এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বর্ণাঢ্য জীবন – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বর্ণাঢ্য জীবন

প্রকাশিত: ৫:৪৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৭

এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বর্ণাঢ্য জীবন

চট্টগ্রামের স্বপ্নময় এক রাজনৈতিক ‘ফেরিওয়ালার’ প্রয়াণ ঘটল। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক মেয়র আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অনেক উত্থান-পতনের স্বাক্ষী চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষ।

৭৪ বছরের জীবনে মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের মেয়র ছিলেন ১৬ বছর। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ এক ইতিহাস রয়েছে তার। এবিএম মহিউদ্দিন এ ইতিহাসের স্তম্ভ। ১৯৪৪ এর পহেলা ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জন্ম। পিতার নাম মরহুম হোসেন আহমদ চৌধুরী আর মাতা মরহুম বেদৌরা বেগম। আট ভাইবোনের মাঝে মহিউদ্দিন মেঝো। পিতা চাকরি করতেন আসাম বেংগল রেলওয়েতে। পিতার চাকরির সুবাদে মহিউদ্দিন পরাশুনা করেছেন মাইজদি জেলা স্কুল, কাজেম আলি ইংলিশ হাই, আর প্রবর্তক সংঘে। স্কুল জীবনেই জড়িয়ে পরেন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে।

মাধ্যমিকের শেষে বাবার আদেশে ভর্তি হয়েছিলেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোর্সে। সেখানের পাঠ না চুকিয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রামের অন্যতম বিদ্যাপিঠ চট্টগ্রাম কলেজে। বছর না ঘুরতেই কমার্স কলেজ, আর শেষ মেষ সিটি কলেজ। সিটি কলেজেই তার বিপ্লবী রাজনৈতীক জীবনের হাতেখড়ি পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।

রাজনৈতিক জীবনের শুরতেই সান্নিধ্যে আসেন জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর। বঙ্গবন্ধুর ডাকে আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে গ্রেফতার হন অসংখ্যবার। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে আইএসআইয়ের চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমি সদরদপ্তরের কাছে গ্রফতার হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন দীর্ঘ চার মাস। সেই নির্যাতনের চিহ্ন মহিউদ্দীনের শরীরে এখনো রয়েছে। তার গ্রেফতারের খবরে ততদিনে ভারতের একটি মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে শহীদ মহিউদ্দীন ক্যাম্প খোলা হয়েছিল। বেঁচে থাকার কথা ছিল না তার। তবে কাকতালীয়ভাবে একদিন মানসিক রোগীর নাটক করে চট্টগ্রাম কারাগার থেকে পালিয়ে আসেন মহিউদ্দিন। পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে সক্রিয়ভাবে সম্মুখসমরে অংশ নেন। ছিলেন ভারত-বাংলা যৌথবাহিনীর মাউন্টেন ডিভিশনের অধীন।

দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ঝাপিয়ে পরেন নতুন সংগ্রামে। বঙ্গবন্ধুর খুবই কাছের আর আদরের ছাত্রনেতা ছিলেন মহিউদ্দীন। কিন্তু তৎকালীন সময়ে প্রবল ক্ষমতাশালী হয়েও ক্ষমতার মোহ থেকে দূরে ছিলেন এই নেতা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন না যেতেই ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হন বাংলাদেশের প্রাণপুরুষ ও স্থপতি বঙ্গবন্ধু। অল্পের জন্য মহিউদ্দিন ধরা পরা থেকে বেঁচে যান, মৃত্যুবরণ করেন সাথী মৌলভি সৈয়দ। পালিয়ে গিয়ে ভারতে প্রতিবিপ্লবীদের সাথে যোগ দেন। লক্ষ্য সামরিক জান্তা মুশতাককে সামরিকভাবেই পরাস্ত করা। কিছুদিন পরেই তিনি দলের নির্দেশে পন্হা পরিবর্তন করে আবার সক্রিয় হন প্রকাশ্য রাজনীতিতে।

দেশে এসেই একের পর এক হুলিয়া। সামরিক বাহিনীর হাতে নির্যাতন আর একের পর এক কারাভোগ। তখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়া ক্ষমতায় থাকার কারণেও নির্যাতনের শিকার নয়।

পরে অদম্য মহিউদ্দীন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে দলবল নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার জন্য ঝাপিয়ে পরলেন। সব বাধা অতিক্রম করে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে দলের কাণ্ডারীর দায়িত্ব নিতে সহয়তা করেন।

ক্ষমতার পালাবদলে স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এ সময় চট্টগ্রামে এরশাদকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেন মহিউদ্দিন। ফলে আবারও রাজনৈতিক বন্দী হতে হয় তাকে। ততদিনে চট্টগ্রামের আপামর জনতার নয়নমনি হয়ে ওঠেন মহিউদ্দীন চৌধুরী।

পরবর্তীতে নব্বইয়ের গনআন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির অন্যতম ‘যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।

এতকিছুর পরও থেমে থাকেননি এই উদ্যমী জননেতা। গণমানুষের তথা চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্রমাগত ছুটে চলেছেন। উপেক্ষা করেছেন রক্তচক্ষু। চালিয়ে গেছেন উন্নয়নের চাকা। উড়িয়ে চলেছেন অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনীতি আর মুল্যবোধের পতাকা।

সর্বশেষ নির্যাতিত হন রাজনীতি ওয়ান ইলেভেনের শাসনামলে। ষাটোর্ধ বয়সে এ সময় তিনি কারান্তরীণ ছিলেন দীর্ঘ দুই বছর। এরমধ্যে ইন্তেকাল করেন আদরের মেয়ে ফওজিয়া সুলতানা টুম্পা। তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেয়েকে দেখতেও দেননি তখন।

জনগণের ভোটে তিন তিনবারের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন মহিউদ্দীন। জনতার রায়ে তাদের ভালবাসায় স্নিগ্ধ হয়েছেন বার বার।

বিভিন্ন পরিক্রমায় আজ সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন চট্টগ্রামের রাজনীতিন এই প্রাণপুরুষ।