চোখের জলে ঈদ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

চোখের জলে ঈদ

প্রকাশিত: ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০১৬

চোখের জলে ঈদ

13600020_1825422211013149_7597537219497141299_nপ্রতিবছরই আনন্দের বারতা নিয়ে আসে ঈদ। কিন্তু ঈদের এই কাঙ্ক্ষিত আনন্দের ছোঁয়া গত পাঁচবছর ধরে উপভোগ করতে পারছে না বিএনপির গুম হওয়া নেতাকর্মীর পরিবারের সদস্যরা। প্রতিবছরই গুম হওয়া নেতাকর্মীর পরিবারের সদস্যদের ঈদ কাটছে নিদারুণ উদ্বেগ ও অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। এবারো মুসলিম জাহানের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আজহা চলে এলেও গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর পরিবারের সদস্যদের মাঝে নেই কোনো আনন্দ, নেই কোনো উৎসব। আছে শুধুই চোখের জল।

বিএনপির সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল। এরপর থেকেই তার সন্ধানে তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা ঘুরছেন সরকার, নিজ দল বিএনপিসহ বিভিন্ন মহলে। কিন্তু দ্বারে-দ্বারে ঘুরলেও স্বামীকে ফিরে পাবার আশ্বাসও জুটছে না তার।

ইলিয়াস আলীসহ বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের স্ত্রী, ছেলে এবং মেয়েদের এবারের ঈদ উদযাপন কেমন হবে তা জানতে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করি আমরা।

এসব পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য বলেন, যাদের স্বামী বা পিতা থাকে না কেবল তারাই এর যন্ত্রণা বুঝতে পারেন, অন্য কেউ নয়।

এই বিষয়ে তাহসিনা রুশদী লুনা বলেন, ‘বিগত ঈদগুলোর মত এবারও নিয়ম রক্ষার ঈদ উদযাপন করবো। এর বাইরে অন্য কিছু নয়।’ এসময় প্রতিবারের মতো এবারও গ্রামের বাড়িতে (সিলেট) সন্তানদের নিয়ে ঈদ করতে যাবেন বলে জানান লুনা। এম ইলিয়াস আলী সঙ্গে তার গাড়ি চালক আনসার আলী গুম হন।

২০১২ সালের ৩  এপ্রিল রাজধানি’র উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন  সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক  ইফতেখার আহমদ দিনার। দিনারের সঙ্গে ছিলেন ছাত্রদল নেতা জুনেদ আহমদ।

নিখোজ ছাত্রনেতা দিনারের বোন তাহছিন শারমিন তামান্না জানান, অপেক্ষা আছি ভাই ফিরে আসবেন। বাবা মায়ের চোখের জল দেখে আমি আমার চোখের জল ধরে রাখতে পানি না। তারপর চেষ্ঠা করি নিজের আবেগকে ধরে রেখে বাবা মাকে বুঝানোর মধ্যে দিয়ে ঈদ কাটাতে। চলার পথে খুজে বেড়াই ভাইকে না জানি কখন পিচু ডাকে তামান্না বলে।

নিখোঁজ জুনেদ আহমদের ভাই হাসান মঈন উদ্দিন আহমদ জানান অপেক্ষা..বাবা ও মাকে বুঝানোর মধ্যে দিয়ে কাটছে ঈদ। মোবাইলের রিং ও বাসার দরজার ভ্যাল বেজে উঠার মধ্যে দিয়ে কাটছে আমাদের ঈদ। সবাই একে অন্যকে আড়াল করে চুপশে চোখের জল ফেলার মধ্যে দিয়ে কাটছে ঈদ।

বাংলাবাজার ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন খালেদ হাসান সোহেল। ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর বাংলাবাজার থেকে গুম হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি নিখোঁজ। খালেদের সন্ধানে তার পরিবার দিন-রাত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সবার দ্বারে-দ্বারে ঘুরলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলেনি।

ঈদ উদযাপন প্রসঙ্গে খালেদের বাবা মো. ফিরোজ বলেন, ‘ঈদ উদযাপনের কথা কল্পনাতেই আনতে পারি না। কারণ সবসময় শুধু সন্তানের পথ চেয়ে থাকি। আমার বুকের মানিককে ছাড়া কিভবে আমি ঈদ উদযাপন করবো?’

অপরদিকে একইরকম অবস্থার মধ্যে দিনযাপন করছেন গুম হওয়া আরেক নেতা মাহফুজুর রহমান হোসেনের স্ত্রী নিলুফা ইসলাম শিল্পী। মাহফুজুর রহমান হোসেন ২২ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সহ-সভাপতি।

ঈদ আনন্দ প্রসঙ্গে কান্নজড়িত কণ্ঠে মাহফুজুরের স্ত্রী নিলুফা ইসলাম শিল্পী বলেন, ‘যেখানে আমার ছেলে ও মেয়ে সবসময় তাদের বাবাকে খুঁজে চলেছে সেখানে কিভাবে ঈদ উদযাপন করবো? আর তাই আমাদের কোনো ঈদ নেই।’

ঈদ-উল-আজহা উদযপান প্রসঙ্গে প্রায় একই অবস্থার বর্ননা করেন ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড পুরানো পল্টন থানা ছাত্রদলের সভাপতি পারভেজ হোসেনের স্ত্রী ফারজানা আক্তার। পারভেজ ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে নিখোঁজ হন।

এছাড়াও সুত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সভাপিত সেলিম রেজা পিন্টু রাজধানীর মিরপুর পল্লবী থেকে গুম হন ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে পিন্টুর বোন রেহানা বানু মুন্নি বলেন, ‘আমাদের জীবনের প্রতিটি দিন কাটছে অর্থকষ্ট, ক্ষুধার জ্বালা ও ছেলে হারানোর বেদনা নিয়ে। এই অবস্থায় কীভাবে ঈদ করি?’

বিএনপির সূত্রাপর থানার সাংগঠিনক সম্পাদক সম্রাট মোল্লা নিখোঁজ হন ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর। এরপর থেকেই তার আর কোন খোঁজ পায়নি তার স্ত্রী। সম্রাট মোল্লার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা বাংলামেইলকে বলেন, ‘স্বামীকে ছাড়া ঈদ করি কিভাবে। এই কথা কল্পনাতেই আনতে পারি না।’

ছবিটি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক আব্দুস সত্তারের ফেইসবুক থেকে সংগৃহিত