কূটনীতিকদের পরিস্থিতি জানালো বিএনপি – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

কূটনীতিকদের পরিস্থিতি জানালো বিএনপি

প্রকাশিত: ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৩১, ২০১৮

কূটনীতিকদের পরিস্থিতি জানালো বিএনপি

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবহিত করতে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কূটনীতিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছে বিএনপি। বৈঠকে দেশের চলমান  রাজনীতি, আগামী জাতীয় নির্বাচন, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলায় বিচার প্রক্রিয়াসহ সার্বিক বিষয়ে কূটনীতিকদের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করেছেন বিএনপি নেতারা। চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিকেল ৪টায় শুরু হওয়া বৈঠকের প্রথমেই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কূটনীতিকদের একটি লিখিত ব্রিফ করেন। পরে বিএনপি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা কূটনীতিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। বৈঠক শেষে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কূটনীতিকরা একে একে বিএনপি চেয়ারপারসন গুলশান কার্যালয় ছেড়ে যান। তবে বৈঠকের ব্যাপারে কূটনীতিকদের তরফে গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি। বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ব্রিফ করার কিছু নেই। কূটনীতিকদের সঙ্গে আমরা নিয়মিত বৈঠক করি। আজকেও ছিল সে রুটিন বৈঠক। স্পেশাল কিছু না। কূটনীতিকদের সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা বলেছি- বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছি। শুধু মতবিনিময় হয়েছে এ পর্যন্তই। খালেদা জিয়ার রায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, তাহলে তো আমাকে চলে যেতে হবে। আগেই বলেছি, আমরা রেগুলার যে ব্রিফ করে থাকি, সেটাই করেছি। সেই সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছি। বৈঠক সূত্র জানায়, কূটনীতিকদের কাছে নানা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, এ মামলার কোনো ভিত্তি নেই। বাদী পক্ষ (দুদক) কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। ট্রাস্টের সঙ্গে এই মামলার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়া এবং সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বিএনপি নেতারা দাবি করেছেন এ মামলা ও মামলার সম্ভাব্য রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কেবল বিএনপির নয়, সারা দেশের মানুষ এমনটি মনে করে। সূত্র জানায়, বিএনপির এক নেতা বলেছেন- যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা যদি সঠিক হতো তাহলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর শপথ ভঙ্গের মামলা হতো। কিন্তু ট্রাস্ট মামলার অভিযোগগুলো যেহেতু বানোয়াট তাই তার বিরুদ্ধে সে শপথ ভঙ্গের অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি। বিএনপি নেতারা কূটনীতিকদের জানান, বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার। তারই অংশ হিসেবে প্রধান বিচারপতিকে জোর করে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। খালেদা জিয়ার মামলাটির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চাইছে সরকার। বিচার বিভাগের ওপর সরকারের এমন নিয়ন্ত্রণ দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য অশুভ লক্ষণ। বৈঠক সূত্র জানায়, আলোচনার এ পর্যায়ে কূটনীতিকরা জানতে চান- ট্রাস্ট মামলার রায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গেলে বিএনপি কি করবে? জবাবে বিএনপি নেতারা জানান, বিএনপিসহ বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা অবশ্যই জোরালোভাবে তার প্রতিবাদ জানাবে। তবে সে প্রতিবাদ হবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে। বৈঠকে কূটনীতিকদের সঙ্গে নির্বাচন, সংলাপ ও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়েও আলোচনা করেছেন বিএনপি নেতারা। কূটনীতিকদের নির্বাচন সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের জবাবে নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়। কিন্তু সবার অংশগ্রহণ ও ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তার জন্য নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের বিকল্প নেই। বিএনপি এ যৌক্তিক দাবি জানিয়ে আসছে এবং দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল এ দাবির সঙ্গে একমত। নেতারা কূটনীতিকদের জানিয়েছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা চায় না বিএনপি। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে বারবার সংলাপের আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু সরকারের তরফে কোনো ইতিবাচক সাড়া মিলছে না। নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা দেয়ার ঘোষণাও বিএনপি দিয়েছে। কিন্তু সে ব্যাপারেও সরকারের সাড়া মিলছে না। এ সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী বাস্তবতা নিয়ে নানা যুক্তি তুলে ধরে নেতারা জানিয়েছেন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে বর্তমান সংসদ বিলুপ্ত করে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার, গুম-খুন বেড়ে যাওয়ার বিষয়গুলোও কূটনীতিকদের সামনে তুলে ধরেন নেতারা। বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন, সৌদি আরব, পাকিস্তান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, মরক্কো, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কুয়েত, নেপাল, ব্রুনাই, ভ্যাটিক্যান সিটির কূটনীতিক ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডির প্রতিনিধিসহ প্রায় ৪৫ জন কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতেও কূটনীতিকদের প্রশ্নের জবাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে বিএনপি। কূটনীতিকরা বিএনপি নেতাদের বক্তব্যগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেন। পরে তাদের লিখিত বক্তব্যের একটি কপিও দেয়া হয়। বৈঠক শেষে কূটনীতিকরা চা চক্রেও অংশ নেন। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বিএনপি নেতাদের মধ্যে- স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বৈঠকে অংশ নেন। এদিকে কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সিনিয়র নেতারা বৈঠক করেন।