কি ঘটেছিল সিলেট মা ও শিশু হাসপাতালে? – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

কি ঘটেছিল সিলেট মা ও শিশু হাসপাতালে?

প্রকাশিত: ১০:৫২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০১৭

কি ঘটেছিল সিলেট মা ও শিশু হাসপাতালে?

ডাক্তার অপরাধি! হাসপাতাল অপরাধি! ওই অভিযোগ একজন রোগীর আত্মীয় স্বজনের। তাদের অভিযোগ একজন রোগীনির গর্ভাশয় কেটে ফেলেছে ডাক্তাররা পক্ষান্তরে ওই হাসপতাল কর্তৃপক্ষ চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন যদি ওই ধরণের ঘটনা প্রমাণ করতে পারে তাহলে তারা যে কোনো শাস্তি মাথা পেতে নেবেন। নগরীর সিলেট মা ও শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন । মা ও শিশু হাসপাতালের একজন রোগির প্রতি অবহেলা করা হয়েছে-এমন অভিযোগ আসার পর অনুসন্দ্বান করা হয় । এতে বের হয়ে আসে প্রকৃত ঘটনা । নগরীর সোবহানিঘাস্থ সিলেট মা ও শিশু হাসপাতালে গত ৭ সেপ্টেম্বর ভর্তি হন সন্তানসম্ভবা লুবনা বেগম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান রাতে আড়াইটার দিকে হাসপাতালে ভর্তি হাওয়ার পূর্বে লুবনা বেগম ও মো. চুনু মিয়া, দম্পতি নগরীর আরো তিন-চারটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ছিলেন। কিন্তু প্রতিটি হাসপাতালেই সন্তানসম্ভবা লুবনা বেগমের অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দানের পরামর্শ দেয়ায় তারা শেষ অব্দি সিলেট মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি হন।
হাসপাতালের একজন আবাসিক চিকিৎসকের দাবী লুবনা বেগম হাসপাতালের ভর্তি হওয়ার প্রায় তিনদিন পূর্বে তার লেবার পেইন ওঠে। তিনি যখন হাসপাতালে ভর্তি হন তখন তার গর্ভের শিশুটি জরায়ুর মুখে এসে আটকা পড়েছে। ডাক্তার বলেন, বাংলাদেশে সন্তান জন্মদানের সময় মত নারীর মৃত্যু ঘটে তার অধিকাংশই এধরনের পরিস্থিতিতে ঘটে। এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘অবস্ট্রাবটেড লেবার’। ওই ডাক্তার জানান, লুবনা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই দায়িত্বরত ডাক্তাররা তার অপারেশন করার পরামর্শ দেন। কিন্তু রোগীর সাথে আসা স্বজনরা অপারেশন করাতে কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিলেন না। তারা দাবী করেছিলেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে রোগীর প্রসব করাতে। কিন্তু ওই পরিস্থিতিতে কোনো ভাবেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে প্রসব সম্ভব ছিল না। পরে সকাল ৯টার দিকে রোগীর স্বজনরা অপারেশন করতে সম্মতি দিলে লুবনা বেগমকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে অপারেশন সম্পন্ন করা হয়।
লুবনা একটি পুত্র সন্তানের জন্মদেন। কিন্তু নবজাতক শিশুটি দীর্ঘ সময় জরায়ুর মুখে আটকে থাকায় তার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। ফলে শিশুটিকেও পরিচর্যার আওতায় নেয়া হয়। সন্তান জন্মদানের তিনদিন পর চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে নবজাতক শিশু ও তার মাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিতে অনুরোধ করেন তাদের স্বজনরা। অবস্ট্রাকটেড লেবার পরিস্থিতিতে অপারেশন সম্পন্ন করায় রোগীর আরো কয়েকদিন চিকিৎসা নেয়ার প্রয়োজন থাকায় দায়িত্বরত ডাক্তাররা হাসপাতাল না ছাড়তে তাদের উপদেশ দেন। তখন তারা জানিয়েছিলেন হাসপাতালের ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। পরে তাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সিলেট মা ও শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীকে ছাড়পত্র দেন। হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান রোগীকে হাসপাতাল ছাড়ার সময় অপারেশনের বিল ৩৩ হাজার টাকা এবং নবজাতকের চিকিৎসা বিল ৮ হাজার টাকা এসেছিল। তারা বিল দিয়ে ১০ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান হাসপাতাল ছাড়ার পর লুবনা বেগমকে স্বজনরা নিয়ে যান স্টেডিয়াম মার্কেটস্থ ডা. ফাহমিদা সিদ্দিকা পপির চেম্বারে। ডাক্তার তাদের আবারো কোনো হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে পরামর্শ দেন। লুবনা বেগম ও স্বজনরা পুনরায় সিলেট মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু তখন