একটি কিংবদন্তি আলোকিত জীবনের অপরিসমাপ্তি

প্রকাশিত: ১০:০৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১, ২০২২

একটি কিংবদন্তি আলোকিত জীবনের অপরিসমাপ্তি

মোঃ মুকুল হোসেন জিন্নাহ::

অনেকদিন ধরে ভাবছি, জাহিদুর রহমান ভাইকে নিয়ে কিছু একটা লিখবো।কিন্তু সময়ের বিড়ম্বনায় হয়ে উঠে না।আজ একটু লেখার অবতারণা করছি।

এরকম আলোকিত একজন মানুষের পরিচয় ৭০/৮০ দশকে আমরা যারা এলাকার ছাত্র ছিলাম সবাই মোটামুটি জানি। তার নাম জাহিদুর রহমান,গ্রামঃ সারুটিয়া,ইউনিয়নঃ মাজপাড়া,উপজেলাঃ আটঘরিয়া,জেলাঃ পাবনা।
জাহিদ ভাই আমার চেয়ে ৩/৪ বছরের একাডেমিক সিনিয়র ছিল।তিনি এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় তৎকালীন সময়ে স্টার মার্কস পেয়েছিল। অর্থাৎ শতকরা ৭৫% নম্বর পেয়ে তিনি তৎকালীন ঢাকা কৃষি কলেজ, বর্তমান সে প্রতিষ্ঠানটি শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরএ বাংলা নগরে অবস্থিত। আমাদের সময়ে এলাকার সবচেয়ে ভালো ছাত্র হিসেবে তার পরিচিতি ছিল।

১৯৮৮ সাল তখন আমি পাবনা সরকারী এডওয়ার্ড কলেজের একাদশ শ্রেনীর ছাত্র।খুব সম্ভব জানুয়ারী/ ফেব্রুয়ারী মাস হবে। সবেমাত্র আমার প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শহীদ আব্দুল খালেক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে কলেজে অধ্যায়ন করছি। কিন্তু নিজের হাইস্কুলের কথা সব সময় স্বরণে রাখি।এই সময়ের কোন এক বিকেলে স্কুলের খুব সম্ভব খেলাধুলার সময় আমি আমার জুনিয়র বন্ধু বেরুয়ানের ইমান আলী,বর্তমানে টেবুনিয়া শামসুল হুদা কলেজের সহকারী অধ্যাপক একসঙ্গে পায়ে হেঁটে খিদিরপুর হাইস্কুলে যাই।

এ সময় হাইস্কুলের একটি রুমে তৎকালীন খিদিরপুর হাইস্কুলের স্বনামধন্য ছাত্র রেজাউল করিম বাচ্চু সহ কয়েকজনকে নিয়ে জাহিদ ভাই নাচ গান করছে।বিষয়টি আমি দেখে হতভম্ব হয়ে যাই।কারন ইতোপূর্বে কখনও জাহিদ ভাইকে এরকম অবস্হায় দেখি নাই। সম্ভবত এই সময়ই তাঁর মানসিক সমস্যার সুত্রপাত হয়।

আমি বিষয়টি দেখার পর খুবই অস্বাভাবিক হয়ে যাই এবং বিষয়টি নিয়ে কি করা যায় তা নিয়ে ভাবতে থাকি। তাৎক্ষনিক আমার মনে পড়ে জাহিদ ভাইয়ের একান্ত বিশ্বস্ত একজন মানুষ বেরুয়ান গ্রামের মাস্টার আব্দুর রাজ্জাক।জাহিদ ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ থেকে চিন্তা করি এই সমস্যার সমাধান একমাত্র আব্দুর রাজ্জাক কাকা দিতে পারে।কারণ জাহিদ ভাই রাজ্জাক কাকার অত্যান্ত কাছের ও স্নেহের মানুষ ছিলেন।

আমি তার অবস্থা অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করি এবং ভাবি কি করা যায়। পরে জাহিদ ভাইকে সালাম দিয়ে ডেকে নিয়ে বললাম ভাই রাজ্জাক কাকা আপনাকে দেখা করতে বলেছে। তার কিছু সময় পরেই আমি নিজ বাড়ি বেরুয়ানে চলে আসিএবং রাজ্জাক কাকাকে বিষয়টি বলার জন্য তার বাসায় যাই। কিন্তু ইতিমধ্যে রাজ্জাক কাকা খিদিরপুরে চলে গেছে বলে জানতে পারি । এখানেই বিধিবাম! আমি যে উদ্দেশ্য নিয়ে জাহিদ ভাইকে রাজ্জাক কাকার সাথে দেখা করার জন্য বলেছিলাম কিন্তু সেটা রাজ্জাক কাকাকে বলার আগেই জাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে রাজ্জাক কাকার খিদিরপুরে দেখা হয়ে যায়। তিনি রাজ্জাক কাকাকে জিজ্ঞাসা করেন আপনি কি আমাকে দেখা করতে বলেছেন? রাজ্জাক কাকা জবাবে বলেন, না দেখা করতে বলিনি।

পরের দিন সকালে জাহিদ ভাই আমার কাছে আবার আসে এবং জিজ্ঞাসা করে রাজ্জাক ভাই কি আমাকে দেখা করতে বলেছিল? আমি তখনও বলি জি আপনাকে দেখা করতে বলেছিল।ইতোমধ্যে যে তার রাজ্জাক কাকার সাথে দেখা হয়েছে তা আমি ঘুর্নাক্ষরেও জানতে পারি নাই।যদিও পরবর্তীতে বিষয়টির ভূল বুঝাবুজির অবসান হয়েছিল।তারপর থেকে যতবার দেখা হয়েছে ভালোভাবেই অনেক আলাপ করেছি।

খুব সম্ভব ১৯৯০ সালের পর থেকেই জাহিদ ভাই আস্তে আস্তে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে খালি গায়ে একটি লুঙ্গি পরে আটঘরিয়া ও পাবনার বিভিন্ন এলাকায় পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়ায়।শুনেছি তার পরিবার অনেক চিকিৎসা করেছে তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে নিয়ে আসার জন্য। কিন্ত আজও তিনি অসুস্থ অবস্থায় দিন অতিবাহিত করছে।যদিও বাইরে থাকার কারনে জাহিদ ভাইকে অনেক দিন দেখি না।প্রায় ১/২ বছর আগে সড়াবাড়িয়া বাজারে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল।হয়তো আমাকে চিনতে পেরে কাছে আসলো, আমিও এগিয়ে যাই দু’একটি কথা জিজ্ঞাসা করি, তেমন উত্তর পাইনি।পরে চায়ের দোকানে নিয়ে সেই ছোট বেলার ভালোবাসার কোন কমতি না রেখে একসঙ্গে বসে চা বিস্কুট খাই এবং দোকান্দারকে বলে দেই জাহিদ ভাই যা খেতে চায় খাওয়াবেন আমি দেখবো।পরে তাঁর হাতে কিছু টাকা গুজে দিয়ে দেবোত্তর চলে যাই।

আমার লেখাটির অবতারণা এজন্যই একজন সম্ভাবনাময় জীবনের অপরিসমাপ্তি চোখের সামনে আমরা সকলেই অবলোকন করলাম।সে যদি এই সমস্যায় না পড়তো তাহলে হয়তো কৃষি বিভাগের কোন বড় কর্মকর্তার চেয়ার অলংকৃত করতো।তাতে দেশ উপকৃত হতো,দেশের মানুষ কোন না কোন ভাবে তার সাহায্য, সহযোগিতার ও সেবা পেত।

তার পরিবার হয়তো তার আদরের সন্তানটিকে/ আদরের ভাইটি কে সুস্থ করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমাদের সমাজের মানুষের কি কোন দায়বদ্ধতা ছিলনা? আমরা যারা তৎকালীন ছাত্র ছিলাম তার পূর্বসূরী ছাত্র ছিল, পরবর্তী ছাত্র ছিল কেউ কি বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন? সত্যিই এ সমাজের মানুষগুলো সেলুউকাস, আমরা ভালোটাকে যত তাড়াতাড়ি গ্রহন করি, বিপরীতটি থেকে ততই দুরে থাকার চেষ্টা করি।

আজ দেশ এগিয়েছে অনেক দুর,চিকিৎসা পদ্ধতি মানুষের দৌড় গোড়ায়,তবুও কি জাহিদ ভাইদের মত প্রখর মেধাবী সন্তানেরা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ধুঁকে ধুঁকে বিনা চিকিৎসায় আমাদের চোখের সামনে তার প্রাণপ্রদীপ নিভে যাবে? এ সমাজ যখন উন্নয়নের উচ্চ শিখরে।তাই আমাদের একটু ভাবতে হবে দশের লাঠি একের বুঝা।যদি আমার অনুভূতি, আমার লেখার মাধ্যমে আমাদের সমাজের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র আবারও যদি ফিরে পায় তার স্বাভাবিক জীবন, তাহলেই আমার/ আমাদের দায়বদ্ধতা / সমাজের দায়বদ্ধতা থেকে হয়তো আমরা একটু হলেও মুক্তি পেতে পারি।পরিশেষে আমার একান্ত নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশ করার মধ্যে কোন তথ্যগত ভুল থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার প্রত্যাশা রইলো।
চলবে,,,,,,,

লেখক: মোঃ মুকুল হোসেন জিন্নাহ
বিএসএস( সন্মান) এমএমএস, অর্থনীতি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
এলএলবি,জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

এবিএ/ ০১ ফেব্রুয়ারী