কখনও মুখ ফুটে বলেননি যে কথা! – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

কখনও মুখ ফুটে বলেননি যে কথা!

প্রকাশিত: ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২০

কখনও মুখ ফুটে বলেননি যে কথা!

অনলাইন ডেস্ক :

জীবনের সব নিঃশ্বাস খরচ করে ফেললেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। চলে গেলেন। মঙ্গলবার গানস্যালুটে শেষ হল তার শেষকৃত্য। এক অজাতশত্রু রাজনৈতিক নেতা যার সবচেয়ে বড় আস্থা ছিল সংবিধান, সংসদীয় গণতন্ত্র। নিজের অ্যাটাচিতে সবসময় রাখতেন নীল রঙের একটা ছোট্ট ভারতীয় সংবিধান।

ছেলেবেলার নাম ছিল পল্টু। বর্ষার সময় বাড়ি থেকে বহুদূরের স্কুলে পৌঁছনোর জন্য চাষের মাঠের আল ধরে হেঁটে যেতে হতো তাকে। বৃষ্টি হলে জামা আর হাফপ্যান্ট দুটোই স্কুলে আলাদা করে ব্যাগের মধ্যে রেখে যেত, পাছে সারাদিন ভেজা জামাকাপড় পরে থাকতে হয়।

পশ্চিমবঙ্গের অজপাড়াগাঁয়ের সেই ছেলেটিই একসময় হয়ে উঠলেন উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’। ইন্দিরা গান্ধীর নয়নমণি। হলেন ভারতের সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী। একবার নয়, দু’বার। হাফপ্যান্ট পরা ছেলেটির গায়ে উঠল গলা বন্ধ কোর্ট, মুখে পাইপ। মনমোহন সিংয়েরও অর্থমন্ত্রী হয়েছেন তিনি।

ভারত রাজনীতি যার নখের ডগায়, চোখের পলকে যিনি বিরোধীদের নাড়ি বুঝতেন, দল-বেদল সবার কাছেই ছিলেন ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’, অন্ধকার দিনে সবাইকে আলো দিতেন- সেই মানুষটিই কিনা তার অপূর্ণতার কথাটাই কখনও মুখ ফুটে বলতে পারেননি কাউকে।

কেউ কখনও তাকে বলতে শোনেনি সে কথা। সারজীবনই ‘নম্বর টু’ থেকে গেছেন। আস্থা-ভরসা-বিশ্বাস-ভালোবাসার ষোলআনা সত্ত্বেও তাকে কখনও প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি কংগ্রেস। ইন্দিরা গান্ধীর নম্বর টু। নরসিংহ রাওয়ের নম্বর টু। আবার মনমোহন সিংয়েরও নম্বর টু।

বহু সুযোগ এসেছিল দলের কাছে। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু, রাজীব গান্ধীর ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রিসভা স্থাপন। কিন্তু কোনোদিন প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী করাই হয়নি প্রণবকে।

এমনকি, ১৯৮৪ সালে বিপুল ভোটে জয়লাভের পর রাজীব গান্ধী যখন তার নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেছিলেন, তখন প্রণব মুখার্জি নামটাই ছিল না।

বইতে তিনি লিখেছেন, ‘আমি যখন মন্ত্রিসভা থেকে আমার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কথা জানলাম, তখন আমি বিধ্বস্ত এবং হতবাক হয়ে পড়েছিলাম। আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।’ পরে ১৯৮৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে একটি দল গঠন করেছিলেন তিনি।

রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পরও দল কিন্তু তাকে সেই পদ দেয়নি। বরং পদপ্রার্থী ছিলেন সোনিয়া গান্ধী।

একসময় রাজীব জায়াকেই হাতে ধরে রাজনীতির পাঠ দিয়েছিলেন প্রণব। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন না প্রণব! ২০১২ সালে দেশের ত্রয়োদশতম রাষ্ট্রপতি হলেন তিনি। প্রশাসনিক সর্বোচ্চ পদের দায়িত্ব নিপুণভাবে সামলানো প্রণব মুখার্জির কি প্রধানমন্ত্রী পদ না পাওয়ার কোনো আক্ষেপ ছিল? অজানাই থেকে গেল!

রাজনীতির ষোলকলাসিদ্ধ এই মানুষটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বরাবরই সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। নম্বর টু। তিনি ইন্দিরার নম্বর টু। তিনি নরসিংহ রাওয়ের নম্বর টু। আবার মনমোহন সিংয়ের ও নম্বর টু। তাই বারবার এই নম্বর টু হওয়াটা বোধহয় প্রণববাবুর কাছে সন্তোষের কারণ ছিল না।

বিশেষত মনমোহন যেদিন প্রধানমন্ত্রী হলেন। সোনিয়া যেদিন মনমোহনকে মনোনীত করলেন, সেদিন তার মুড ভালো ছিল না। তিনি আশা করেছিলেন সেবার বাজপেয়িরাজের অবসানের পর কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় এলো তখন তিনিই ছিলেন বেস্টচয়েস!

তবু শেষজীবন পর্যন্ত কংগ্রেস ত্যাগ করেননি। হয়তো ইন্দিরা গান্ধীর সেই গুরু বচনটিই বেলাশেষের সান্ত্বনা ছিল তার- “একজন ছ’ফুট লম্বা লোককে চারদিন না খাইয়ে রাখলে সে লোকটা রোগা হয়ে যেতে পারে, তার ওজন কমে যেতে পারে কিন্তু তার উচ্চতা কিন্তু তুমি কমাতে পারো না।
সুত্র : যুগান্তর

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল