গণধর্ষিতার কোলে ফুটফুটে নবজাতক প্রতিবন্ধী কিশোরী বিচার চাইবে কার কাছে? – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

গণধর্ষিতার কোলে ফুটফুটে নবজাতক প্রতিবন্ধী কিশোরী বিচার চাইবে কার কাছে?

প্রকাশিত: ৭:৪৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৬

গণধর্ষিতার কোলে ফুটফুটে নবজাতক প্রতিবন্ধী কিশোরী বিচার চাইবে কার কাছে?

34প্রতিবন্ধী পিতার প্রতিবন্ধী কিশোরী কন্যার জীবনে এখন ঘোর অমানিশা। ৬ নরপশুর নির্যাতনের সাক্ষী তার কোলজুড়ে। হতভাগ্য কিশোরীর জীবনটাকে তছনছ করে দেয়া সেই অপরাধীরা এখনও অধরা। প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরছে। বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো সমাজচ্যুত হয়েছে অসহায় এ পরিবারটি। প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেয়াই কি মেয়েটির অভিশাপ, হতভাগ্য কিশোরী কার কাছে চাইবে এ জুলুমের বিচারÑ এমন প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার সুচক্রদন্ডী হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এ এলাকার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তপন দে নামের এক অসহায় দিনমজুরের অধিবাস। তার স্ত্রীসহ দুইকন্যা ও এক ছেলে রয়েছে। দিনমজুরী করে কোনরকম তার সংসার চলে। স্ত্রী মঞ্জু রানী দে লোকজনের বাড়ীতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে স্বামীর সংসারে সহযোগিতা করে আসছিলেন। বড় ১৪ বছরের কিশোরী মেয়েটি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। মেঝ মেয়েটি দশ বছর। আর একমাত্র ছেলেটির বয়স ছয়বছর। সবমিলিয়ে অভাব অনটনের সংসার চালিয়ে আসছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তপন। প্রতিবন্ধীর এই সংসারে সামাজিকভাবে তাদের দেখার যেন কেউ নেই। একাহারে-অনাহারে দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতের মধ্যে চলে এই প্রতিবন্ধী পরিবারের সংসার। এরই মাঝে হঠাৎ একদিন মানবরূপী যৌন হায়েনাদের শিকার হয় প্রতিবন্ধী কিশোরী মেয়েটি। গত বছরে ২১ জুন তপন দের প্রতিবেশী ছয়জন কিশোর তরুণ অসহায় মঞ্জু রানীর প্রতিবন্ধী ১৪ বছরের মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। একই এলাকার ছয়জন কিশোর মিলে গণধর্ষণ চালায় কিশোরী প্রতিবন্ধী মেয়েটিকে। তারা হলো, পিয়াল দে (২০), ইমন দে (২০), জনি দে (২৬), সুজন দে (২২), নয়ন দে (২২), সজিব দে (২২)। এতে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। ধর্ষণকারীরা সবাই তপন দের প্রতিবেশী। ঘটনার ৬ মাস পর কিশোরীর মা কিশোরীর শারীরিক অবস্থা দেখে ও পরীক্ষা করে এবং কিশোরী থেকে ঘটনা সম্পর্কে জেনে বিস্তারিত অবগত হয়। পরে পাশবিক এ বিষয়টি স্থানীয় কাউন্সিলর রুপক সেনকে জানানো হয়। রুপক সেন ধর্ষণকারীদের অভিভাবকদের ঘটনাটি জানিয়ে একটি ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটের অংক মিলাতে গিয়ে রুপক সেন ধর্ষণকারীদের পক্ষে অবস্থান নেয়। এলাকার ৫/৬ জনকে নিয়ে রুপক সেন ঘটনাটি কিছু টাকার বিনিময়ে মীমাংসা করার চেষ্টা করেন। এতে ধর্ষিতা কিশোরীর মা রাজি না হওয়ায় কাউন্সিলর রুপক সেন ভিকটিমের মায়ের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। এ অবস্থায় গত ৪ জানুয়ারী চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইডের সহায়তায় ভিকটিমের মা মঞ্জু দে বাদী হয়ে চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষক ছয়জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। পরে আদালত সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পটিয়া থানাকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেন। মামলা হওয়ায় পৌর কাউন্সিলর রুপক সেন ও ধর্ষকরা ক্ষীপ্ত হয়ে বাদীকে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেন। এতে বাদী মঞ্জু রানী দে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে কাউন্সিলর ও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে গত ১২ ফেব্রুয়ারী পটিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন। এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে বাদী মঞ্জু রানী দে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। এর জবাবে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী কাউন্সিলর রুপক কুমার সেন পটিয়া পৌরসভা মিলনায়তনে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারী পটিয়া থানা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারী আদালত পটিয়া থানার তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে উক্ত ৬ আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।   এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ১৬ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে এলায়েন্স অব আরবান ডিপিও’স ইন চিটাগাং ও নারী যোগাযোগ কেন্দ্র চট্টগ্রাম মহানগর ও এর যৌথ উদ্যোগে এবং স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংগঠন ইউনাইট্ থিয়েটার ফর সোশাল অ্যাক্শন্ ও নওজোয়ান এর সহযোগিতায় পটিয়ায় বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কিশোরী গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত আসামীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ এর আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের কেন্দ্রিয় সভাপতি অ্যাডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত। এদিকে ভিকটিম পরিবারের অভিযোগ, ধর্ষকদের বিচার চাওয়ায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তপন দে ও তার পরিবারকে ধর্ষণকারীদের অভিভাবকদের ইঙ্গিতে প্রভাবশালী মহল মামলা তুলে নেয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। তাতে রাজি না হওয়ায় প্রভাবশালী মহল তপনের পরিবারকে সমাজচ্যুত ও একঘরে করে দেয়। ফলে পুকুর ব্যবহারসহ সামাজিক সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে পরে এই হতদরিদ্র প্রতিবন্ধী কিশোরীর পরিবার। প্রভাবশালী মহলের চাপে পুলিশ ধর্ষকদের গ্রেপ্তারে একবারও ভূমিকা রাখেনি। একজন ধর্ষকও গ্রেফতার হয়নি। ধর্ষকেরা পলাতক রয়েছে। কাউন্সিলর ও ধর্ষক পরিবারের বারবার হুমকির মুখে প্রতিবন্ধী পরিবার এখন নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে বলে তপনের পরিবারে অভিযোগ। এ যাতনার মাঝে গত ৮ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয় এক ফুটফুটে নবজাতক কন্যা সন্তান। অনাকাক্সিক্ষত ভবিষ্যৎ নিয়ে জন্ম লাভ করা এ কন্যা সন্তানের গন্তব্য কোথায় জানে না প্রতিবন্ধী কিশোরী ও তার পরিবার। প্রতিবন্ধী হিসেবে জন্ম নেয়া যেন কিশোরী মেয়েটির অভিশাপ। একদিকে তপনের পরিবারের দারিদ্র্যতার নির্মম কষাঘাত অন্যদিকে সমাজসেবী প্রভাবশালী মহলের চাপ, ভয়ভীতি হুমকি প্রদর্শন, সামাজিকভাবে একঘরে এ অবস্থায় তপনের পরিবারটি বেঁচে থাকা যেন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজের কুলাঙ্গার নরকীট ধর্ষকেরা প্রভাবশালী মহলের আদরে নিরাপত্তা আশ্রয়ে রয়েছে। অনেকের অভিযোগ ধর্ষকেরা এলাকায় প্রায় সময় বুক ফুলিয়ে ঘুরলেও পুলিশ জেনেও না জানার ভান করে চলেছে। এ ব্যাপারে পটিয়া উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী নেত্রী আফরোজা বেগম জলি বলেন, ‘এটি গণধর্ষণ নয় এটি একটি গণধর্ষণ। তিনি কিশোরী প্রতিবন্ধী মেয়েটির জন্ম নেয়া সন্তানটিকে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় লালন পালনের জন্য সরকারের প্রতি দাবী জানান। পাশাপাশি অবিলম্বে ধর্ষক নড়পশুদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তির দাবী করেছেন। পটিয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আতিয়া চৌধুরী ধর্ষকদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারসহ সুষ্ঠু বিচার আশা করেন। তিনি বলেন, আসামীদের গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হাশেম জানান, ‘ধর্ষিতা পরিবারকে সব ধরনের নিরাপত্তা দেয়া হবে। আসামীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে পটিয়া থানার ওসি রেফায়েত উল্লাহ চৌধুরী বলেন, আসামীদের গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা চলছে। তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্নয় করতে না পারায় গ্রেপ্তার করতে কিছু সময় লাগছে।

Copyright Daily Inqilab