তার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতির দিকে। তার অপারেশনের জায়গায় ইনফেকশন হয়ে যায়। হাসপাতালের ডাক্তার জানান, লুবনা বেগম প্রথমবার যে পরিস্থিতি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ওই পরিস্থিতিতে প্রসবের পর তার কয়েকদিন হাসপাতালের ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে থেকে চিকিৎসা ও বিশ্রাম প্রয়োজন ছিল। কিন্ত হাসপাতল ত্যাগ করে দুর্বল শরীর নিয়ে গাড়ি চড়ার কারণে তার অপারেশনের জায়গায় ইনফেকশন দেখা দেয়। ১১ সেপ্টেম্বর রাত দশটার দিকে ভর্তি হওয়ার সাত দিন পর দ্বিতীয় অপারেশন করা হয়। ওই অপারেশনটি ছিল, পূর্বের অপারেশনের ক্ষত সারানো ও ইনফেকশনের কারণে ভেতরে য়ে ময়লা জমা হয়েছিল তা বের করার জন্য। ওই ডাক্তার জানান , লুবনার শরীরে যে তৃতীয় অপারেশন হয়েছিল তা খুবই ছোট অপারেশন। অপারেশনটি করা হয় পূর্বের অপারেশনের জায়গায় চামড়ার নিচের ময়লা বের করার জন্য । হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানায় তিনটি অপারেশনের কোনোটিতেই রোগীর গর্ভাশয় কেটে ফেলা হয়নি। গর্ভাশয়কেটে ফেলার যে অভিয়োগে তারা মামলা করেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, তারা যদি তা প্রমাণ করতে পারেব তবে ক্ষতিপূরণ দিতে কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত রয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক জানান, কোনো রোগীর গর্ভাশয় কেটে ফেলা হলে তার রোগীর বুঝতে পারার কথা নয় , কোনো সাংবাদিকের জানার কথা নয়, কোনো আইনজীবীরও জানার কথা নয়। গর্ভাশয় কাটা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষি করে নির্ধারণ করবেন। একজন ডাক্তার। তিনি রিপোর্ট দেয়ার পরই সেটি নির্ধারণ হবে। কিন্ত কোনো ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে লুবনার স্বজনরা আইজীবীর সহায়তায় মামলা করলেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, লুবনা প্রথমবার অবস্ট্রাকটিড লেবার, পরিস্থিতি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্রার ও পায়খানার রাস্তা ছিড়ে গর্ভবতী মেয়েদের মৃত্যু ঘটে। এমনকি অনেক সময় গর্ভের শিশুরও মৃত্যু ঘটে। হাসপাত লের ডাক্তার ও নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় মা ও শিশুকে সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু পরিস্থিতির কারনে রোগীর আরোর কয়েকদিন চিকিৎসা নেয়ার প্রয়োজন ছিল। তারা চিকিৎসা না নিয়ে অনুরোধ করে চিকিৎসার ছাড়পত্র নিয়ে যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, লুবনা দ্বিত্বীয় বার ভর্তি হবার পর প্রায় এক মাস হাসপাতালে ছিলেন। তার চিকিৎসা চলছিলো। প্রায় প্রতিদিন ডাক্তরা পরিচর্যা করছেন, প্রতিদিন তার অপারেশনের জায়গায় ড্রেসিং হয়েছে, তার দুটি অপারেশন হয়েছে। সামাগ্রিম ভাবে তার বিল এসেছিল প্রায় এক লাখ নব্বই হাজার টাকা। কিন্ত লুবনার পরিবারের আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে ডাক্তারদের পরিদর্শন ও পরিচর্যা বিল সহ ড্রেসিং বিল মওকুফ করে দেয়া হয়। এছাড়াও চিকিৎসা ক্ষেত্রে যে ঔষধ ব্যবহার করা হয়েছিল তা হাসপাতালের বিক্রয় মূল্যে নয়, ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছিল এক লাখেরও একটু বেশি।
কর্তৃপক্ষ জানায়, লুবনা বেগমের স্বজনরা হাসপাতাল ছাড়ার পূর্বে মামলা করলেন। লুবনা ও তার সন্তানকে আদালতে পুলিশ যখন নিতে আসে তখনও তার ড্রেসিং চলছিল। লুবন ও তার নবজাতক শিশুকে হাসপাতলে আটকে রাখার যে অভিযোগ তা সঠিক নয়। সিলেট মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া লুবনা বেগমের চিকিৎসা বিল নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে স্বজনদের বাকবিতন্ডা হয়। এরই প্রেক্ষিতে স্বামী কুলাউড়া থানার মোহনলাল গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজের ছেলে চুনু মিয়া বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামী করা হয় ৭ জন ডাক্তর সহ ১০ জন কে। মামলা অন্যতম আসামী মা ও শিশু হাসপাতলের চেয়ারম্যান ডাঃ জাকারিয়া আহমদ। তিনি ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালের সিসিইউতে সংকটাপন্ন অবস্থায় প্রায় বিশদিন যাবত চিকিৎসাধীন রয়েছেন।