চিকিৎসা সেবার নামে গলাকাটা ব্যবসা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

চিকিৎসা সেবার নামে গলাকাটা ব্যবসা

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৫, ২০১৯

চিকিৎসা সেবার নামে গলাকাটা ব্যবসা

রোগীদের সাথে দুর্ব্যবহার, রূঢ় আচরণ
সিজার ১৫,০০০ টাকা লেখা থাকলেও নেয়া হচ্ছে ২৫,০০০
হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে সিজার

আহমদ মারুফ
সীমান্তিক-বিনোদিনী নগর হাসপাতাল। সিলেট নগরবাসীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে গড়ে উঠেছে এই চিকিৎসা কেন্দ্র। নগরবাসীর দোরগোড়ায় মান সম্পন্ন চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার নামে এখানে চলছে ভয়াবহ প্রতারণা ব্যবসা। আর্তমানবতার সেবার বদলে চলছে রোগীকে জিম্মি করে অর্থ আদায়। স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের বদলে রোগী ও প্রসূতির জীবন নিয়ে শঙ্কার ভয় ঢুকিয়ে অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে। মানব সেবা ও মানবিকতা ভুলে কসাইয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে সীমান্তিক-বিনোদনী নগর হাসপাতাল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিরাপদে সন্তান প্রসবের শ্লোগানে রোগী ভর্তি করে প্রায় প্রত্যক রোগীকেই সিজার করা হচ্ছে। সিজারে আবার আছে তুঘোলকি কারবার। যদিও সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে নরমাল প্রসব ১২০০ টাকা। সিজার ১৫,০০০ টাকা। অথচ প্রতিটি সিজার রোগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে ২৫,০০০ টাকা। কাগজে ভর্তি ফি ১০০ টাকা লেখা থাকলেও ভর্তি ফি নেয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা। কেউ ভর্তি হয়ে চিকিৎসা মনমতো না হলে ডিসচার্জ চাইলে ২০০০ টাকা দিয়ে বের হতে হচ্ছে। আলট্রাসোগ্রাফি ৩০০ টাকা লেখা থাকলেও হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে ৬০০ টাকা। কারণে অকারণে বার বার আলট্রাসোনোগ্রাফি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সিজার রোগীকে পৃথক রুমে রাখার কথা বলা হলেও ৭-৮ জন সিজার রোগীকে একই রুমে রাখা হয়েছে গাদাগাদি করে। ময়লা আবর্জনাবেষ্টিত অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে রোগীরা যৌন ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে হাসপাতালে থেকেই। অনেক নবজাতক ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
ব্যাপক অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আরো ভয়াবহ চিত্র। মা ও শিশু সেবার প্রত্যয় থাকলেও হাসপাতালে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ গাইনি চিকিৎসক। অভিজ্ঞ বয়সী নার্স দিয়ে সিজার করেই হাতিয়ে নিচ্ছে ২৫,০০০ টাকা। এতে করে রোগীরা বাসায় ফিরে নানা আত্মঘাতি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কেউবা অন্যত্র ভর্তি হয়ে সিজার পরবর্তী রোগের চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এমন একজন রোগী লিপি দাস। বাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জ। কথা হয় তার সাথে। লিপি জানান, ১৫ দিন আগে এখানে এসে সিজার করে সন্তান প্রসব করি। আজকে কেনো এসেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে লিপি জানান, প্রশ্রাব বন্ধ হয়ে গেছে ৩ দিন থেকে-চিকিৎসা নিতে এসেছি। নার্স আয়াদের খারাপ আচরণের কথাও জানান লিপি।
জৈন্তার পল্লী গ্রাম থেকে আসা সাফিয়া বেগম জানান, নরমাল সন্তান প্রসবের নামে আমার নিম্নাঙ্গ কেটে ফেলেছে অনেকটা। লোকলজ্জায় কাউকে বলতে পারছেন না। জ¦ালাপোড়াসহ নানা যন্ত্রণায় ভুগছেন। নরমাল ডেলিভারিতে কতো টাকা দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সাফিয়া জানান ২০০০ টাকা। আর ভর্তি ফি নিয়েছে ৫০০ টাকা। ওষুধপত্র সব নিজের খরচে আনতে হয়েছে।
সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, সিজার রোগীদের আলাদা আলাদা কেবিনের কথা থাকলেও তাদের কোনো ব্যবস্থা নেই। ৪র্থ তলায় ৪-৫ রুমে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে কেবিন দেখানোর নামে।
৩য় তলা ঘুরে দেখা যায়, একেকটি রুমে ৭-৮ জন সিজার রোগীকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। রোগীর সাথে আরও ২ জন করে রাখা হয়েছে রোগীর স্বজন।
কথা হয় রিসিপসনিস্ট স্কিনটাইট ড্রেস পরা তানিয়ার সাথে। ভর্তি ফি ১০০ টাকা লেখা থাকলেও ৫০০ টাকা নিচ্ছেন কেনোÑএমন প্রশ্নের জবাবে তানিয়া জানান, ‘এসব কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেন’। কর্তৃপক্ষ কোথায় থাকেন এমন প্রশ্নের জবাবে জানান, ‘বলতে পারবো না’।
হাসপাতালে কেবিন ব্যবস্থাই যেখানে নেই, সিজার রোগীদের কোথায় রাখেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তানিয়া জানান, ‘৫০০০ টাকা এডভান্স করলেই কেবিনের ব্যবস্থা করা হয়।’
এ প্রসঙ্গে সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন নূরে আলম শামীম জানান, ‘এটা সিটি কর্পোরেশনকে জানান। এটা আমাদের বিষয় না। আমার জেলায় যেগুলো আছে ওইগুলো তদন্ত করি।’