এখন পুলিশি নির্যাতন থেকে মানুষ বাঁচার আবেদন করছে – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

এখন পুলিশি নির্যাতন থেকে মানুষ বাঁচার আবেদন করছে

প্রকাশিত: ৪:৪৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০১৬

এখন পুলিশি নির্যাতন থেকে মানুষ বাঁচার আবেদন করছে

as12পুলিশের অভ্যন্তরে অপরাধ বেড়েই চলছে। রাজনৈতিকভাবে পুলিশকে অতিমাত্রায় ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ‘সবাই পুলিশের ধর্ম’র বদলে  পুলিশি নির্যাতন থেকে এখন মানুষ বাঁচার আবেদন করছে। অথচ জনগণের রক সেই পুলিশেরই অনেক সদস্য জড়িয়ে পড়ছেন নানাবিধ অপরাধকর্মে। শুধু জড়িয়ে পড়াই নয়, দিন দিন এ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে অপরাধী তো বটেই, সেই সঙ্গে পুলিশ-ভীতিও কাজ করছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অনেকে বিপদে পড়লেও সহজে থানামুখী হতে আগ্রহী হন না। কারণ হিসেবে তারা বলেন, থানায় গেলে বিপদ তো কমেই না, উল্টো হয়রানি বাড়ে। এমনকি পুলিশের অভ্যন্তরে দুর্নীতি বেড়ে গেছে।  বরিশালের মেট্রোতে ৭৭ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার প্রমাণ পাওয়ায় উপ-পুলিশ কমিশনার জিল্লুর রহমানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। জানা গেছে, অসাধু পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অহরহ অভিযোগ জমা পড়ছে পুলিশ সদর দফতর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এসব অভিযোগের মধ্যে আছেÑ জনসাধারণের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, মতার অপব্যবহার করে অর্থ উপার্জন, ঘুষ আদায়, চাঁদাবাজি, নারী কেলেঙ্কারি, মাদক ব্যবসা ইত্যাদি। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে গত ১৭ জুন ঢাকার পুলিশ কমিশনারের অফিস আদেশে। ওই আদেশে কতিপয় পুলিশ সদস্যের সাম্প্রতিক বিভিন্ন কুকীর্তি তুলে ধরে ঢাকার সব ইউনিট ইনচার্জকে তাদের অধীন পুলিশ সদস্যদের চালচলন, চলাফেরা, আচরণ ইত্যাদি নিবিড়ভাবে পর্যবেণে রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধী পুলিশ সদস্যদের কঠোর বিভাগীয় বা আইনগত শাস্তির আওতায় আনতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি রায় এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মরিয়া পুলিশ সদর দফতর। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলা হচ্ছে। অভিযোগ তদন্ত করে নেয়া হচ্ছে ব্যবস্থা।   পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতার কারণে ১৪ হাজার ৫০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয় পুলিশ সদর দফতর। কিন্তু এতে অপরাধপ্রবণতা কমেনি। উল্টো ২০১৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৫০০ জনে। অর্থাৎ ১ বছরে সাজাপ্রাপ্ত পুলিশের সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার। আর চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে এ সংখ্যা ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি বলে জানা গেছে। : আরো জানা গেছে, রাজধানীর কাফরুলে ১৭ বছরের এক কিশোরীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মোহাম্মদপুর জোনের এসি শেখ রাজিবুল হাসান। প্রথম স্ত্রীর কথা গোপন রেখে ও মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে ওই কিশোরীকে তুলে নিয়ে যান তিনি। এক পর্যায়ে গোপনে তাকে বিয়েও করেন। প্রথম দিকে সেই কিশোরীকে তুলে নেয়ার কথা অস্বীকার করলেও পরে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেন এসি রাজিবুল। : এদিকে গত বছরের মাঝামাঝি পল্লবী থানায় জনি নামে এক বিহারিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে এসআই জাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে। জনির সঙ্গে আটককৃত অন্যদের সামনেই এ ঘটনা ঘটে। তবে প্রথমাবস্থায় জনির মৃত্যু ‘হার্ট অ্যাটাকে’ হয়েছে বলে চালিয়ে দেয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে এসআই জাহিদুরকে গ্রেফতার করা হয়। গত ২২ মে ফেনী থেকে ৭ লাখ ইয়াবাসহ পুলিশের এএসআই মাহফুজুর রহমানকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এ সময় তার গাড়িচালক জাবেদকেও গ্রেফতার করা হয়। গত ১১ মে রাজধানীর মুগদায় এএসআই কলিমুর রহমান ও তার বন্ধুরা এক নারী কনস্টেবলকে গণধর্ষণ করেন। অভিযুক্ত ওই পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনার শিকার কনস্টেবলের সাবেক স্বামী। পরে কক্সবাজার থেকে কলিমুরকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ভালবাসা দিবস উপলক্ষে মিরপুর রোডের প্রিন্স প্লাজা প্রিন্স রেস্টুরেন্ট এন্ড পার্টি সেন্টারে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা  এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ছাত্র-ছাত্রীরা  আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তেজগাঁও পুলিশ কমিশনারের অনুমতিপত্র নিয়ে নিকটস্থ শেরেবাংলানগর থানায় অবহিত করে তারা অনুষ্ঠান শুরুর প্রস্তুতি নিলেও রাত সাড়ে ১২টায় শেরেবাংলানগর থানার কয়েকজন পুলিশ গিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। তারা  মূল অনুষ্ঠানের সংগঠক  রাজিব, বাবলু, মাইনুল ইসলাম মানিক মিল্টন, মুস্তাককে বিনা অপরাধে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ কর্মকর্তারা মিল্টন, রাজিব ও মাইনুল ইসলাম মানিকের ওপর অমানবিক নির্যাতন করে।  এতে মাইনুল ইসলাম মানিক ও তার বন্ধুরা গুরুতর আহত হলে পুলিশ তাদেরকে নিকটস্থ একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসা দিয়ে রাত আড়াইটার দিকে আবারও থানায় এনে নির্যাতন করে। তাদের অপরাধ তারা পুলিশের এসআইকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দেয়নি। টাকা না পেয়ে তারা মিথ্যা মামলা এমনকি ক্রস ফায়ারের হুমকি দেয়। এক পর্যায়ে তাদের অভিভাবকদের ডেকে এনে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে ওই পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশ মিল্টনের স্ত্রীর সঙ্গেও অশোভন আচরণ করে। এই অমানবিক নির্যাতনের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসকাবে একটি সামাজিক সংগঠন সমাবেশের আয়োজন করে। সেখানে বাবলু মাইনুল ইসলাম মানিকসহ ভুক্তভোগীরা অংশ নেয়। আয়োজকরা তাদের বক্তব্য নেয়।   : এদিকে গতকাল পুলিশ হেডকোয়র্টারের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়Ñ শৃঙ্খলা ভঙ্গ, অসদাচরণ, দুর্নীতি এবং পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি ুণœœ করার অভিযোগে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (নর্থ) জিল্লুুুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে সিলেট রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তদন্তে তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। হেডকোয়ার্টার্সের রিপোর্টের প্রেেিত  গতকাল বুধবার বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে। : বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, অপরাধীর বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। কেউ কোনো ফৌজদারি অপরাধ, দুর্নীতি করলে সে পুলিশ হিসেবে গণ্য হবে না। তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধীকে কোনভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে। যারা শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অসদাচরণ করবে তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। : উল্লেখ্য, পদোন্নতির জন্য ঘুষের টাকা সংগ্রহে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের নিম্ন পদের পুলিশ সদস্যদেরকে প্রলুব্ধ বা উদ্বুদ্ধ করেছেন- এমন অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। ‘ডিসিপ্লিন এন্ড প্রফেসশনাল স্ট্যার্ন্ডাড’ শাখা ওই বিষয়টিতে অনুসন্ধানে নামে। স্যা প্রমাণের ভিত্তিতেই জিল্লুুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করার সুপারিশ করেছিলেন আইজিপি। : রাজধানীতে ডিবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে তুলে নেয়ার অভিযোগ : রাজধানীর পল্লবী থেকে ফজলুল হক করিম নামে এক ব্যবসায়ীকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বৃষ্টি। তার দাবি, ২৫ জুন বিকেল ৪টায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে কিছু লোক ফজলুল হক করিমকে তুলে নিয়ে যায়। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসকাবের হলরুমে সংবাদ সম্মেলনে স্বামীকে ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তপে কামনা করেন তাহমিনা আক্তার বৃষ্টি। : তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ডিবির এসআই আব্দুল আলী ও নজরুল ইসলামসহ চারজন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর পৌনে ৩টায় মাইক্রোবাসে তুলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যান। এক কোটি টাকা দাবি করে তারা আমার স্বামীকে মারধর করলে ১০ লাখ টাকা দিতে রাজি হই।’ তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘তারা আমার স্বামীর নামে থাকা দুটি ফ্যাট ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে জোর করে লিখিয়ে নেয়। ডিবি আমার স্বামীকে বাস পোড়ানো মামলায় জড়িয়ে কোর্টে চালান দেয়। এমনকি বাঁচতে হলে এক কোটি টাকা চাঁদা দিতে হবে বলেও হুমকি দেয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘ফজলুল হক করিমকে ২০ এপ্রিল হাইকোর্ট জামিন দেয়। জামিন পেয়ে তিনি এসব ঘটনার প্রতিকার চেয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের ডিআইজি এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেেিত অতিরিক্ত ডিআইজি তদন্তের নোটিশ জারি করেন।’ তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘নোটিশ জারির দিনই আমার স্বামীকে ডিবি আবার তুলে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ মেলেনি। এ ব্যাপারে পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়রিও করেছি।’ : এ সময় তিনি স্বামীকে ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে আবেদন জানান। সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ ফজলুল হক করিমের স্ত্রী ছাড়াও তার মেয়ে তানহা হক মিম (১৫), ছেলে তুর্য (০৫) ও ভাগ্নে একরামুল হক উপস্থিত ছিলেন।

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল