করোনা আতঙ্কে ফাঁকা নগরী, স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি অনেকে – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

করোনা আতঙ্কে ফাঁকা নগরী, স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি অনেকে

প্রকাশিত: ৮:৫৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৩, ২০২০

করোনা আতঙ্কে ফাঁকা নগরী, স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি অনেকে
  • আজ থেকে সকল মার্কেট ও দোকান বন্ধ

নুরুল ইসলাম:
প্রাণচঞ্চল সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আগের সেই ভিড় নেই। দেখতে দেখতে রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। শপিংমল বন্ধ, কিছু দোকানপাট খোলা থাকলেও ক্রেতাশূন্য। গণপরিবহনের সংখ্যা কমেছে। তার চেয়েও কম যাত্রী। এ চিত্র অজানা শঙ্কা জায়গা করে নিয়েছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস মানুষের স্বস্তি প্রায় কেড়ে নিয়েছে। ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, মানবিক মূল্যবোধসহ বিভিন্ন দিক থেকে এগিয়ে থাকা দেশগুলোও এর প্রাদুর্ভাবের কাছে কেমন যেন অসহায়। অনেকের চোখের জল চোখেই শুকোচ্ছে। কান্না বারণ। বিষন্ন মন নিয়ে গৃহবন্দি মানুষ।

দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। করোনা প্রতিরোধে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে জনসমাগম এড়াতে সাধারণ মানুষকে বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেওয়া, হাত ধোয়া ও নিয়মিত পরিষ্কার থাকার পাশাপাশি বিদেশফেরত নাগরিকদের হোম কোয়ারেন্টিনে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসন থেকে। তবে এরই মাঝে অব্যবস্থাপনার নানা চিত্র সামনে এসেছে। ফলে কিছুটা যেন ভীতসন্ত্রস্ত সিলেট নগরের বাসিন্দারা। বাস্তব অবস্থা প্রত্যক্ষ করে অনেকেই সিলেট ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। সক্ষম এবং সচেতন মানুষ গৃহবন্দি হচ্ছেন স্বেচ্ছায়। সংক্রমণ ঠেকাতে সেল্ফ কোয়ারেন্টাইনে যাচ্ছেন তারা। এসব কারণে ক্রমে ফাঁকা হচ্ছে নগরের রাস্তাঘাট।

নগরীর উপশহর, সোবহানীঘাট, আম্বরখানা, বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, চৌহাট্র, রিকাবীবাজার, লামাবাজার, জল্লারপাড়, দক্ষিণ সুরমার রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল, কদমতলী, শাহীঈদগাহ, তালতলা, মদীনামার্কেট, মেরজটিলা, টিলাগড়সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় মানুষ অনেক কম। অতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ নেই। হুড়োহুড়ি অনুপস্থিত। রাস্তা জুড়ে নেই যানজট। ফাঁকা যাচ্ছে বাস। কোথাও কোথাও ড্রাইভাররা বাস থামিয়ে বসে আছেন। যাত্রী জন্য দীর্ঘক্ষণ হাঁকডাক করছেন হেলপাররা। যে কজন যাত্রী উঠছেন তাদের অধিকাংশের মুখে মাস্ক।

করোনা আতঙ্কে ফাঁকা রাডেও রাজত্ব করেছে রিকশা। গণপরিবহনে জনসমাগম এড়াতে রিকশায় করে গন্তব্যস্থলে গিয়েছেন অনেকেই। তবে ভাড়াও গুণতে হয়েছে অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি। বন্দরবাজার ও জিন্দাবাজারের মতো ব্যস্ত এলাকায় যানজটের দেখা নেই। গাড়ি কম। যাত্রীও। দক্ষিণ সুরমার বাস টার্মিনালে শিহাব নামের এক তরুণ অনেক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু বাসে বা অন্য কোন যানবাহনে উঠছিলেন না। বিষয়টা তাহলে কী? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি একজন সরকারী জন সরকারী চাকুরীজীবি। জরুরী প্রয়োজনে সিলেটে এসেছিলাম। আগে বাসে বাড়িতে চলে যেতাম। করোনার সংক্রমণের ভয়ে বাসে আর উঠি না। বিকল্প খুজছি বাড়ি ফেরার জন্য।

বাস টার্মিনালের কথা হয় জাহেদ নামের এক বাস হেল্পারের সঙ্গে। যাত্রীদের ডাকাডাকির এক ফাঁকে তিনি বলেন, যাত্রী নাই। সব করোনায় নিয়া গেছে। তারা নিজেরাও বেশি যাত্রী ওঠাতে চান না জানিয়ে বলেন, কিন্তু খরচটা তো উঠতে হইবো। এই জন্য ডাকাডাকি করতেছি।

একজন হেলপার জানান, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উত্তরা-সদরঘাটে দুই বার ঘুরে বাসের সব সিট পুরো করতে পারেননি। অথচ অন্যান্য বৃহস্পতিবার হলে দাঁড়িয়েও জায়গা থাকে না বাসে। সিঁড়িতে পর্যন্ত যাত্রী ঝুলে যেতে থাকেন। এক পরিবহন চালক জানান, এভাবে যাত্রী না পেলে তারাও পরের টিপে বের হবেন না। কারণ সন্ধ্যায় মালিককে পুরো দিনের জমার টাকা দেওয়া সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, বাসের যাত্রী কমে গেছে। অনেকেই বাড়ি চলে গেছেন। তবে যাত্রী পাওয়ার ভিত্তিতে বাস চলছে। পরিবহন মালিক সমিতি থেকে তাদের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি টার্মিনালের বাসে স্প্রে এবং দূরপাল্লার রুটের বাসের যাত্রীদের মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহ করা হচ্ছে। বাস চলাচল বন্ধ হবে কি-না?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাস চলাচল সীমিত হতে পারে। তবে বন্ধ হবে না। সকল বিনোদনকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

নগরীর বিনোদন কেন্দ্র ও পার্কগুলো আগের মতো উন্মুক্ত নয়। নূর উদ্দিন নামের এক অবসপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বলছিলেন, ডাক্তারের নির্দেশে আমাকে প্রতিদিন হাঁটতে হয়। কিন্তু গত চারদিন ধরে আমি ঘর থেকে বের হইনি। এ কারণে শরীরে কিছু সমস্যা অনুভব করছিলাম। তাই হাঁটতে বের হয়েছি। দ্রুত হাঁটা শেষ করে বাসায় ফিরবেন বলে জানান তিনি।

গল্প-আড্ডার জনপ্রিয় স্থান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি এবং সিলেট সরকারী কলেজ ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাও সুনসান। জনমানবহীন। সব গেট বন্ধ। ভেতরে কেউ নেই। চায়ের দোকান উঠে গেছে। গল্প- আড্ডার স্থলে জায়গা করে নিয়েছে বিষণ্ণতা। ডাক্তার-নার্সরা রোগীদের কাছে আসছেন না বা রোগী আসা মাত্রই বেসরকারি মেডিকেলগুলো তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছে সরকারি হাসপাতালে। সবমিলিয়ে পুরো নগরীতে এখন বইছে আতংকের হাওয়া। এদিকে সিলেটে প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে অতিপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দোকান খোলা রেখে বাকি সব মার্কেট, শপিং মল ও দোকান-পাট বন্ধ রাখার কথা থাকলেও তা কেউ মানছেন, কেউ মানছেন না। সোমবার দুপুর ১২টায় নগর ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকটি মার্কেট ও দোকা ছাড়া বেশিরভাগই খোলা রাখা হয়েছে। এ নিয়ে সচেতন মহল উদ্বিগ্ন। ঘোষিত দিনগুলোতে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর স্বার্থে মার্কেট ও দোকান-পাট বন্ধ রাখার জোর দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।

নভেল করোনাভাইরাস থেকে সিলেটের মানুষকে বাঁচাতে নগরের ব্যবসায়ীরা গত রবিবার রাতে সকল মার্কেট বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণা অনুযায়ী আজ সোমবার থেকে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত নগরীর সকল মার্কেট বন্ধ থাকার কথা রয়েছে। এর আগে গতকাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নগরের ব্যবসায়ীদেরকে মার্কেট বন্ধ করার আহ্বান জানান। ব্যবসায়ীরা এ আহবানে সাড়া দিয়ে আল-হামরা, মিলেনিয়াম, ব্লু-ওয়াটার, মধুবনসহ বিভিন্ন মার্কেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। আজ সোমবার উল্লেখিত মার্কেটগুলো বন্ধও পাওয়া যায়। কিন্তু নগরের বন্দরবাজার এলাকার হাসান মার্কেট, করিমুল্লাহ মার্কেট, সিটি হার্ট, ওরিয়েন্টাল, সুরমা মার্কেট, সবুজ বিপণী, জিন্দাবাজার এলাকার জালালাবাদ হাউস, আহমদ ম্যানশন, মিতালী মার্কেট, শুকরিয়া মার্কেট, লতিফ মার্কেটসহ বেশ কয়েকটি মার্কেট আজও খোলা রেখেছে। এছাড়াও রাস্তার পাশের সকল দোকান খোলা রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। এসব মার্কেট ও দোকানে মাস্কবিহীন মানুষজন দেদারসে কেনাকাটা করতে দেখা গেছে।

সচেতন মহল আশঙ্কা করছেন- এসব মার্কেট ও দোকানে করোনার লক্ষণবিশিষ্ট কেউ কেনাকাটা করতে আসলে ভয়ঙ্কর এ ভাইরাসটি সিলেটে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ বিষয়ে সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও আল-হামরা মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান রিপন বলেন, আশা করছি মঙ্গলবার থেকে নগরের সকল মার্কেট ও দোকান বন্ধ রাখবেন ব্যবসায়ীরা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •