কেউ ভোলে না কেউ ভোলে

প্রকাশিত: ২:৪৫ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২২

কেউ ভোলে না কেউ ভোলে

কেউ ভোলে না কেউ ভোলে

আহমেদ নূর

তখন সময়টা ছিল খুবই বৈরী। এমন একটা সময় ছিল—ঘর থেকে বের হতে হলে এক ধরনের ভীতি কাজ করত। খুব প্রয়োজন না হলে ঘরের বাইরে বেরোত না কেউ। বাড়িতে অতিথি আসা বারণ, গলির মুখে ব্যারিকেড দিয়ে অপরিচিতদের আসা ঠেকানো হতো। সময়টা এমন ছিল যে, প্রিয়জনের অসুস্থতায় কাছে যেতেও ভয় পেত অনেকে। কাউকে স্পর্শ করতে দ্বিধা ও শঙ্কা কাজ করত। কোলাকুলি নেই, গলাগলি নেই—এমনকি করমর্দনও নেই। কেউ হাঁচি-কাশি দিলেই যেন এই শেষ! এক অজানা শঙ্কা, অচেনা শত্রু।

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও ছিল সীমিত পর্যায়ে। প্রিয়জনকে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শেষ বিদায় জানাতেও পারেনি অনেকে। ঠিক এমনি এক সময়ে অতিমারি করোনা কেড়ে নেয় সিলেটের মানুষের প্রিয় নেতা বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে। কিন্তু প্রাণঘাতী ভাইরাসের ভীতিও ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি এই শহরের মানুষকে। শেষ বিদায়ে হাজারো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে দেয় কত জনপ্রিয় ছিলেন বদরউদ্দিন আহমদ কামরান!

সেই ভীতিকর সময় এখন আর নেই। তা পেরিয়ে এসেছি অনেক আগেই। তবে করোনাভাইরাস শেষ হয়ে যায়নি। এখনো আছে। যদিও ততটা ভয়ংকর নয়। মানুষের কাছে অনেকটা ডাল-ভাতের মতো হয়ে গেছে! ওই ২০২০ সালটিই ছিল করোনার দাপটের। এরপর তো মানুষের জয়গান। করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাফল্যও ঈর্ষণীয়।

আজ ১৫ জুন বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২০ সালের এই দিনে অতিমারি করোনা তাঁকে কেড়ে নেয় আমাদের কাছ থেকে। করোনা আমাদের অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে। প্রিয়জনকে কেড়ে নিয়েছে, সামাজিকতা কেড়ে নিয়েছে, সামর্থ্য কেড়ে নিয়েছে। হয়ত অত্যুক্তি হবে না এটা বললেও—আমাদের বিবেকবোধ-দায়িত্ববোধও কেড়ে নিয়েছে। তা না হলে দাহকাল পেরিয়ে কেন আমরা দায়বোধের জায়গায় ঠিক মতো দাঁড়াতে পারছি না? কেন এই দীনতা, কেন এই ব্যর্থতা? হিসাবটা মেলানো কেন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে বুঝতে পারছি না!

বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ছিলেন সিলেটের মাটি ও মানুষের নেতা। দীর্ঘ ২৮ বছর জনপ্রতিনিধি ছিলেন। সিলেটের সর্বকনিষ্ঠ ওয়ার্ড কমিশনার থেকে সিটি করপোরেশনের পর পর দু-বারের মেয়র। ছাত্রলীগের নেতা থেকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য। দীর্ঘদিন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। এক সময়ে সিলেট আওয়ামী লীগে যে ‘চার খলিফা’র কথা বলা হতো, তাঁদের একজন ছিলেন কামরান। তাঁর নামের আগে নানা বিশেষণ যুক্ত ছিল। ‘জনতার কামরান’, ‘জননন্দিত মেয়র’, ‘মাটি ও মানুষের নেতা’—এমন অনেক কিছুই। তাঁর জীবদ্দশায় সাধারণ মানুষ, অসাধারণ মানুষ, রাজনীতির মানুষ তাঁকে এভাবেই সম্বোধন করতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর দুই বছর পর আমার উপলব্ধি—সাধারণ মানুষ তাঁকে এখনো আগের মতোই মনে রাখলেও আমরা অনেকেই যেন তাঁকে ভুলে গেছি। অন্তত আমাদের কর্মকাণ্ড, আচার-আচরণ, নির্লিপ্ততা সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

ভুল-শুদ্ধ মিলিয়েই মানুষ। কামরানভাই অতিমানব ছিলেন না। কিন্তু মানুষের হৃদয় জয় করতে পেরেছিলেন। সবাই এটা পারে না। কৃষক, শ্রমিক, মজুর থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চপর্যায়ের সবাই এ-কথা স্বীকার করবেন বলে আমার ধারণা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর দু-বছর পরও আমরা তাঁর জন্য একটা স্মরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারলাম না—এটা চরম গ্লানির, ব্যর্থতার এবং লজ্জার। এটা আমাদের এবং তাঁর সতীর্থদের জন্যও অবশ্যই।

কামরানভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বহুমাত্রিক। একজন সাংবাদিক, একজন বন্ধু, একজন অনুজ এবং একজন শুভাকাঙ্খির। অনেকটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। এটা তাঁর পরিবারেরও জানা। সম্পর্ক ওই পর্যন্তই। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমি গভীরভাবে জড়িয়েছিলাম অনেক পরে, যখন গুলশান হোটেলে তাঁকে উদ্দেশ করে গ্রেনেড হামলা হয়েছিল, যখন তাঁর অনেক কাছের মানুষ তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমি পারিনি। যথাসম্ভব আমি তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। সেটা অব্যাহত ছিল ২০০৯ সাল পর্যন্ত। তাঁর দল আওয়ামী লীগ সরকার গঠন পর্যন্ত। মনে পড়ে, আমরা সিলেট বিভাগের নির্বাচিত সব সংসদ সদস্যদের সিলেট রেজিস্ট্রারি মাঠে সংবর্ধনা দিয়েছিলাম। এরপর কিছুটা ছেদ পড়ে। কেন পড়ে, সেটা আমার জানা নেই। অবশ্য যাঁরা আমাকে চেনেন, তাঁরা জানেন—ক্ষমতায় কেউ থাকলে আমি সব সময়ই একটু দূরে থাকার চেষ্টা করি। এটা আমার ব্যক্তিগত জীবনদর্শন। তবে এটাও ঠিক—তাঁর এবং আমার সম্পর্কে ফাটল ধরাতে অনেকেই সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরা সফলও হয়েছিলেন। এতে আমার কোনো খেদ নেই। তবে এ নিয়ে শুভাকাক্সক্ষী মহলে নানা প্রশ্ন। তাই একবার আমরা সেটা জানার চেষ্টা করেছিলাম। কাছের কিছু মানুষ—আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসেন রানা (সদ্যপ্রয়াত), মোসারফ হোসেন (প্রয়াত), মিকনদা (তুহিন কুমার দাস)-সহ আমরা একসঙ্গে একদিন দীর্ঘক্ষণ বসেছিলাম। জানার চেষ্টা করেছিলাম, কোথায় গলদ? কামরানভাই হয়ত সবকিছু বলতে চাননি অথবা কাউকে বিরাগভাজন করতে চাননি—তাই এড়িয়ে গিয়েছিলেন। মিকনদা এখনো জীবিত সাক্ষী।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় যখন কামরানভাই প্রথম একটি মামলায় গ্রেপ্তার হলেন, কোতোয়ালি থানায় সার্বক্ষণিক আমিই ছিলাম তাঁর সঙ্গে। তাঁর কাছের কাউকে আর দেখতে পাইনি সেখানে, এটাই সত্য। শুধু থানা কম্পাউন্ডে নির্বাক দৃষ্টিতে একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি একজনকে, তিনি দিবাকর ধর রাম। সিলেটের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিমাংশু ধরের (ঝর্না বাবু) ছেলে। কামরানভাইয়ের একনিষ্ঠ শুভাকাঙ্খি তিনি। সে অনেক কথা, অনেক সত্য, অনেক বিস্ময়!

কামরানভাইয়ের রাজনীতি শুরু ছাত্রাবস্থায়। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে মিছিলে-মিটিংয়ে তিনি ছিলেন সরব। একান্ত সময়ে সেসব স্মৃতিচারণ করেছেন আমাদের কাছে। শহরের রাজপথ, পাড়ার অলিগলি কাঁপিয়েছেন মিছিল-শ্লোগানে। ট্রাকে চড়ে মাইকে গান গেয়েছেন, ‘নৌকা চলিল চলিল, চলিল রে, সঙ্গে জনগণ’। সেই শুরু। আর থেমে থাকেননি। জীবিকার তাগিদে মাঝখানে দেশের বাইরে গেলেও ফিরে এসেছেন আবার। আমৃত্যু আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রায়ই তাঁর কণ্ঠে আরেকটি গান শোনা যেত—

যদি রাত পোহালে শোনা যেত,

বঙ্গবন্ধু মরে নাই।

যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো,

বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই।

তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা,

আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা।

কামরানভাইয়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশে সে-রকম পরিস্থিতি ছিল না যে, কিছুই করা যাবে না। কিন্তু আমরা তাঁকে স্মরণ করতে পারিনি। এ বছর তো সবকিছুই স্বাভাবিক। কিন্তু এবারও তাঁর জন্য একটি স্মরণসভা করতে পারছি না—এটা বড় দুঃখের বিষয়। যে ব্যক্তিটি ২৮ বছর জনপ্রতিনিধি ছিলেন, দু-বার মেয়র ছিলেন তাঁর জন্য সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ একটি স্মরণসভার আয়োজন করতে পারত না? তিনি যে রাজনৈতিক দল করতেন, তাঁরাই-বা কী করলেন? এই অযাচিত মন্তব্যের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কিন্তু কামরানভাই যে ছিলেন আমার আত্মার আত্মীয়। তাই ক্ষোভটা প্রকাশ না-করে পারলাম না। বিষয়টা কারও জন্য অস্বস্তিকর হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, এ প্রত্যাশা করি।

এ লেখাটি যখন লিখছি, তখন জানতে পারলাম নগরেরর মজুমদারপাড়ায় একটি মাদ্রাসায় সোমবার (১৩ জুন) বাদ জোহর বাবলা অ্যান্ড ব্রাদার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী মো. রফিকুল আলমের উদ্যোগে একটি মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ আজ (১৫ জুন) কামরান ভাইয়ের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দুপুর সাড়ে ১২টায় তাঁর কবর জিয়ারত এবং মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে বাদ জোহর মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। তবুও আক্ষেপ থেকে গেল, আরও বড় পরিসরে আমরা কিছু করতে পারতাম না?

অগেই বলেছি, কামরানভাই বহুমাত্রিক মানুষ ছিলেন। কীভাবে মানুষের মন জয় করতে হয়, তিনি জানতেন। তিনি সাধারণ মানুষের মন ঠিকই জয় করেছিলেন। কিন্তু আমাদের? হয়ত পারেননি। না-হলে কেন এমন হবে?

গানের চর্চা না থাকলেও কামরানভাই খুব ভালো গান গাইতেন। তাঁর কত গান এখনো মনে পড়ে। প্রয়াত সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী তাঁর খুব প্রিয় ছিলেন। সুবীর নন্দী অসুস্থ হলে তাঁর সহায়তায় সিলেটে চ্যারিটি শো করেছেন। সুবীর নন্দীর দুটো গান প্রায়ই স্টেজে কিংবা ঘরোয়া আসরে কামরানভাই গাইতেন। ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার, শত্রু বলে গণ্য হলাম’ কিংবা ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো, সে কথা তুমি যদি জানতে’। মান্না দে-র অনেকগুলো গানের মধ্যে একটি গান তিনি প্রায়ই গাইতেন, ‘যদি কাগজে লেখো নাম, কাগজ ছিড়ে যাবে/পাথরে লেখো নাম, পাথর ক্ষয়ে যাবে/হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে’।

আজ বলতে ইচ্ছে করছে, আসলেই হয়ত কামরানভাই আমাদের বন্ধু হতে পারেননি। এই শহরের মানুষকে তিনি কতটা ভালোবাসতেন, সেটা জানা হয়নি। আর হয়ত তাঁর নামটি আমরা হৃদয়ে লিখে রাখতে পারিনি। এই আমরা—আমরাই। আপামর মানুষ নয়, কতিপয়। জীবিত থাকতে কামরানভাই অনেকের বিরাগভাজন ছিলেন, কিন্তু মৃত্যুর পর? গত আড়াই বছর ধরে করোনাভাইরাসের প্রকোপ। তারপরও অনেক সংকট গেছে। তখন বোঝা গেছে একজন কামরানের কত বেশি প্রয়োজন। সিলেটে আরেকজন কামরান কই? আরেক কামরানের জন্য সিলেটবাসীকে আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে কে জানে!

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি গজলের দুটো লাইন মনে পড়ছে। অসম্ভব জনপ্রিয় গজল। কিংবদন্তি শিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, ফিরোজা বেগমসহ অনেকে গেয়েছেন—‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে অতীত দিনের স্মৃতি/কেউ দুঃখ লয়ে কাঁদে কেউ ভুলিতে গায় গীতি’।

কামরানভাই, আমি এবং আমরা এখনো আপনাকে ভুলিনি। তবে আপনার অনেক কাছের মানুষ, রাজনীতির মানুষ আপনাকে ভুলে গেছে। এটাই সত্য, নির্মম সত্য।

লেখক : সম্পাদক, সিলেট মিরর।
সুত্র : সিলেট মিরর।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল