গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে কি ? – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে কি ?

প্রকাশিত: ৮:৩৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০২০

গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে কি ?

পারভীন বেগম:

একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে নিরীহ মানুষের ওপর পরিচালিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি বাংলাদেশ। গত দুই বছর ধরে দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য উদ্যোগ নেয়া হলেও জাতিসংঘ ঘোষিত গণহত্যাবিষয়ক একটি দিবস থাকায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এই স্বীকৃতি পাওয়া। যদিও মুক্তিযুদ্ধবিয়ষক মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। সময়সাপেক্ষ হলেও আন্তর্জাতিকভাবে এই স্বীকৃতি আদায় করবে বাংলাদেশ।

একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ৫০ হাজার বাঙালিকে হত্যা করে হানাদার পাকিস্তানি সেনারা। ওই রাতে একযোগে পাকসেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানায় তখনকার ইপিআর সদর দপ্তর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে হামলাসহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নয় মাসে তারা ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করে। গণহত্যা শুরুর পর থেকেই বীর বাঙালি প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলে।

একাত্তরের গণহত্যার বিষয়টি স্মরণ করে ২০১৭ সাল থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ২৫ মার্চকে জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়েছে। ওই বছর ১১ মার্চ সংসদে এ দিনটিকে জাতীয় গণহত্যা দিবস ঘোষণা করার প্রস্তাব আনেন জাসদ নেত্রী শিরিন আখতার। সাত ঘণ্টা আলোচনার পর প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। পরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেয়ার জন্য একটি বিল পাস করা হয়। এর আগে বেসরকারি উদ্যোগে ২০০১ সালে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস পালনের দাবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথমবার তোলা হলেও সরকারি উদ্যোগের অভাবে তা এগোয়নি। বরং ২০১৫ সালে জাতিসংঘ ৯ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা দিলে সে সুযোগ হাতছাড়া হয় বাংলাদেশের।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্ভব কিনা জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ভোরের কাগজকে বলেন, গণহত্যার সংজ্ঞা মেনে জাতিসংঘে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও দলিল পাঠানোর কাজ চলছে। এখন কূটনৈতিক পর্যায়েও প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। তখন যেসব রাষ্ট্র প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তারাও বুঝতে পেরেছে, একাত্তরে পাকি বাহিনীকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। মন্ত্রী বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই ২০টি রাষ্ট্রের সম্মতি পেয়েছি। অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গেও কথা চলছে। স্বীকৃতি আদায়ের জন্য অন্তত ৮০টি রাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন। কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সফলভাবে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিকে বোঝাতে সক্ষম হব। ৯ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী গণহত্যা দিবস যে পালিত হচ্ছে, তার পেছনের কোনো ইতিহাস নেই। ফলে ২৫ মার্চ স্বীকৃতি পাওয়া আমাদের জন্য সহজ হবে।

এদিকে একাত্তরের গণহত্যার নতুন তথ্য এসেছে ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের জরিপে। জরিপ অনুযায়ী, ২০ জেলায় ৫ হাজার ১২১টি গণহত্যা ঘটেছে। বধ্যভূমির সংখ্যা ৪০৪, গণকবর ৫০২ ও নির্যাতন কেন্দ্র ৫৪৭টি। প্রতিটি গণহত্যায় ৫ থেকে ১ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আবার চুকনগরে একটি গণহত্যায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন। ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, এই জরিপ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, আমরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বড় কম জানি। আমাদের মাথায় আধিপত্য বিস্তার করে আছে বিজয়। খালি বিজয় দেখলে মুক্তিযুদ্ধের যে নিদারুণ যন্ত্রণা, সেটা কিন্তু আমরা পাব না। এর আগে গত বছর মার্চে অন্য ১০টি জেলার জরিপের ফল প্রকাশ করেছিল সংগঠনটি। তখন জানানো হয়েছিল, নীলফামারী, বগুড়া, নাটোর, কুড়িগ্রাম, পাবনা, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, নারায়ণগঞ্জ, ভোলা ও খুলনা জেলায় মোট এক হাজার ৭৫২টি গণহত্যার ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষকরা বলছেন, জাতিসংঘ ঘোষিত গণহত্যাবিষয়ক দিবস থাকায় আরেকটি স্বীকৃতি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আর এই পথ বন্ধ করেছে সরকারই। জানতে চাইলে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান শাহরিয়ার কবির ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা ১৯৯৩ সাল থেকে ২৫ মার্চ গণহত্যার কালরাত্রিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদদের স্মরণে সমাবেশ ও আলোর মিছিল করি এবং ২৫ মার্চকে জাতীয় গণহত্যা দিবস ঘোষণার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি। দীর্ঘকাল আমাদের দাবির প্রতি কোনো সরকারই কর্ণপাত করেনি। আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি পেতে আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু সরকারি উদ্যোগ না থাকায় তা সম্ভব হয়নি।

জানা যায়, গত কয়েক দশকে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন আন্তর্জাতিক ফোরামে দাবি জানিয়ে আসছে। ২০০১ সালে ইউনেস্কোর কাছে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ের বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে প্রথম তুলেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের গবেষক এবং ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রধান ডা. এম এ হাসান। ২০০৪ সালে ২৫ মার্চকে গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আবেদন জানান তিনি। জবাবে ইউনেস্কো জানিয়েছিল, স্বীকৃতি পেতে হলে বাংলাদেশকে জাতিসংঘে তা তুলে ধরতে হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি নিয়ে তা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে পাস করতে হবে। ২০০৯ সালে তিনি সরকারের কাছে তা তুলে ধরলেও সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। একই দাবিতে ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইউনেস্কো এবং গণহত্যার ভিকটিম বিভিন্ন দেশে চিঠি লিখে, আইন প্রণেতাদের সঙ্গে কথা বলে নিজস্ব প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ওই চিঠির ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের মার্চে আর্মেনিয়া থেকে পাল্টা চিঠি দিয়ে বাংলাদেশে দিবসটি কীভাবে পালন করা হয় এবং এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত পাঠানোর জন্য বলা হয়েছিল।

এ প্রেক্ষাপটে নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে তখন জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়, বাংলাদেশে এখনো দিবসটি ঘোষণা হয়নি। তবে বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষ গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে। শাহরিয়ার কবির বলেন, পরে জবাব এলো, যা বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে পালন করে না, তা আন্তর্জাতিকভাবে কেন জাতিসংঘকে পালন করতে হবে? সে কারণে আর্মেনিয়ার প্রস্তাব অনুযায়ী, ৯ ডিসেম্বর গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ যেদিন ৯ ডিসেম্বরকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করে সেদিন বাংলাদেশও উপস্থিত ছিল। কিন্তু কোনো ভেটো দেয়নি, একবারও বলেনি, গণহত্যা দিবস হওয়া উচিত ২৫ মার্চ। কারণ বিশ্বের কোথাও এক দিনে এত বড় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি। অথচ তখন বাংলাদেশ কিছু বলেনি।

১৯৪৮ সালে গৃহীত জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য প্রিভেনশন এন্ড পানিশমেন্ট অব দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইডে গণহত্যার পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে কোনো গোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা, তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিসাধন, জীবনমানের প্রতি আঘাত ও শারীরিক ক্ষতিসাধন, জন্মদান বাধাগ্রস্ত করা এবং শিশুদের অন্য গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেয়া। এই পাঁচটি উপাদানের কোনো একটি থাকলেই কোনো ঘটনা গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত হবে। গবেষকদের মধ্যে এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রথম চারটি বৈশিষ্ট্যই ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞে রয়েছে। তাই এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। এ ছাড়া উনিশ শতক থেকে নৃশংস গণহত্যার মধ্যে রয়েছে আর্মেনীয় গণহত্যা, হলোকাস্ট ও ন্যানকিং গণহত্যা, কম্বোডীয় গণহত্যা, একাত্তরের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নামে বাঙালি গণহত্যা, বসনীয় গণহত্যা, বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ডের গণহত্যা এবং সর্বশেষ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা। তবে এর মধ্যে বর্বরোচিত গণহত্যা ঘটেছে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব বাংলা) একাত্তরের ২৫ মার্চ।

তবে বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকলেও বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানি বর্বরতার বিষয়টি স্বীকৃত। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আর্জেন্টিনা, হংকং, পোল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একাধিক বিদেশি গবেষকও একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ নামে একটি কোর্স চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও বছরব্যাপী গণহত্যাবিষয়ক বিভিন্ন ধরনের সংক্ষিপ্ত কোর্স ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে।