ওসমানীনগরে খাদ্যগুদামে কর্মরতদের দুর্নীতি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ওসমানীনগরে খাদ্যগুদামে কর্মরতদের দুর্নীতি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা

প্রকাশিত: ৫:২৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০

ওসমানীনগরে খাদ্যগুদামে কর্মরতদের দুর্নীতি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা

সিলেটের দিনকাল ডেস্ক:
সরকারিভাবে ধান সংগ্রহে ধীরগতি ও কৃষকদের নিরুৎসাহিত করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান ক্রয়ের অভিযোগ উঠেছে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার খাদ্যগুদামে কর্মরত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। সরকারিভাবে ধান ক্রয় কর্মসূচিকে পূঁজি করে লুটপাটে মেতে উঠেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে উৎপাদনকারী প্রকৃত কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের দেয়া প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা- এমন অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

এ ব্যাপারে কৃষকরা ধান সংগ্রহে সংশ্লিষ্টদের দূর্নীতির বিষয়টি বার বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের মৌখিকভাবে অবগত করলেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় গত সোমবার উপজেলার ভুক্তভোগী কৃষকদের পক্ষ থেকে কয়েকজন কৃষক স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বরাবর।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত এল এস ডি মূর্শেদা বেগমসহ সংশ্লিষ্টরা প্রতিটন ২৬ হাজার টাকার ধান কিনতে ২ হাজার টাকা বাধ্যতামূলক ঘুষ নিচ্ছেন। প্রতি টন ধানের সাথে ৩/৪ মন বাড়তি দিতে হচ্ছে প্রকৃত কৃষকদের। এসবের বাইরেও সাধারণ কৃষক ধান নিয়ে এলে ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে পারছে না। সরকারের খাদ্য মন্ত্রনালয়ের অধিনে ২৬ টাকা কেজি দরে ধান কেনার ঘোষনা দিলেও এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন ওসমানীনগরের প্রকৃত কৃষক। খাদ্য গুদামের দ্বায়িত্বে থাকা মোর্শেদা বেগমের নিযুক্ত সিন্ডিকেট, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের বা কতিপয় সরকার দলীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যম ছাড়া ১ কেজি ধানও সরকারী গুদামে ঢুকাচ্ছেননা এ উপজেলায় কর্মসূচির বাস্থবায়নকারীরা।

সরেজমিনে খাদ্যগুদামে গিয়ে দেখা গেছে, কয়েকটি বড় বড় ট্রাকে করে ধান এনে রাতেও গুদামে ঢুকানো হচ্ছে। গুদামে কৃষি কার্ড নিয়ে আসা উপজেলার রাতখাই গ্রামের কৃষক কদ্দুছ মিয়া, পংকি মিয়া,আপ্তাব আলী, বড় ধিরারাই গ্রামের কৃষক দোলন দেব নাথ জানান,তাদের নিজস্ব কোন ধান নেই। স্থানীয় খালিছ মিয়া ও আনছার মিয়া নামের দুই ব্যাক্তি খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা মোর্শেদা বেগম সহ সংশ্লিষ্টদের চুক্তি করে তাদের কার্ড ব্যবহার করে ধান দিচ্ছেন ওই ব্যবসায়ীরা। মূলত কৃষকের কার্ড ব্যবহার করা হলেও সব ধান ব্যবসায়ীদের। তারা টাকা তুলে দেওয়ার জন্য গুদামে এসেছেন।

কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করে বলেন, গুদামের দ্বায়িত্বে থাকা মোর্শেদা বেগমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণ কৃষক ধান নিয়ে আসলে ধানে আর্দ্রতা বেশি বা ভিজা ও চিটা আছে বলে তাকে ফেরত দিয়ে দিচ্ছেন। অপর দিকে তাদের নিযুক্ত সিন্ডিকেট ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের গোটি কয়েক কতিপয় নেতা, পঁচা ধান গুদামে ঢুকাচ্ছেন। কয়েকজন কৃষক পঁচা ধান গুদামে ঢুকাচ্ছেন মঙ্গলবার এমন খবর পেয়ে সরজমিনে যাওয়ার পর ওই কৃষকরা জানায়, তাদের কোনো জমি নেই আমন ধানও নেই। মূলত এক ব্যবসায়ী তাদের নিয়ে এসেছে তার ধান বিক্রি করার জন্য। তাদের স্বাক্ষর দিতে হবে তাই তারা ওই ব্যবসায়ীদের অনুরুধে এখানে এসেছেন। পরে সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে ব্যবসায়ীর পরিচয় না দিয়েই সবাই দ্রুত গুদাম থেকে বেড়িয়ে যান।

গোয়ালাবাজারের আব্দুল মুমিন ও আব্দুল হান্নান সহ একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন,আমরা সাধারণ কৃষকরা ধান নিয়ে খাদ্য গুদামে গেলে নিম্নমানের বলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে সিন্ডিকেটের সদস্যরা বড় বড় ট্রাকে করে পঁচা ধান গুদামে ডুকাচ্ছে। এখানে সরকারী ভাবে ধান সংগ্রহে কার্যক্রম এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে রক্ষকরাই বক্ষক হয়ে আছেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান চৌধুরী নাজলু বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষকের উন্নতিকল্পে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান কেনার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু কতিপয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ কতিপয় কিছু লোক নিজ স্বার্থ হাছিলে ব্যাস্ত। জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের উর্ধ্ধতন কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসলে উপজেলা আওয়ামীলীগের সার্বিক সহযোগিতা করবে।

উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত এল এসডি কর্মকর্তার দ্বায়িত্বে থাকা মোর্শেদা বেগম আর্থিক বাণিজ্যের অভিযোগগুলি অস্বিকার করে বলেন, একজন কর্মচারী এর সাথে জড়িত থাকায় তার বদলি হয়েছে। আমি আন্তরিকতার সাথে ধান সংগ্রহের কাযক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। গত বছরের ২০ ডিসেম্বর থেকে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করে ১৮ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ৬১৮ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী ১০ দিন আরও ৬শ টন ধান সংগ্রহ করতে সক্ষম হবেন বলে আশাবাদি তিনি। তবে অভিযোগগুলি ছোটকাট আখ্যা দিয়ে এ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন না করার জন্য অনুরোধ করেন তিনি।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত) আব্দুল আউয়াল ধান সংগ্রহের ধীর গতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমরা চেষ্ঠা করছি নিদিষ্ঠ লক্ষ্যমাত্রায় পৌছার। তবে অনিয়মের ব্যাপারে আমার জানা নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা: তাহমিনা আক্তার বলেন, সরকারের এ কার্যক্রমকে সঠিক ভাবে বাস্থবায়ন করতে আমি একাধিকবার সরেজমিনে খাদ্য গুদামের ধান সংগ্রহের কার্যক্রম পরিদর্শন করেছি। এরপরও যদি কোনো অনিয়ম থাকে তাহলে অবশ্যই বিষয়গুলি দেখব।

উল্লেখ্য, মৌসুমে সরকারিভাবে ১ হাজার ৬শত ১৮ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হবে। উপজেলা ধান ক্রয় কমিটির সিদ্ধান্তে একজন চাষি ৫শ কেজি থেকে সর্বোচ্চ এক মেট্রিক টন ধান বিক্রি করতে পারবেন। এ বছর সরকার প্রতি কেজি ধানের মূল্য নির্ধারণ করেছে ২৬ টাকা। তবে ১৮ই ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ওসমানীনগরে ৬শ১৮ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল