলিশ অফিসার বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন এবং আরেক জনকে ছুরিকাঘাত করা হয়। সেখান থেকে পাওয়া রিপোর্ট অবশ্য বলেছে যে, ওই ঘটনায় একজন মহিলা নিহত এবং এক ডজনের বেশি লোক আহত হয়েছেন।কর্তৃপক্ষ বলেছেন, আক্রমণকারীদের দুজন নিহত এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
কর্মকর্তারা এখনও পর্যন্ত আক্রমণকারীদের পরিচয় সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। যদি ইসলামিক স্টেট গুলশানের ঘটনার পরে প্রচারিত এক ভিডিওতে আরো হামলা পরিচালনার কথা বলেছিল। কিশোরগঞ্জে এই হামলার ঘটনা ঘটলো গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালানো, যেখানে ২০ জন জিম্মিকে হত্যা করা হয়েছিল, তার এক সপ্তাহ পরে। কর্তৃপক্ষ প্রায় ১২ হাজার সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের দুসপ্তাহ পরে এবং হলি আর্টিজানে হামলার একদিন আগে একজন হিন্দু পুরোহিতকে হত্যা করা হয়।
যদিও হলি আর্টিজানের হামলার দায় আইএস স্বীকার করেছে কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দাবি করেছেন যে, এই হামলা করেছে জেএমবি, যে অভ্যন্তরীণ সংগঠনটি ১০ বছরের বেশি সময় আগে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জনাব খান বলেছেন, আর্টিজান হামলার সঙ্গে আইএসের কোনো যোগসূত্র নেই।
একটি এপি প্রতিবেদন বলেছে, বেকারি হামলাকারীদের কয়েকজন কয়েক মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন, যাতাদের পরিবারকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। এসব ব্যক্তিরা বিত্তশালী পরিবারে নামি স্কুলে এবং আদর-যত্নের মধ্যে বড় হয়েছিল।
সন্ত্রাস দমনের সামর্থ্য
সুতরাং এসব বিষয় কি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে? এবং তারা রাজপথগুলোকে নিরাপদ রাখতে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিতে পারছে?
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা ফারুকি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ এ ধরনের সামরিক হামলার জন্য কখনও প্রস্তুত ছিল না। আমরা জানি না এটা কিভাবে মোকাবিলা করতে হয়।’
জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিস্টিন ফেয়ার বলেন, সহিংসতা দমাতে সরকার যদিও হাজার হাজার লোককে গ্রেপ্তার করেছে কিন্তু তার মনোযোগের কেন্দ্রে অনেক বেশি রয়েছে কিভাবে বিরোধী দল বিএনপি ও তার মিত্র জামায়াত ইসলামীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া যায় সেই বিষয়টি। সুতরাং সমালোচনার প্রতি বর্তমান সরকারের সংবেদনশীলতা অত্যন্ত বেশি যে, তারা আসলে জামায়াতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চাইছে।
ক্রিস্টিন ফেয়ার আরো বলেন, আইএস বা অন্যান্য গ্রুপ দেশে শেকড় গাড়ছে সেটা নাকচ করে দিয়ে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছেন। তার সরকার একইসঙ্গে তার কার্যক্রমের সমালোচনা করায় তিনি মত প্রকাশের স্বাধীনতায় চাপ সৃষ্টি এবং মিডিয়ার ওপর ক্রাকডাউন চালিয়ে যাচ্ছেন।
ফেয়ার বলেন, সম্প্রতি যাদের পাইকারি গ্রেপ্তার করা হল তাদের বড় অংশ কিন্তু সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীরা নয়, তারা বিএনপির দলভুক্ত কর্মী-সমর্থক।
ফারুকিও এই দিকটিএড়িয়ে যাননি।
চলচ্চিত্র নির্মাতা বলে, সরকার যখন সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা ইসলামী জঙ্গি ধরবে তখন আমরা তাকে ঠিক সিদ্ধান্ত বলেই মনে করি। কিন্তু পরে যখন তারা অভিযান শেষ করে ১২ হাজার বিরোধীদলীয় কর্মী বা সমর্থক গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তখনই প্রশ্নটি ওঠে। কারণ তারা ইসলামী জঙ্গি নয়।
ক্রিস্টিন ফেয়ার শেখ হাসিনার মোটিভ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘তিনি কি সত্যিই এই সন্ত্রাসবাদের উপদ্রব দূর করতে চান, নাকি তিনি তার সকল প্রকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার নীতি বাস্তবায়নে আগ্রহী?
ফেয়ার বলেন, বাংলাদেশে জামায়াতের প্রতি সমর্থন সত্যিই অনেক বেশি। সুতরাং সেই অবস্থায় শেখ হাসিনা যখন এরকম একটি দলকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে চান তখন বোঝা যায় যে, তিনি হয়তো বাস্তবতা থেকে কিছুটা দূরেই আছেন। আর এটা তো একটা অসম্ভব যুক্তি যে, জামায়াতের সব নেতাকর্মী সন্ত্রাস বা যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত আছেন।
ক্রিস্টিন ফেয়ার বলেন, ‘সুতরাং তিনি (প্রধানমন্ত্রী) নিজকে এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছেন, যেখানে সাধারণ ধার্মিক মানুষ এমনই একটি রাষ্ট্র চাইছেন, কিন্তু সেই রকম আকাঙ্ক্ষা প্রকাশে তাদের কোনো রাজনৈতিক চ্যানেল নেই। আর সেটাই এরকম একটি ভীতির সঞ্চার ঘটাচ্ছে যে, তিনি ওই রকম একটা অবস্থা সৃষ্টি করে রেখে প্রকারান্তরে এখন এই ধরনের সহিংসতায় যুক্ত থাকাদের কোনো অংশকে প্রকৃতপক্ষে একটি আনুকূল্য দিচ্ছেন।’

(৮ই জুলাই, ২০১৬ ভোয়ার ওয়েবসাইট থেকে নেয়া)