কমলগঞ্জ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান :  পর্যটকশূণ্য আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্যপ্রাণী – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

কমলগঞ্জ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান :  পর্যটকশূণ্য আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্যপ্রাণী

প্রকাশিত: ২:৩৫ পূর্বাহ্ণ, মে ৯, ২০২০

কমলগঞ্জ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান :  পর্যটকশূণ্য আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্যপ্রাণী

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান কয়দিন আগেও হাজারো পর্যটকের আগমণে, পর্যটকদের ব্যবহৃত যানবাহনের আগমন ও কমবয়সী পর্যটকদলের হৈ হুল্লোড়ে বনের শান্ত নিবিড় পরিবেশ হারিয়ে ফেলেছিল। পর্যটকদের পদভারে এ বনের বন্যপ্রাণীর দেখাও অনেকটা মেলত না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনায় সারাদেশের মত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানেও পর্যটক প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পর্যটকশূণ্য লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এখন তার আগের পরিবেশে ফিরে এসেছে। ফলে মনের আনন্দে বন্যপ্রাণী এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে উদ্যানের ভিতরের সমতলে ও গাছ থেকে গাছের ডালে।
১৯৯৬ সালে সিলেট বন বিভাগের পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের ১২৫০ হেক্টর বনকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। এ বনে বিরল প্রজাতির উল্লুক, চশমাপরা বানর, লজ্জাবতী বানর, বনরুই, মেছো বাঘ, মায়া হরিণ, বিভিন্ন জাতের সাপ ও নানা জাতের পাখির অভয়াশ্রম। বিরল প্রজাতিরসহ বিভিন্ন জাতের গাছ গাছালির সারি সারি অবস্থান এ বনে। এ বনের ভিতর নানা জাতের গুল্ম, লতা, বাঁশ, বন্য শুকর, হলুদ কচ্ছপ, মায়া হরিণ ছিল পর্যটকদের আকৃষ্টের একটি কারণ।
পরবর্তীতে এ উদ্যানকে দেখাশুনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় উদ্যান সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আর জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে প্রথমে ছিল নিসর্গ, দ্বিতীয় পর্যায়ে আইপ্যাক এখন রয়েছে ইউএসএআইডি। মূলত এসব সংস্থা লাউয়াছড়ায় পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে চাওয়ায় পরবর্তীতে এ উদ্যান থেকে বাণিজ্যিক আয়ের চিন্তায় প্রবেশ মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তারপরও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের আগমণ বেড়ে যায়। পর্যটকদের সাথে এ উদ্যান শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফরের ও বনভোজনকারীদের পছন্দের একটি স্থান। স্বাভাবিকভাবে এ উদ্যানে মানুষজনের উপস্থিতিতে তাদের সাথে নিয়ে আসা সাউন্ড সিস্টেম-এর কারণে বনের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। কোন ভাবেই তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল না। দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রকৃতি প্রেমীরা একটু শান্ত নিবিড় বনের মাঝে বন্যপ্রাণী দেখার জন্য লাউয়াছড়া উদ্যানে আসতেন। তবে অস্বাভাবিকভাবে পর্যটকদের আগমণে ও হাল্লা চিৎকারে বন্যপ্রাণী পর্যটকদের নাগালের বাইরে অবস্থান করত।
সম্প্রতি করোনাভাইরাস সংক্রমণকালে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এখন পর্যটকশূণ্য। শুক্রবার দুপুরে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে গেলে এ বনের বন্যপ্রাণীদের দেখা যায় মনের আনন্দে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বানরগুলো এক গাছ থেকে আরও এক গাছে লাফিয়ে বেড়ায়। গরমের কারণে একটি বানরকে বাঁশ ঝাড়ে ঘুমিয়ে বিশ্রাম নিতেও দেখা যায়। চশমাপরা বানর বসে আছে একটি বাঁশ গাছে। আগে যেখানে মানুষজনের উপস্থিতিতে বন মোরগ দেখাই যেত না। এখন সারাদিন বনের ঘোরে বেড়ায় বন মোরগ। বনের মধ্যে মায়া হরিণকে ঘোরে বেড়াতে দেখা যায়। সকাল থেকে দুপুর অব্দি শুনা যাচ্ছে মহাবিপন্ন উল্লুকের আওয়াজ। মনে হচ্ছে অনেকদিন পর আপন মনে জানাচ্ছে তারা নিস্তব্দ নিরব প্রকৃতির মাঝে ছুটে চলছে। প্রখর রোদের তাপে রাস্তার পাশের বাঁশ বাগানে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে একটি উল্টোলেজি বানর। গাছে গাছে দেখা যায় চশমাপরা বানর ও রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কিচির মিচির শব্দ ও বন মোরগের দল বেধে বনের মধ্যে ঘুরছে খাদ্যের সন্ধ্যানে।
লাউয়াছড়া রেঞ্জ কর্মকতা মোনায়েম হোসেন বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধের কারণে গত ১৯ মার্চ থেকে এ উদ্যানে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। এখন আসলেই বন বনের মতই আছে। একটি প্রবাদ আছে বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। তেমনি পর্যটকশূণ্য অবস্থায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বন্যপ্রনীরা মাতৃক্রোড়েই আছে।
তিনি আরোও বলেন,লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে থাকা মায়া হরিনগুলো স্বাভাবিক ভাবে রাস্তার মাঝেই গুড়াফেরা করে। যা আগে কখনো করতো না।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজারের সহকারী বন সংরক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, পর্যটকশূণ্য থাকায় এ উদ্যানের জীববৈচিত্র্য সঠিক অবস্থানে আছে। বনের প্রাণীগুলো এখন মহা আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, যানবাহন চলাচল ও রেল চলাচল বন্ধ থাকায় অবাদে বন্যপ্রানী বিচরণ করছে বনে। নেই কোন গাড়ি চাপা ও ট্রেনে কাটা পরে প্রাণী মরার খবর। করোনাভাইরাস প্রতিরোধ শেষে দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরলে এ উদ্যানে পর্যটকদের নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রবেশ করলে বন, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্য ভাল হবে বলে তিনি মনে করেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল