কোভিড-১৯: বাস্তবতা ও বিহিতাদেশের প্রার্থনা জানিয়ে সিলেটের নাগরিকদের স্মারকলিপি প্রদান – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

কোভিড-১৯: বাস্তবতা ও বিহিতাদেশের প্রার্থনা জানিয়ে সিলেটের নাগরিকদের স্মারকলিপি প্রদান

প্রকাশিত: ৫:৩২ অপরাহ্ণ, জুন ২৪, ২০২০

কোভিড-১৯: বাস্তবতা ও বিহিতাদেশের প্রার্থনা জানিয়ে সিলেটের নাগরিকদের স্মারকলিপি প্রদান

আজ বুধবার জেলা ২টায় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোভিড-১৯ প্রসঙ্গে সিলেটের বাস্তবতা এবং বিহিতাদেশ প্রার্থনা জানিয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষথেকে স্মারকলিপিটি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপি গ্রহণ করেন জেলা প্রশাসক এম. কাজী এমদাদুল ইসলাম। স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন, সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকরামুল কবীর, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আমিনুল ইসলাম চৌধুরী লিটন, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাক শাহ্ দিদার আলম নবেল, ইমজা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক সজল ছত্রী, ভূমিসন্তান বাংলাদেশের সমন্বয়ক আশরাফুল কবীর, খেলাঘর সিলেটের সহ সভাপতি অরূপ শ্যাম বাপ্পী।

নিম্নে স্মারকলিপিটি পাঠকদের জন্য প্রকাশিত করা হলো:

স্মারকলিপি
বরাবর
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

মাধ্যমে : জেলা প্রশাসক, সিলেট।

বিষয় : কোভিড-১৯ প্রসঙ্গে সিলেটের বাস্তবতা এবং বিহিতাদেশ প্রার্থনা।

জাতির পিতার কন্যা,
আমরা সচেতন সিলেটবাসী এবং সিলেটের প্রতিনিধিত্বশীল বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ, আপনার কাছে আকুল আবেদন জানাতে চাই যে, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে বাস্তবতা এবং স্বাস্থ্যবিভাগ ও অন্যান্য সিভিল প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে আমরা স্পষ্টতই সমন্বয়হীনতা ও অবহেলা দেখতে পাচ্ছি। আমরা জানি বৈশি^ক এই মহামারির সময়ে দেশের সকল মানুষের মঙ্গলচিন্তার সঙ্গে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে স্থিতিশীল রাখতে আপনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নির্ঘুম কাজ করছেন। বর্তমান সময়ে টিভির পর্দায় আপনার ব্যথিত চোখ দেখে আমরাও আপ্লুত হই। তবে একই সঙ্গে তা থেকে শক্তি ও সাহস পাই। সেই মঙ্গলচিন্তা থেকেই আপনাকে সিলেটের বাস্তবতা জানানো জরুরি মনে করছি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি হয়ত জানেন সিলেট জেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দু হাজারে পৌঁছেছে। প্রতিদিনই গড়ে অর্ধশতাধিক লোক আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু সেটা নমুনা পরীক্ষার সংখ্যার হিসেবে, বাস্তবে আক্রান্ত হয়ত আরো অনেক বেশি। কারণ অনেকে পরীক্ষার সুযোগই পাচ্ছে না। উপযুক্ত পদক্ষেপের অভাবে আক্রান্তরা বেপরোয়া ঘোরাফেরা করে সংত্রমণকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে, অক্সিজেন না পেয়ে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। এ নিয়ে আমাদের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব একে আব্দুল মোমেন তীব্র ক্ষোভ জানানোর পর এখন কিছু হাসপাতাল চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু আরো কিছু বিষয় আছে যেগুলোতে সরাসরি আপনি নির্দেশনা না দিলে কোনো পরিবর্তনের সুযোগ দেখছি না আমরা। তাই এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমরা আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।
করোনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিলেটের জননন্দিত নেতা, সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে আমরা গভীর শোকাহত। এমন করুণ বিদায় রোধে অন্তত তিনটি বিষয়ে আপনার কাছে কঠোর ও কার্যকর নির্দেশনা প্রত্যাশা করছি।

১.
সিলেট নগরীসহ সিলেট জেলায় গত মে মাস পর্যন্ত আক্রান্ত ছিলেন ৫৫৫ জন। আর চলতি জুন মাসের প্রথম ২০ দিনেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তি। মে মাস পর্যন্ত জেলায় মৃতের সংখ্যা ছিল ১৪। আর গত ২০ দিনে মারা গেছেন ৩১ জন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ, র‌্যাব, সাংবাদিক, সাধারণ কর্মজীবী সবার মধ্যেই সংক্রমণ বাড়ছে। গ্রামেও ছড়িয়ে গেছে করোনাভাইরাস। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও লকডাউন বা লোকজনের বেপরোয়া ঘোরাফেরা বন্ধ করতে কোনো উদ্যোগ নেই। সিলেট নগরীর প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ড ও জেলা পর্যায়ে সকল উপজেলার কোনো না কোনো এলাকা রেড জোনে পড়লেও প্রশাসন আশ্চর্যজনকভাবে নির্বিকার। এ ব্যাপারে এখনই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিবে।

২.
সিলেটে এক সপ্তাহ ধর্ণা দিয়েও করোনা পরীক্ষা করাতে পারছে না উপসর্গে ভোগা মানুষ। যারা নমুনা জমা দিচ্ছেন তাদের ফলাফল পেতে সময় লাগছে ১৫ দিন পর্যন্ত। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের একটি মাত্র ল্যাবে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৮৮টি নমুনা পরীক্ষা হয়। এছাড়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ল্যাব থাকলেও সেখানে শুধু সুনামগঞ্জ জেলার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ফলে ব্যাপক নমুনা জট সৃষ্টি হয় এবং প্রায়ই ঢাকায় নমুনা পাঠাতে হয়। সেখান থেকে ফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এই সময়ে আক্রান্তরা স্বাভাবিক কর্মে থেকে অন্যদেরও আক্রান্ত করছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
এ বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, সিলেটে করোনা শনাক্তে পর্যাপ্ত পিসিআর ল্যাব নেই। কিন্তু যে ল্যাব আছে আন্তরিক হলে তাতেও পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয় কম সংখ্যক লোক নিয়ে যে পরিমাণ পরীক্ষা হচ্ছে সেখানে ওসমানী হাসপাতালে চারগুণ লোকবল নিয়ে সমান সংখ্যক পরীক্ষাই হচ্ছে। নমুনা বেশি হলে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দলটি কর্মঘন্টা বাড়িয়ে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াচ্ছেন, কিন্তু ওসমানী হাসাপাতালে রুটিন ওয়ার্কের বাইরে কিছুই হচ্ছে না।
সংক্রমণ রোধে পরীক্ষা সবচেয়ে আবশ্যিক, সেই বিবেচনায় সিলেটে পিসিআর ল্যাব বাড়ানো এবং বেশি সংখ্যক নমুনা পরীক্ষা নিশ্চিতে আপনার জরুরি নির্দেশনা প্রত্যাশা করছি।

৩.
বাস্তবতার বিচারে সিলেটেও করোনা চিকিৎসা এবং আইসোলেশন সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল। একমাত্র শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসাপাতালের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে আমাদের। সেখানেও পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন সুবিধা এখনো নেই। সম্প্রতি মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েকটি ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করলেও এখানে আরও ভেন্টিলেশন সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সেখানে দায়িত্বরতদেরও আলাদা আবাসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে তারা সেবা শেষে বাড়িতে যাচ্ছেন এবং পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ খুব সহজেই সরকারি ডাকবাংলো বা বেসরকারি হোটেল-রেস্ট হাউজকে এজন্য ব্যবহার করতে পারে প্রশাসন।
বেশকটি দুঃখজনক ঘটনার পর মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সিলেটে দুটি বেসরকারি হাসপাতাল করোনা আক্রান্তদের সীমিত আকারে সেবা দেওয়া শুরু করলেও তাতে যা খরচ আসছে তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমরা জানি সিলেটকে আপনি বিশেষ মমতা দিয়ে বিবেচনা করেন। এই চরম দুঃসময়ে আপনার সেই মমতার পরশটুকু চাই আমরা। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের বদ্ধমূল ধারণা যে, সিলেটের প্রকৃত বাস্তবতা আপনার কাছে আড়াল করা হচ্ছে। কিন্তু সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে আপনার কর্মদক্ষতার প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ ভরসা রয়েছে। সিলেটকে মহামারির হটস্পট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা ও আক্রান্তদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আমরা আপনার নির্দেশনার অপেক্ষা করছি ।

সিলেটের সর্বস্তরের নাগরিকের পক্ষে স্বাক্ষর করেন
১. আফজাল রশিদ চৌধুরী, সভাপতি, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি
২. আবু তাহের মো. শোয়েব, সভাপতি, সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি
৩. অধ্যাপক জাকির হোসেন, সাধারণ সম্পাদক, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ
৪. ইকবাল সিদ্দিকী, সভাপতি, সিলেট প্রেসক্লাব
৫. সদর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, প্রেসিডেন্ট, সিলেট স্টেশন ক্লাব
৬. আমিনুল ইসলাম চৌধুরী লিটন, সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট
৭. ভবতোষ রায় বর্মন, সাবেক ইউনিট কমান্ডার, সিলেট মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ
৮. এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতি
৯. বেদানন্দ ভট্টাচার্য, এডভোকেট, সিলেট জেলা জজ কোর্ট
১০. আহমেদ নূর, সম্পাদক- দৈনিক সিলেট মিরর ও সাবেক সভাপতি সিলেট প্রেসক্লাব
১১. নিজাম উদ্দিন লস্কর, মুক্তিযোদ্ধা, লামাবাজার, সিলেট
১২. আশরাফুল কবীর, ভূমিসন্তান বাংলাদেশ
১৩. ফারুক মাহমুদ চৌধুরী, সভাপতি, সুজন, সিলেট
১৪. আজিজ আহমদ সেলিম, সভাপতি সনাক, সিলেট
১৫. আবদুল করিম কিম, সাধারণ সম্পাদক, বাপা
১৬. অরূপ শ্যাম বাপ্পী, সহ সভাপতি, খেলাঘর, জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন
১৭. লোকমান আহমদ, সভাপতি, সিলেট জেলা জাসদ
১৮. মো. সিকন্দর আলী, সভাপতি, ওয়ার্কার্স পার্টি, সিলেট জেলা।
১৯. আসাদ উদ্দিন আহমদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ
২০. মো. আরশ আলী, সভাপতি, গণতন্ত্রীপার্টি
২১. ইকরামুল কবির, সাবেক সভাপতি, সিলেট প্রেসক্লাব
২২. শাহ্ দিদার আলম নবেল, সাধারণ সম্পাদক, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব
২৩. সজল ছত্রী, সাধারণ সম্পাদক, ইমজা, সিলেট
২৪. এডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা, সাবেক সভাপতি, সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতি
২৫. ভাস্কর রঞ্জন দাশ, প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ কলেজ বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) কেন্দ্রীয় কমিটি
২৬. সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল, সাবেক কমান্ডার, সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।
২৭. মো. ফজলুল হক সেলিম এডভোকেট, সাধারণ সম্পাদক, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতি
২৮. মিশফাক আহমদ মিশু, সভাপতি, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ, সিলেট
অনুলিপি : সদয় অবগতির জন্য
১. জনাব এ কে আব্দুল মোমেন, মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য সিলেট-১ আসন
২. জাহিদ মালেক এমপি, মাননীয় মন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
৩. সচিব, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
৪. বিভাগীয় কমিশনার, সিলেট বিভাগ
৫. বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), সিলেট বিভাগ
৬. সিভিল সার্জন, সিলেট

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল