কমিউনিটি পুলিশিং, পুলিশি সেবার নতুন দ্বার – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

কমিউনিটি পুলিশিং, পুলিশি সেবার নতুন দ্বার

প্রকাশিত: ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০২১

কমিউনিটি পুলিশিং, পুলিশি সেবার নতুন দ্বার

মো. জেদান আল মুসা

পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এ সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের ভূমিকা অপরিসীম। পুলিশের সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমেই সমাজে বিরাজ করে শান্তি-শৃঙ্খলা। আইন ও নীতি–নৈতিকতা নিয়ে কাজ করতে হয় পুলিশ বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে। একজন নাগরিকের কাছে বিপদের সময় সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল থানা-পুলিশ।

পুলিশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জমিদারদের উত্তরাধিকারী পুলিশি ব্যবস্থা মূলত ব্রিটিশ শাসনের শুরু পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। ১৭৯২ সালের ৭ ডিসেম্বর লর্ড কর্নওয়ালিশ পুলিশ বাহিনীকে একটি কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করান। এর ফলে জমিদারদের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী রাখার প্রবণতা দূর হতে থাকে। তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশকে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করে প্রতিটি জায়গায় একজন দারোগা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ১৮৬১ সালে পার্লামেন্টে পুলিশ আইন পাস হয়। এটি ছিল ব্রিটিশ কলোনিয়াল আইন। এর ফলে পুলিশ বাহিনী জনগণের সেবায় পরিবর্তে শাসকের ভূমিকা পালন করতে থাকে। এভাবে চলতে থাকে পুলিশের কার্যক্রম। উপনিবেশ আমলে পুলিশ বাহিনী গঠন করা হয়েছিল মূলত মানুষকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য, জনগণের বন্ধু হওয়ার জন্য নয়। জনগণ পুলিশ থেকে চায় সেবা আর নিরাপত্তা। পুলিশের প্রধানতম কাজ হলো মানুষকে সেবা দেওয়া, তাদের সহযোগিতা করা, নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় জনগণের প্রত্যাশা ও মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই প্রশাসন চালিত হয়। রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীও জনগণের মতামত ও প্রত্যাশার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দায়িত্ব পালন করে। জনগণের সহযোগিতা ছাড়া পুলিশের কাজের সফলতা আশা করা যায় না। একটি উদার ও গণতান্ত্রিক সমাজে বসবাসের নানা বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠীকে পুলিশি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে পুলিশ ব্যবস্থাপকদের সামনে মাত্র দুটি কৌশল উন্মুক্ত থাকে। এর মধ্যে একটি হলো জনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে আইন প্রয়োগ করা, অন্যটি হলো কমিউনিটি পুলিশিং। কৌশল দুটির একটি অন্যটির সম্পূর্ণ বিপরীত নয়, বরং একই পদ্ধতির পুলিশি কার্যক্রম।

আধুনিক পুলিশিংয়ের মূল কথা হলো ‘পুলিশই জনতা এবং জনতাই পুলিশ’। রবার্ট পিলের গণমুখী পুলিশিংয়ের মূলনীতি থেকেই মূলত কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ধারণা আসে। পুলিশের কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করে এবং জনগণের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করলে পুলিশের কাজে যেমন সফলতা আসবে এবং এর ফলে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও আস্থা সৃষ্টি হবে, যা পুলিশ ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব হ্রাসে ভূমিকা রাখে। শুধু কার্যকর কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমেই এটি নিশ্চিত করা সম্ভব। আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা একেবারেই কম বিধায় পুলিশের একার পক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধীরা বা যারা অপরাধ করে, তারা আমাদের সমাজেরই একটা অংশ। সেহেতু জনসাধারণের সাহায্য–সহযোগিতার মাধ্যমেই পুলিশ অপরাধ প্রতিরোধ বা নিবারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।

প্রতিবছরের মতো এ বছরও অক্টোবর মাসের শেষ শনিবার সারা দেশে পালিত হয়েছে কমিউনিটি পুলিশিং ডে। দিবসটির এবারের স্লোগান ‘মুজিব বর্ষে পুলিশ নীতি, জনসেবা আর সম্প্রীতি’। বাংলাদেশের প্রতিটি থানা ও জেলায় ৩০ অক্টোবর একযোগে পালিত হয়েছে দিবসটি; এটি জনগণের সঙ্গে পুলিশের মিলনমেলাও বটে।
কমিউনিটি পুলিশিং, পুলিশি সেবার নতুন দ্বার

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পুলিশ সপ্তাহে ১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘একটা কথা আপনাদের ভুললে চলবে না, আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ। আপনারা বিদেশি শোষকদের পুলিশ নন, জনগণের পুলিশ।’ বঙ্গবন্ধু এ ভাষণের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের পুলিশ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কমিউনিটি পুলিশিংই হলো জনতার পুলিশ।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নের বাস্তবায়নে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করছেন। এই অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ পুলিশ সক্রিয় অংশীদার। নিরবচ্ছিন্ন এই উন্নয়ন টেকসই করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার আন্তরিকতা, দক্ষতা ও পেশাদারির সঙ্গে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা, আধুনিকায়ন ও ভাবমূর্তির ওপর দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও সমুন্নত রাখার প্রয়াসে কমিউনিটি পুলিশিং একটি শক্তিশালী আধুনিক দর্শন বা মতবাদ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান বাংলাদেশে সামাজিক, আর্থসামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিবারণের লক্ষ্যে কমিউনিটি পুলিশিং একটি সফল পুলিশি ব্যবস্থা। এটি দলনিরপেক্ষ ও স্বেচ্ছাসেবী পুলিশি ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। মাদক, জুয়া, কিশোর অপরাধ, পারিবারিক কলহ, আর্থিক লেনদেন, জমিজমা, বখাটেপনা, স্কুল–কলেজে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, গুজব, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, শিশু পাচার, শিশুশ্রম, মানব পাচার ইত্যাদি অপরাধের বিষয়ে কমিউনিটি পুলিশিং অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে কমিউনিটি ও পুলিশের যৌথ অংশগ্রহণে সমাজে বসবাসকারীদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কমানো, অপরাধ–সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান এবং অপরাধ প্রতিরোধ বা নিবারণ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

তা ছাড়া জঙ্গিবাদ দমন ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে কমিউনিটি পুলিশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে ধর্মবর্ণ–নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একই ছাতার নিচে আবদ্ধ করে সম্প্রীতির সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিতে হবে।

* লেখক: পুলিশ সুপার (এমএন্ডসিএ), রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়, সিলেট

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল