একজন শিক্ষকের অনুভুতি- এম.সি কলেজ.. হৃদয়ে রক্তক্ষরণ.. – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

একজন শিক্ষকের অনুভুতি- এম.সি কলেজ.. হৃদয়ে রক্তক্ষরণ..

প্রকাশিত: ১০:২৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

একজন শিক্ষকের অনুভুতি- এম.সি কলেজ.. হৃদয়ে রক্তক্ষরণ..

সিপার আহমেদ
রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় আজ পৃথিবীতে নেই। যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে রাগে, ক্ষোভে, ুঃখে বলে উঠতেন….”বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়োও ঐ ক্যাম্পাস, শশ্মানে পরিণত করে াও থ্যাকারে টিলা; ওখানে এখন আর মানুষ সৃষ্টি হবে না..জন্ম নেবে ধর্ষক সন্ত্রাসী মাকসেবী আর খুনী”।
১৮৯২ সালের ২৭ জানুয়ারী সিলেটের রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় পূণ্য ভূমি সিলেটে জ্ঞানের আলো জ্বালাতে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রমাতামহ মুরারিচাঁদের নামে কলেজটির নাম রাখেন সিলেট মুরারিচাঁদ কলেজ। সংক্ষেপে এম.সি কলেজ।
তখনও প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়নি। এম.সি কলেজকেই তখন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো।
সুনাম,সুখ্যাতি আর গৌরবের মহিমায় এমসি কলেজ ছিল দেদীপ্যমান।
আমি এই কলেজেরই ছাত্র ছিলাম। কারো কাছে পরিচয় দেবার সময় স্কুল, হাইস্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কোন কিছুরই নাম উল্লেখ না করে শুধু বলতাম আমি এম.সি কলেজের ছাত্র। খুব গর্ববোধ করতাম, আত্মতৃপ্তি পেতাম। সেই গর্ব, সেই কৃতিত্ব আজ ধুলোয় মিশে গেল। এমসি কলেজের ছাত্র ছিলাম…এ পরিচয় হয়তো আর কোনদিন দেবো না, লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসবে।
খুন, ধর্ষণ,সন্ত্রাস,অপরাধ যুগে যুগে ছিল, থাকবে। কিন্তু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাসে নারী ধর্ষণ পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই প্রথম।
এ কলংক এমসি কলেজের, এ কলংক শাহজালালের পূণ্যভূমি সিলেটের।
আমি বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়াই। সিলেটে বাড়ী… এ পরিচয় পাবার পর সবাই আলাদা একটা শ্রদ্ধা করতো। আমার সেই শ্রদ্ধার জায়গাটা আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেল! 😥
অপরাধী একদিনে সৃষ্টি হয় না। ছোট ছোট অপরাধ করে যখন সে পার পেয়ে যায় তখন সে বড় বড় অপরাধের পথে পা বাড়ায়। সে পথে চলতে গিয়ে যখন সে রাজনীতি তথা রাজনীতিবিদদের স্নেহধন্য হয়ে যায় তখন তার মাঝ থেকে ভয়ভীতি চলে যায়। সে তখন হয়ে যায় বড় ধরনের সন্রাসী, খুনি কিংবা ধর্ষক। এমসি কলেজে যারা এ কুকর্ম ঘটিয়েছে তাদেরকে সবাই চিনেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হিসাবে। তারা নিজেরাও সেখানে ছাত্রলীগের রাজনীতি করে, এখানে শাঁক দিয়ে মাছ ঢাকার কিছু নেই।
আজ সরকারী লের অনেকেই বলছেন এরা ছাত্রলীগের কেউ নয়, কমিটিরও কেউ নয়.. কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাকর্মী পরিচয়ে এইসব ছেলেরা যখন সমস্ত টিলাগড় এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছিলো তখন তারা কেন বলেননি যে এরা ছাত্রলীগের কেউ নয়, এরেকে কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হলো না। কেন এদের বিরুদ্ধে কোন আইনানুগ ব্যবস্হা নেয়া হলো না। সিলেট আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতাদের তো সে ক্ষমতা ছিল। অতএব রাজনৈতিক নেতারা কোন অবস্হাতেই এই ব্যর্থতার দায়ভার এড়াতে পারেন না।
২০১২ সালের ৮ জুলাই যখন এমসি কলেজ হোস্টেল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হলো তখন অনেকেই মায়াকান্না দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন এ ব্যাপারে কোন শক্ত ভূমিকা নিতে পারে নাই। এখানে তাদেরও ব্যর্থতা আছে। ুষ্কৃতিকারীরে কোন বিচার আজও হয়নি। সহপাঠী বন্ধু লিয়াকত যখন শাহপরান ানার ওসি ছিল আমি তখন প্রায়ই তাঁর সাে হোস্টেল পোড়ানোর মামলার অগ্রগতি নিয়ে আলাপ করতাম। এই আলাপচারিতার মাঝে আমি তাঁর অসহায়ত্ব লক্ষ্য করেছি। বুঝতে পেরেছিলাম নোংরা রাজনীতি আমাদেরকে কতটা পিছিয়ে দিয়েছে।
এমসি কলেজ হোস্টেল যারা পুড়িয়ে দিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে তখন যদি অ্যাকশন নেয়া হতো তাহলে ৮ বছর পর তাদের উত্তরসুরীরা এমসি কলেজকে ধর্ষিতার রক্তে রঞ্জিত করার সাহস পেতো না।
এমসি কলেজের অধ্যক্ষ আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন। তাকে যে কোন অনুযোগ অভিযোগ করবো সে ধৃষ্টতা আমার নেই। শুধু এটুকই বলবো করোনাকালীন সময়ে হোস্টেলটা কেন যে খোলা রাখলেন। এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। যেই ভুলের খেসারত দিতে হলো এক নববধূকে।
আসামী সাইফুর ীর্ঘ নি থেকে ৫ম ছাত্রাবাসের হোস্টেল সুপারের বাসভবন জোর পূর্বক দখল করে অবস্হান করছিল। ঐ ভবন থেকেই পুলিশ অস্ত্র উদ্ধার করে।
হোস্টেল সুপার এ ব্যাপারে প্রশাসনের মাধ্যমে আগে থেকেই শক্ত অবস্হান গ্রহন করা প্রয়োজন ছিল। এখানেই তাঁর ব্যর্থতা।
হোস্টেল সুপার হলেন আবাসিক ছাত্রদের অভিভাবক। আমাদের সন্তানরা যারা হোস্টেলে থাকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
শ্রদ্ধাভাজন হাসান ওয়ায়েজ স্যারকে আজ খুব বেশী মনে পড়ে। আমাদের সময়ে এমসি কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। কলেজ প্রাঙ্গনে কখনো দু গ্রুপের মধ্যে অস্ত্র হাতে মারামারি শুরু হলে হুংকার দিয়ে অফিসের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসতেন। স্যারের তীক্ষ্ণ চাহনি আর হুংকারের সামনে কেউই টিকে থাকতে পারতো না।
কারণ, উনার মেরুদন্ড খুব শক্ত ছিল।
মনটা ভালো নেই !
ু’নি থেকে টেলিভিশনে শুধু ধর্ষণ আর ধর্ষণের সংবাদ। মনে হচ্ছে এ যেন এক ধর্ষণের রাজ্য। আমার মেয়ে, ভাতিজি, ভাগিনি সবার নিরাপত্তা নিয়ে আমি আজ শংকিত !
নারীবাদী ঐসব নেত্রীরা আজ কোথায়? মাঝরাতে টেলিভিশনের টক শো যারা ফাটিয়ে তোলেন। নারী অধিকার, নারী অধিকার নিয়ে যারা ধুঁয়ো তোলেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো কোথায়?
নারীর ইজ্জত কি মানবাধিকারের আওতায় পড়ে না?
চিৎকার করে কী লাভ হবে জানি না।
তবে এমসি কলেজের অধ্যক্ষের বরাবরে একটাই অনুরোধ, আইন অপরাধীদের কি শাস্তি দেবে জানি না, সেটা আইনের বিষয়। তবে একজন শিক্ষক হিসাবে ঐ সব ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে আপনাকে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। কারণ এরা আপনাকে কলংকিত করেছে, আপনার কলেজকে কলংকিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পাসের সার্টিফিকেট এরা যেন না পায়, সে ব্যবস্হা আপনাকেই করতে হবে। নতুবা
শিক্ষা, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই তিনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ভালবাসা আর কোনদিনও থাকবে না।।
ভাল থাকুন সকলে।
ভাল থাকুক আমার সুরমা পারের সেই বোনটি!!

সিপার আহমেদ
সিনিয়র প্রদর্শক, কুলাউড়া সরকারি ডিগ্রী কলেজ, মৌলভীবাজার।

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল