কচুয়াবহর-মির্জাপুরস্থ এশিয়ান হাইওয়ে, ফেঞ্চুগঞ্জের মৃত্যুকূপ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

কচুয়াবহর-মির্জাপুরস্থ এশিয়ান হাইওয়ে, ফেঞ্চুগঞ্জের মৃত্যুকূপ

প্রকাশিত: ৯:৪১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২০

কচুয়াবহর-মির্জাপুরস্থ এশিয়ান হাইওয়ে, ফেঞ্চুগঞ্জের মৃত্যুকূপ

 

ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিনিধি :: সিলেট-মৌলভীবাজার মহাসড়কের দুই জেলার মধ্যবর্তী বর্ডার এলাকা হচ্ছে মির্জাপুর গ্রাম। সিলেট জেলার দক্ষিণাংশে অবস্থিত কচুয়াবহর-পালবাড়ী পেট্রোল পাম্প থেকে জেলা বর্ডার মির্জাপুর পর্যন্ত কিলোমিটার দুই-এক বিস্তৃত এশিয়ান হাইওয়ে এলাকা স্থানীয়দের জীবন ব্যবস্থায় ভীতির সঞ্চার করেছে। বিশেষত, কচুয়াবহরস্থ শেখ তজমুল আলী চেয়ারম্যান সড়কের সম্মুখ প্রান্ত হইতে মির্জাপুর মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় প্রায় প্রতি বছরেই প্রাণ হারাতে হচ্ছে কাউকে না কাউকে। নব্বই দশক থেকে এখন পর্যন্ত গাড়ির নিচে চাপা পড়েছেন প্রায় অর্ধশতাধিক তরুণ-যুবক, নারী ও শিশু। আজীবনের জন্য পঙ্গুত্বকে বরণ করে নিয়েছেন অনেকেই।

 

এলাকাবাসী কর্তৃক এশিয়ান হাইওয়ের রেড জোন স্বীকৃত এই পরিসীমায় রয়েছে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মাদরাসা, পাঁচটি মসজিদ, দুটি শাহী ঈদগাহ্, একটি মন্দির, একটি এতিমখানা, বিস্তৃর্ণ হাওর-ক্ষেত, হযরত মাইয়্যাম শাহ (রঃ)’র মাজার সহ বেশ কয়েকটি ঘনবসতিপূর্ণ হটস্পট। তা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট এলাকায় অর্ধদৃশ্যমান দুই-একটি দিক নির্দেশক সাইনবোর্ড ছাড়া নেই কোনো জেব্রা ক্রসিং বা জীবন রক্ষাকারী গতি নিয়ন্ত্রক।

 

 

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে স্থানীয় কলামিস্ট এফ এইচ ফারহানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কচুয়াবহর-মির্জাপুরস্থ এশিয়ান হাইওয়ে হচ্ছে আমাদের ঘর থেকে বাহির হওয়ার একমাত্র বহির্গমন পথ। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আমরা এটা শুনে বড় হচ্ছি যে- বাইরে যেও না ; ইহা খুবই অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক বিষয়। কারণ একটাই, এই সড়ক পথে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বৃহদাকৃতির যানবাহন, ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গমনকারী সার বহনকারী ট্রাক এবং সিলেট থেকে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলা বালু, পাথর সহ সব ধরণের যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ি চালকদের বেপরোয়া গতি। সড়কটির দুপাশে হাঁটার জায়গা খুবই স্বল্প। আমরা মসজিদে যেতে ভয় পাই, বাচ্চারা স্কুলে যেতে ভয় পায়, কৃষকরা গরু নিয়ে মাঠে যেতে ভয় পান। অন্ধকার নেমে আসা মাত্রই ভয়ের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। কখন কোন দিক হতে গাড়ি আসবে, আর রাস্তা ছেড়ে পথচারীদের উপর দিয়ে চলে যাবে বলা যায় না। কিছুদিন পরপরই গভীর রাত্রে গাড়ির বিকট আওয়াজ শুনে ঘুম ভাঙে ; মানুষ মারা গেলো না কোনো প্রাণী বোঝা যায় না। টর্চ নিয়ে বের হলে দেখা যায়, বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে বৃহৎ আকৃতির কোনো ট্রাক অথবা বাস খাদে পড়ে আছে। রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আমার বড় ভাই শেখ মুরাদের প্রাইভেট কারের নিচে পড়ে স্পট ডেথ, স্কুল শিক্ষক খালেদ ভাই মসজিদে যাওয়ার পথে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু, চোখের সামনে প্রতিবেশী লিফন ভাইয়ের দেহকে মাটির সাথে খসলে দিয়ে যাত্রীবাহী বাসের পালিয়ে যাওয়া সহ রয়েছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত নিকটজনের গাড়ি চাপায় মৃত্যু ও দীর্ঘকালীন পঙ্গুত্বকে বরণ করে নেয়ার মতো নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আমরা বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন সহ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। দাবি তুলেছি বিশেষ করে আমাদের বাচ্চাদের জীবন রক্ষার্থে স্কুলগুলোর সামনে থ্রিডি জেব্রা ক্রসিং, মসজিদ ও সড়কের টার্ণিং পয়েন্টগুলোর যে জায়গাতে গাড়ি চালকদের অভারস্পিড আমাদের জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সেই জায়গাগুলোতে দুই-একটি স্পিড ব্রেকার স্থাপন করা। দিক নির্দেশক সাইনবোর্ডের দায়িত্ব আমাদের বৃহত্তর কচুয়াবহর এলাকার প্রবাসীরা নিতে চেয়েছেন। এসব দাবির প্রেক্ষিতে অনেকেই আমাদেরকে মুখে আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু প্রশাসন সহ কেউই কাজে এগিয়ে আসেন নি। সিলেট-তামাবিল সড়ক সহ অনেক বড় বড় হাইওয়েতেও দেখা গেছে দুই একটি মৃত্যুর ঘটনায় ছাত্র কিংবা জনতার দাবির প্রেক্ষিতে অথবা সড়ক অবরোধ করলে সপ্তাহের মধ্যেই সেখানে জেব্রা ক্রসিং সহ স্পিড ব্রেকার স্থাপন করা হয়েছে। অপরদিকে আমরা গ্রামের সহজ সরল মানুষ সড়ক অবরোধ করতে পারি না বলেই নিরবে প্রাণ দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের শিশুরা যারা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, আমাদের শিক্ষক যারা মানুষ গড়ার কারিগর, আমাদের কৃষক যারা দেশের গর্ব, আমাদের তরুণ-যুবক যারা ভবিষ্যৎ জনসম্পদ- প্রত্যেকেই নিরবে প্রাণ দিয়ে যাচ্ছে। এই মৃত্যু মিছিল কবে থামবে আমরা জানি না। তবে প্রশ্ন একটাই, নেশাগ্রস্থ হয়ে গাড়ি চালকদের গতির প্রতিযোগিতার কাছে আমাদের জীবন কি সত্যিই মূল্যহীন? এই জবাব দিয়ে দেন, বাকিটা আমরা উপরওয়ালার হাতে ছেড়ে দিবো।

 

তিনি আরো জানান, খুব শিগ্রিই বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে এলাকার মুরব্বীদের পরামর্শ সাপেক্ষে তারা গণসাক্ষর কর্মসূচি পালন করবেন এবং পুনরায় সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল