এরপর কী? -ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

এরপর কী? -ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

প্রকাশিত: ১:৫০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০১৭

এরপর কী? -ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

এরপর কী? কেউ জানে না, এরপর কী? মিয়ানমার কি তার নাগরিক রোহিঙ্গা মুসলমানদের ফিরিয়ে নেবে? জাতিসঙ্ঘসহ কোনো কর্তৃপক্ষ কি মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করতে পারবে? বাংলাদেশকে কি আগের মতোই রোহিঙ্গাদের বোঝা টেনেই যেতে হবে? আমরা কি তাদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতেই থাকব? যে সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা আগে থেকেই বাংলাদেশে রয়েছে, তাদের অনেকেই বাংলাদেশের মানুষের সাথে মিশে গেছে। তাদের জন্য ছেড়ে দিতে হয়েছে বিরাট বনভূমি। এবার নতুন করে যে ছয় লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার বাহিনী ও সেখানকার বৌদ্ধ নাগরিকদের পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের জন্যও উজাড় হবে বিশাল বনভূমি।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর অবর্ণনীয় নির্যাতন চলছেই। নিরাপদ আশ্রয় পেতে তাই এখনো হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আমরা আশ্রয় দিচ্ছি। যেন মিয়ানমার সরকার ও বাহিনীর কাছে আমরা অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করছি।

বিএনপিকে গালিগালাজ করা ছাড়া বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ও হোমড়াচোমড়াদের আর কোনো কাজ আছে বলে মনে হয় না। এদেরই একজন আদালতে দণ্ডিত খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। তিনি যখন বিএনপি ও আদালতকে গালিগালাজে ব্যস্ত, ততক্ষণে খাদ্যের মজুদ প্রায় শূন্যের কোঠায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। হু হু করে বেড়েছে চালের দাম। ৩০ টাকার চাল ৬০ টাকা হয়েছে, কিন্তু সেদিকে তার মনোযোগ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুশি করার জন্য তিনি নানা অনুষ্ঠানে বিএনপিকে গালাগাল করে যাচ্ছিলেন।

এখন বিশ্বব্যাংক বলছে, সরকারের সিদ্ধান্তহীনতায়ই চালের দাম বেড়েছে। অর্থাৎ যখন দেখা গেল চালের ভাণ্ডার শূন্য হয়ে যাচ্ছে, তখন সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যখন চালের মজুদ মাত্র আড়াই লাখ টনে নেমে এসেছে, তখন সরকার দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। বাজার চলে যায় নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে। সরকার দেশে দেশে ঘুরতে থাকে। চাল পাওয়া যায় না। এরপর এই নির্লজ্জ মন্ত্রী চালের জন্য সস্ত্রীক গেছেন মিয়ানমার। সেখানেও কোনো সুবিধা করতে পারেননি। যে মিয়ানমার ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দিয়ে এখানে এক মহাবিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে, তাদের কাছ থেকে চাল কিনতে গেছেন খাদ্যমন্ত্রী। তিনি অবশ্য বলেছেন, এই সফরের আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়েছেন। ব্যাপারটা বেশ মজার। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী নিজেও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে ঠেলে দেয়ার ঘটনায় কিছু মনে করেননি। রোহিঙ্গার জায়গায় রোহিঙ্গা থাক। চালের জায়গায় চাল। আমাদের কূটনীতি বা পররাষ্ট্রনীতির এমনই বেহাল দশা।

সরকার এখন কিছুতে নেই, কিচ্ছুতে নেই। কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি রাষ্ট্রেরই দূতাবাসে আন্ডার কভার গোয়েন্দা সংস্থার লোক থাকে। রোহিঙ্গা সমস্যার কারণে মিয়ানমারের সে রকম গোয়েন্দা নজরদারি থাকার কথা। যদি থাকে, তবে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। রাখাইন প্রদেশের প্রধান শহর মংডু। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে ২৫ আগস্ট থেকে। কিন্তু ২১ আগস্ট থেকেই মংডুতে ব্যাপক সেনাসমাবেশ শুরু হয়। আর রোহিঙ্গা মুসলিম এলাকায় তাদের আতঙ্কিত করার জন্য টহল শুরু করে। তখনই আমাদের বোঝা উচিত ছিল, মিয়ানমার বাহিনী ওই এলাকায় ব্যাপক হামলার পরিকল্পনা করছে। সাথে সাথে যদি আমরা গোটা বিশ্বে শোরগোল তুলতে পারতাম, ১৯৯১ সালের মতো সেনা মোতায়েন করে মিয়ানমারকে বুঝিয়ে দিতে পারতাম যে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার কাজটি সহজ হবে না; তাহলে আজকের এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। এ থেকে প্রমাণিত হয়, আমাদের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিল চরমে। আমরা আঁচই করতে পারিনি, এত বড় একটা বিপদ আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে।

আধুনিক পৃথিবীতে এত বড় মানবিক বিপর্যয় আর ঘটেনি। আরাকানে যে পৈশাচিক বর্বর নিষ্ঠুর গণহত্যাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছে, সে রকম ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালেও ঘটেনি। এই গণহত্যা বসনিয়া হার্জেগোভিনার গণহত্যাকেও ম্লান করে দিয়েছে। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার গণহত্যার জন্য মিলোসেভিচের বিচার হয়েছে। তাহলে আরাকানের গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির কি বিচার হবে না? ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় বসেছিলেন আন্তর্জাতিক গণ-আদালত। সে আদালতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতার চিত্র ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের জন্য সে প্রমাণ যথেষ্ট। তা ছাড়া ওই আন্তর্জাতিক গণ-আদালতে নির্যাতিতদের জবানবন্দীও নেয়া হয়েছে। বিশ্বের নামকরা মানবাধিকার সংগঠক, কর্মী ও আইনজীবীরা তাতে অংশ নিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। কিন্তু এর নৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। আজ হোক কাল হোক এসব প্রমাণ গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। বিচার এদের হতেই হবে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন প্রমাণিত হয়েছে, তিনি শান্তি নয়, এক রক্তপিপাসু হায়েনায় রূপান্তরিত হয়েছেন।

মিয়ানমারের এই গণহত্যার পক্ষে দাঁড়িয়েছে চীন, ভারত ও রাশিয়া। এ কথা সবাই জানেন, মিয়ানমারে ওই তিন দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশেও তাদের প্রায় একই মাত্রায় অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। তারপরও ওই তিন দেশ কেন নিরপেক্ষ না থেকে জাতিগত নির্মূল অভিযানে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে? আমাদের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি আগাম ভেবে দেখার দরকার ছিল। এটাই কূটনীতি। আসলে এ তিন দেশকে চাপ দেয়ার জন্য আমাদের হাতে কোনো ‘মুরগা’ নেই। আমরা সবকে সব কিছু উজাড় করে দিয়ে দিয়েছি। হাতে কিছু নেই। আজ আমাদের হাতে যদি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোনো কার্ড থাকত, তাহলে আমরা ভারতের সাথে দেনদরবার করতে পারতাম। যদি আমরা ভারতকে বিনা শর্তে ট্রানজিট করিডোর সড়ক বন্দর না দিতাম, তাহলে ভারত আমাদের কথা স্মরণ রাখত। এসব পেয়ে যাওয়ার ফলে ভারতের নীতিনির্ধারককেরা এখন মিয়ানমারের দিকেই বেশি মনোযোগী। এমনকি ভারতের সাবেক এক পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতের আর পাওয়ার কিছু নেই; কিন্তু মিয়ানমারের কাছে পাওয়ার আছে অনেক কিছু। ফলে ভারতকে অবশ্যই মিয়ামনারের পাশে থাকতে হবে।

রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক বসেছিল। টিভি-টকশোতে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা গলা ফাটিয়ে বলছিলেন, বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে এতটাই সফল হয়েছে যে, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ নিশ্চয়ই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। রাশিয়া ও চীনের প্রকাশ্য বিরোধিতার কারণে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের ভাগ্যে শূন্যই জুটেছে। আমরা যারা আশঙ্কা করছিলাম, নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বাংলাদেশের অনুকূলে ইতিবাচক কিছুই হবে না, তারা কিছুটা সমালোচনার পাত্র হয়েছিলাম। কিন্তু হয়নি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ এনেছেন। কারণ, চীন ও রাশিয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ পাঠিয়েছে; কিন্তু তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করার ব্যাপারে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগে সমর্থন করেনি। তবে ওবায়দুল কাদের ভাশুরের নাম নেননি।

ভারতও একই কাজ করেছে। ত্রাণ পাঠিয়েছে, কিন্তু মিয়ানমারের পক্ষাবলম্বন করেছে। তাহলে ভারতের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠবে না কেন। ভাশুরকে বড় ভয়, নাকি তোষণ? চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশে যে বিপুল বিনিয়োগ করেছে, অস্ত্র বিক্রির যেসব চুক্তি করেছে, তাতে আমরা কোনো ‘সেফটি ক্লজ’ রাখিনি। সম্পূর্ণরূপে ওই দুই দেশের ইচ্ছানুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এখন ফেরার পথ বন্ধ। ফলে রোহিঙ্গাদের বোঝা নিয়তি হিসেবে নেয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। সেটা প্রধানমন্ত্রীর কথায়ও স্পষ্ট হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা যদি ১৬ কোটি লোককে খাওয়াতে পারি, তাহলে আরো ১০ লাখ লোককে খাওয়াতে পারব। প্রয়োজনে তাদের সাথে ভাগাভাগি করে খাবো। এর অর্থ দাঁড়ায়, আমরা বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনন্তকালের জন্য অবস্থান মেনে নিয়েছি। মেনেই যদি নিয়ে থাকি, তাহলে তাদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর বদলে মূল জনশক্তির সাথে মিলিয়ে কর্মীর হাতে রূপান্তরিত করা দরকার।

এখানেও মিয়ানমারের সাথে দেনদরবার করার জন্য আমাদের হাতে কোনো ঘুঁটি নেই। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তারা নানা অঞ্চলে ছড়িয়েও পড়েছে। বাংলাদেশী পাসপোর্ট করে বিদেশে গিয়ে তারা নানা অপরাধে জড়িয়েও পড়ছে, যাতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের দুর্নাম হচ্ছে। কিন্তু তা না করে দেনদরবারের জন্য একটি ঘুঁটি তৈরি করার দরকার ছিল।
গোটা বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিও কিন্তু তাই। শুধু জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ছাড়া আর কেউ বলেনি, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারকে অবশ্যই ফেরত নিতে হবে। প্রত্যেকে আশ্রয়ের কথা বলেছে, থাকার জায়গা তৈরি করে দেয়ার ব্যবস্থার কথা বলেছে, খাওয়ানোর জন্য ত্রাণসাহায্য দেয়ার কথা বলেছে; কিন্তু তাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলেনি। আর মিয়ানমার সরকার চরম মিথ্যাবাদী, ভণ্ড ও প্রতারক। ১৯৯১ সালে তারা বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করেছিল, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে। তখন বাংলাদেশে ছিল চার লাখ রোহিঙ্গা। তাদের মধ্য থেকে মাত্র কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফিরিয়ে নিয়েছিল। তারপর আর কাউকে ফেরত নেয়নি। এবারো যদি তারা সেরকম কোনো চুক্তি করে, তাহলেও নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, তারা কথা রাখবে।

কূটনীতির নিয়মই হলো, প্রত্যেকের হাতে একটা ‘মুরগা’ থাকা চাই, আমাদের তা নেই। ‘মুরগা’ না থাকলে একটি জাতি প্রতিবেশীদের সামনে বড় অসহায় হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে যখন রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দরকষাকষির একপর্যায়ে বলেছিলেন, ‘উই মাস্ট হ্যাভ এ কক ইন আওয়ার হ্যান্ড’ (আমাদের হাতে অবশ্যই একটা মুরগা থাকা দরকার)। অর্থাৎ জার্মানি চাই যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। স্ট্যালিনের দোভাষী কক-এর ভিন্ন মানেও তাকে জানালেন। এতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট স্ট্যালিন ক্ষুব্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে এই বলে বার্লিন দখলের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, ‘উই মাস্ট হ্যাভ এ কক ইন আওয়ার হ্যান্ড অলসো’ (আমাদের হাতেও অবশ্যই একটা মুরগা থাকতে হবে।) বাংলাদেশের হাতে কোনো মুরগা নেই।হ

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক