করোনা মোকাবেলায় প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস ও শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি: শেখ আব্দুর রশিদ

প্রকাশিত: ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ১০, ২০২০

করোনা মোকাবেলায় প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস ও শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি: শেখ আব্দুর রশিদ
ঘর থেকে বের হলেই শত্রু যে কোন দিক থেকে যে কোন সময় আক্রমন করবে জানলে নিশ্চয়ই কেউ অসহায়ের মত নিজেকে শত্রুর হাতে ছেড়ে দেবেনা। সে নিজের আত্মরক্ষায় একটা প্রস্তুতি নিয়ে বের হবে। গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে চীনের উহান রাজ্যে এবং এর প্রায় দু’মাস পর ৮ই মার্চ ২০২০ এ বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাস রোগী শনাক্ত হয় এবং এরপর থেকে মানুষের মধ্যে তৈরী হয়েছে আতঙ্ক, ভয় যে কখন কি হয়। যেহেতু করোনার কোন ভ্যাকসিন বা ঔষুধ আবিস্কার হয়নি তাই বিশেষজ্ঞরা শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করায় জোর দিচ্ছেন। এতে অনেকে মনে করছেন শুধু খাবার-দাবারেই ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী হয় তা কিন্তু নয়। ইমিউন সিস্টেম হচ্ছে, দেহের বাহির থেকে কোন ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস শরীরে ঢুকে যাতে অসুস্থ না করতে পারে সেজন্য শরীরের ভিতরের একধরনের প্রতিরোধক ব্যবস্থা। এই প্রতিরোধক ব্যবস্থা মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে পায়ের আঙুল পর্যন্ত বিস্তৃত। সেদিক থেকে পুরো শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সচল রাখতে হবে। অর্থাৎ খাবার সহ আরোও কয়েকটি সমন্বিত প্রক্রিয়া ঠিক রাখলেই ইমিউন সিস্টেম পুরোপুরি কার্যকরী বা শক্তিশালী হয়ে উঠবে। বিশ্বাস এবং আতঙ্ক, বিশ্বাস এবং ভয় কখনো একসাথে থাকতে পারেনা। তাই প্রথমেই প্রয়োজন স্রষ্টার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসী কখনো আতঙ্কিত হতে পারেনা। স্রষ্টার প্রতি আস্থা মনকে প্রশান্ত করে। মনের প্রশান্তি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
দেহ আত্মার বাহন। দেহের সঠিক যত্ন নেয়া একজন বিশ্বাসীর কর্তব্য। এই দেহ বিশ্বাসীর কাছে স্রষ্টার আমানত। এর জন্য প্রয়োজন প্রতিদিন নিয়মিত মেডিটেশন। মেডিটেশন বা ধ্যান অতীতের ব্যর্থতার গ্লানি আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা থেকে মুক্ত করে মনকে বর্তমানে নিয়ে আসে। অস্থিরতা দূর করে মনকে করে দুশ্চিন্তামুক্ত। মেডিটেশনে নিজের গভীরে আত্মনিমগ্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে অন্তরতম আমি-র সাথে অর্থাৎ নিজের আত্মার সাথে সংযুক্ত হওয়ার মাধ্যমে লাভ করা যায় প্রশান্ত প্রত্যয়। যোগ ব্যায়াম, দম চর্চা ও প্রাণায়াম চর্চায় হৃদপিন্ড ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি সহ হাঁপানি, সর্দি কাশি ইত্যাদি রোগ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। বিশেষ করে প্রাণায়ামের ফলে ফুসফুসে প্রচুর অক্সিজেন প্রবেশ করে। ফলে কোন রোগ সহজে ফুসফুস আক্রমন করতে পারেনা। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শতকরা ৭৫ ভাগ রোগের কারণই হচ্ছে টেনশন। কোন ঘটনার প্রক্ষিতে ভয় আতঙ্ক থেকে টেনশনের উৎপত্তি। টেনশনের প্রভাবে দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে। ফলে শরীর সহজে রোগাক্রান্ত হয়। মেডিটেশন মনকে করে টেনশন ফ্রি।
ব্রেন হচ্ছে একটা যন্ত্র। ব্রেনের নিজের কিছু করার নাই। কিন্তু এই ব্রেনকে চালায় মন। মন এবং ব্রেনের সম্পর্ক নিয়ে সাইকো নিউরো ইমিউনোলজির প্রধান প্রবক্তা ড. অ্যালেন গোল্ড স্টেইন, ড. জন মটিল এবং এদের সাথে দুজন নিউরো সার্জন ড. ও্য়াইল্ডার পেনফিল্ড, ড. ই রয় জন দীর্ঘ গবেষণা করেছেন মন এবং ব্রেনের-এর সম্পর্ক নিয়ে তারা বলেছেন যে, একজন প্রোগ্রামার যেভাবে কম্পিউটারকে পরিচালিত করে মনও ঠিক একইভাবে ব্রেনকে পরিচালিত করে। মন ব্রেনকে যে যে প্রোগ্রাম দেয় ব্রেন সেই প্রোগ্রাম অনুসারে কাজ করে। অর্থাৎ মন ব্রেনকে যে কমান্ড করবে ব্রেন তা বাস্তবায়ন করবে এবং সেরকম বাস্তবতা উপহার দেবে। এর জন্যে প্রয়োজন দেহ নিয়ন্ত্রণকারী তথ্য ভান্ডারের পুনর্বিন্যাস। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণার পর বলেছেন ‘ মন সেরা ডাক্তার আর মানবদেহ সবচেয়ে সেরা ফার্মেসী’। যে কোন ঔষুধ কোম্পানীর চেয়ে মানব দেহ বেশি ভালভাবে পেইনকিলার, ট্রাঙ্কুলাইজার, এন্টিবায়োটিক ইত্যাদি তৈরী করতে এবং সঠিক মাত্রায় সঠিক সময়ে ব্যবহার করতে পারে। আর এজন্য প্রয়োজন মস্তিস্কে নিয়ন্ত্রিতভাবে তথ্য প্রেরণ। সবসময় যদি মনে মনে বলতে থাকেন সুস্থ দেহ সুস্থ দেহ – – – তাহলে মস্তিষ্ক সুস্থ থাকার জন্য শরীরকে যেভাবে প্রস্তুত করা দরকার সেভাবে প্রস্তুত করবে যাতে আপনি অসুস্থ না হন। তাই প্রতিদিন মনে মনে শতবার বলতে থাকুন, “সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন কর্মব্যস্ত সুখী জীবন”। এতে করে মস্তিষ্ক একটা সয়ংক্রিয় গাইডেন্স পাবে।
করোনায় পাশ্চাত্যের চেয়ে প্রাচ্যে মৃত্যুহার কেন কম, তা উন্মোচন করার জন্য গবেষকেরা নানারকম তথ্য বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। US center for Disease Control and Prevention নিউইয়র্কে ৪০০০ জন কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত মানুষের ওপর এক গবেষণা পরিচালিত করে এবং তা থেকে দেখা যায়, শতকরা ৬২ জন কোভিড-১৯ এ মারা যাওয়া ব্যক্তির শারীরিক ওজন স্বাভাবিকের থেকে অত্যন্ত বেশী ছিল। বাংলাদেশসহ দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে এই হার শতকরা মাত্র ২-৫ ভাগ। ধুমপান ও অ্যালকোহলের ব্যবহার শ্বাসযন্ত্রে এবং ফুসফুসে সংক্রামক ব্যাধি বাড়ায় আর কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে ধুমপায়ীদের অসুস্থতা মারাত্মক হওয়ার আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষনা দিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি অ্যালকোহলসেবীদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অন্যদের থেকে তুলনামুলক অনেক কম থাকায় যেকোন সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলাসহ প্রতিদিন সকালে নাশতার সাথে ১ কোষ কাঁচা রসুন ও ২৫/৩০ টি কালোজিরার দানা খান।
বালা-মুসিবত, রোগব্যাধি ও ভয়-পেরেশানি থেকে মুক্তি পেতে দান করুন। নবীজী (স.) বলেছেন, দান ৭০ টিরও বেশী বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করে। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার – ২৭৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই যারা তাদের উপার্জন থেকে রাতে বা দিনে প্রকাশ্যে বা গোপনে, সচ্ছল বা অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, তাদের জন্যে তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার রয়েছে। তাদের কোন ভয় বা পেরেশানি থাকবেনা”। তবে ভিক্ষা দেওয়াকে রাসুল (সা.) নিরুৎসাহিত করেছেন। দান করতে হবে সঠিক জায়গায় এবং সঠিক প্রক্রিয়ায়। সাবান দিয়ে বার বার হাত ধোয়া, হাঁচি, কাশি ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা এজন্য সবসময় রুমাল বা মাস্ক ব্যবহার করা।
নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পন্ন করার পর স্রষ্টার উপর নির্ভর করা। নিশ্চয় স্রষ্টা