করোনা ভাইরাস বনাম কালো মরণ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

করোনা ভাইরাস বনাম কালো মরণ

প্রকাশিত: ১০:১০ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০

করোনা ভাইরাস বনাম কালো মরণ
আবু সুফিয়ান মাখদুমী
আজ থেকে সাড়ে ৬০০ বছর আগের কথা।১৩৩১ সাল।চীন থেকে এক প্লেগ মহামারী আকারে আক্রমণ করে সমগ্র মোঙ্গল সাম্রাজ্যে।এই মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মোঙ্গল সাম্রাজ্য ‘ইলখানাত’ উজাড় হয়ে যায়। পরবর্তীতে এ মহামারী হানা দেয় এশিয়া থেকে ইউরোপে। এশিয়া থেকে ইউরোপে যেতে এ মহামারীর সময় লাগে পনেরো টি বছর। কিন্তু মাত্র তিন বছরে ৬০ ভাগ মানুষকে মেরে সমগ্র ইউরোপকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে এই মহামারী।ইতিহাস বিখ্যাত এই মহামারীর নাম “The black dath” তথা “কালো মরণ”।
এই মহামারীর উপসর্গ হলো, গায়ে কালো বড় বড় ফোঁড়া, বগলে আপেলের সমান একেকটা ফোঁড়া বের হওয়া, সার গায়ে এখানে-ওখানে দগদগে ঘা, ভীষণ জ্বর, হাঁচি ও কাশি হওয়া এবং সেই সাথে মুখের মাংস পচে খসে যাওয়া। এগুলো হলো কালো মরণের লক্ষণ।এই মহামারী এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, মানুষের মধ্যে ঐ লক্ষণগুলো দেখা দেয়ার সাথে সাথে দগদগে ঘা থেকে ঝরে পড়ে রক্ত আর পুজ।কারো সারা শরীর থেকে আসে পচা মাংসের বীভৎস গন্ধ। ফলে আক্রান্ত হবার দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে মানুষ মারা যায়।
রোগ ঠেকানোর জন্য শত চেষ্টা করেও কোন লাভ হলো না। এই কালব্যাধি সংক্রমিত হওয়ার প্রভাব এতটাই ছিল যে, কোন বাড়িতে একজন আক্রান্ত হলে কয়েকদিনের মধ্যে বাড়ির সবাই তাতে আক্রান্ত হয়ে যায়।রোগী দেখতে এসে রোগীর সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল ডাক্তার।কবি ‘পেত্রাকের’ ভাই ‘গেরহার্ডো’ যে ফ্রান্সিসকান আশ্রমের সদস্য ছিলেন, সেখানকার ১৪০ জন পাদ্রির মধ্যে তিনি ছাড়া আর কেউই বাচলেন না।জন ফ্লিন নামের আরেকজন পাদ্রী মৃত্যুর পূর্বে এক টুকরো পার্চমেন্ট লিখে গেলেন, কালো মরণের হাত থেকে যদি কোন আদম সন্তান বেঁচে যায়, তাহলে আমার এই পার্চমেন্ট সে যেন্ যত্ন করে রাখে। ঈশ্বরের শাস্তির চরম দৃষ্টান্তের কথা সে যেন পরবর্তী প্রজন্মকে জানিয়ে দেয়। এভাবে ধনী-গরীব রাজা-প্রজা কেউই রেহাই পায়নি কাল মরণের করালঘ্রাস থেকে। H.H.O র’ মতে বিশ্বের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক মহামারীটি ছিল Black Dath. যা বিশ্বের ১০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছিল। এখানে অতি সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে।
এবার Covid-19 তথা নোবেল করোনাভাইরাসের কথায় আসা যাক।W.H.O করোনা ভাইরাসের নামকরণ করেছে, Corona virus Disease in 2019.(covid19) এ ভাইরাসটি ২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের উহান শহরে শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে এটি ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।এই ভাইরাসটি বর্তমানে বৈশ্বিক মহামারীর রূপ ধারণ করেছে।
করোনা ভাইরাসে আন্তর্জাতিক হিসেবে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৪.৬৫ লাখের বেশি আক্রান্ত হয়েছে ৮৮ লাখের বেশি এবং এর বিপরীতে সুস্থ হয়েছে ৪৩.৭ লাখের বেশি।
গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে, করোনাক্রান্ত অনেক মানুষের মাঝে কোন উপসর্গই দেখা যায় না। মানে জ্বর, সর্দি,কাশি, গলা খুশখু,শ্বাসকষ্ট কোন কিচ্ছু হয়না।সব সহজ স্বাভাবিক। কিন্তু তারা ভিতরে করোনায় আক্রান্ত।
প্রথম দিকে গবেষকেরা বলেছিল করোনা ভাইরাস উচ্চ তাপমাত্রায় টিকতে পারেনা। আবার ফ্রান্সের একদল গবেষক দাবি করেছিল করোনা ভাইরাস উচ্চ তাপমাত্রায় আরো ভালোভাবে টিকতে পারে।
তার মানে সব মিলিয়ে এই ভাইরাসের বিষয়টা রহস্যজনক। জ্ঞানের এই শতকে রহস্যময়ী এ ভাইরাসটি সবাইকে হতাশ করে দিয়েছে এবং সবার মতামতকে বুড়ি আঙুল দেখিয়ে ব্যবাচেকা খাওয়াচ্ছে। মুহূর্তেই রুপ পাল্টাচ্ছে এ ভাইরাসটি।
‘কালো মরণ আর করোনা ভাইরাস’ দুটি মহামারীর চীনে সূচনা হলেও আচরণ ভিন্ন। কালো মরণ হিংস্র দানবের মত ভয়ংকর আঘাত হেনেছে প্রকাশ্যে, খোলামেলা ভাবে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের আঘাত ভয়ংকর না হলেও এতো ঘুরানো-পেচানো, রহস্যময়ী যা বুঝা বড় মুশকিল।
যেখানে ভ্যক্সিন,টীকা, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, এটোম, মিছাইল, বিমান-কামান সবকিছু ব্যর্থ সেখানে “আমরা করোনা ভাইরাসের চেয়ে শক্তিশালী ” বাক্যটি কতটা অযৌক্তিক সেটা সহজেই বোধগম্য। নিশ্চয়ই করোনা ভাইরাসের সৃষ্টিকর্তা যদি ‘করুণা’ না করেন। তাহলে আমাদের রক্ষে নেই। অবিশ্বাসিরাও (নাস্তিক) জানুক, অদৃশ্য একজন স্রষ্টা মহান আল্লাহ তা’য়ালা সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।
লেখকঃ আবু সুফিয়ান মাখদুমী, শিক্ষার্থীঃ ফুলবাড়ি আজিরীয়া কামিল মাদ্রাসা, গোলাপগঞ্জ, সিলেট।