ছাতকে জামায়াত-বিএনপি সিন্ডিকেট: গডফাদার আ’লীগের তাপস, জামায়াতের আলাউদ্দিন – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ছাতকে জামায়াত-বিএনপি সিন্ডিকেট: গডফাদার আ’লীগের তাপস, জামায়াতের আলাউদ্দিন

প্রকাশিত: ৭:১৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২১

ছাতকে জামায়াত-বিএনপি সিন্ডিকেট: গডফাদার আ’লীগের তাপস, জামায়াতের আলাউদ্দিন

নিউজ ডেস্ক

আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে ছাতকের নৌপথ। শক্তিশালী এই সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে জামায়াত-বিএনপি-আওয়ামী লীগের মিশেলে। জামায়াতের একসময়কার সক্রিয় কর্মী আলাউদ্দিন এবং প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা কাউন্সিলর তাপস চৌধুরী এই সিন্ডিকেটের মূল দায়িত্বে। নৌ-পথে এমন কোনো কাজ নেই, যা এই বাহিনী করতে পারে না। সম্প্রতি নৌ-পুলিশের উপর আক্রমনের পর এই চক্র আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
জামায়াতের একসময়কার সক্রিয় কর্মি ছাতকের কালারুকা ইউপির মুক্তিরগাঁও গ্রামের উস্তার আলীর ছেলে আলোচিত ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন। ৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৫ আসনে জামায়াত ইসলামের সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলামের নির্বাচনী প্রচারে কাজ করেন পিতা উস্তার আলীসহ ওই আলাউদ্দিন। ওই বছরেই এই আলাউদ্দিন, পিতা উস্তার আলীসহ স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের উদ্যোগে মুক্তিরগাঁও গ্রামে মুক্তিরগাঁও জামেয়া ইসলামিয়া মাদরাসার উদ্বোধন করেন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে- আলাউদ্দিন এখনও জামায়াত কর্মীদের সাহায্য-সহযোগীতায় নিজেকে যুক্ত রেখেছেন।
২০০৮ সালে আলাউদ্দিনের নতুন মিশন শুরু হয় সিলেটের জাফলং থেকে। যন্ত্রদানব ব্যবহার করে পাথররাজ্য জাফলংয়ে একক আধিপত্য বিস্তার করেন তিনি। ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন সরকারি দলের নাম। পরিবেশ ধ্বংশ করে পাথর বাণিজ্য। প্রকৃতি বিধ্বংশী এই বাণিজ্যের মাধ্যমে আলাউদ্দিনের হাতে আসে কাড়িকাড়ি টাকা। এই টাকার ভাগ যায় স্থানীয় আওয়ামী, বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের পকেটে। পাথর বাণিজ্যের ঘটনা তৎকালীণ সবকটি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে ২০১৯ সালে অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরিবেশ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম। অবশেষে তারই নির্দেশ সিলেটের জাফলংসহ ৯ টি পাথর কোয়ারী থেকে পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অবশেষে জাফলং ত্যাগ করেন আলাউদ্দিন। কোয়ারী ধ্বংশের কারণে মামলাও দায়ের রয়েছে আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে তিনি ফিরেন নিজ এলাকায়। হাত মেলান ছাতক পৌরসভার একাধিকবার নির্বাচিত কাউন্সিলর তাপস চৌধুরীর সাথে। তখন থেকে নিজেকে সরকারদলীয় হিসেবে ভাবতে থাকেন আলাউদ্দিন।
স্থানীয় অপর একটি সুত্র জানায়, তিনি শুধু তাপস চৌধুরীর সাথে নয়, নিজের আখের গোছাতে স্থানীয় সংসদ মুহিবুর রহমান মানিকসহ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সাথে উঠ-বস করতে থাকেন। সেগুলো নিজে আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে আওয়ামী লীগ সাজার চেষ্টা করছেন। সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক কে ও তিনি সংবর্ধনা দিয়েছেন।
আর এ কারণেই তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গেল ৪ জুলাই ছাতকে নৌ-পুলিশের উপর আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের নিয়ামতপুর গ্রামের সামনে চেলা নদীতে হামলার ঘটনায় ১১টি মোবাইল, ৪ টি হাতকড়া, নৌ পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল লুটপাটের পর মারধর ও নৌপুলিশের ওসি-এসআইসহ ৬ পুলিশ সদস্যকে চেলা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। আহতরা হলেন- নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মজুর আলম, এসআই হাবিবুর রহমান, এএসআই সবুজ হোসেন, কনস্টেবল সাব্বির আহমদ, শাহ জামাল ও সৌরভ কুমার দেব।
এ ঘটনার খবর পেয়ে নৌ পুলিশের এসপি চম্পা ইয়ামিন আহতদের দেখতে ছাতক হাসপাতালে আসেন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধী যে হোক তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। খবর পেয়ে সুনামগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বিপিএম আহতদের দেখতে আসেন। এ সময় হামলাকারীদের গ্রেফতার এবং লুটকৃত মালমাল উদ্ধারের নির্দেশ দেন তিনি।
এই ঘটনার পর নাম উঠে আসে কাউন্সিলর তাপস ও আলাউদ্দিনের নাম। এই ঘটনায় নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়। তাপস চৌধুরী ও আলাউদ্দিনসহ মোট ২৬ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৪০ জনকে এই মামলায় আসামী করা হয়। ছাতক থানার মামলা নং ৩৩/১৯৬। মামলার বাদি নৌ-পুলিশের এসআই মো. হাবিবুর রহমান। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি শেখ নাজিম উদ্দিন।
এর আগে পাথর ও বালুখেকো চক্রের পরিবেশ বিধ্বংশী এই কার্যক্রম বন্ধ এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে একতা বালু উত্তোলন ও সরবরাহকারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতৃবৃন্দ। ১৪ জুলাই এই দাবিতে সংগঠনের উদ্যোগে সিলেট প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখান থেকে ছাতক উপজেলার চেলা ও মরা চেলা নদী থেকে শ্যালো এবং বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় ছাতকের চেলা ও মরা চেলা নদীতে বালু উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কিন্তু অবৈধভাবে ড্রেজার, বোমা ও শ্যালো মেশিন দিয়ে যান্ত্রিকভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে বেকারের সংখ্যা অন্যদিকে ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ।
সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে চেলা ও মরা চেলা নদী বালুমহাল ৫৬৬ একর জায়গা নিয়ে অবস্থিত। এক সময় নদীতে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বালতি/বেলচা দিয়ে বালু উত্তোলন করতেন এসব শ্রমিকরা। ফলে উজান থেকে নেমে আসা বালু ও পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি নদীর নাব্যতা বজায় থাকতো। নদীর ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হতো শ্রমজীবী মানুষের জীবন জীবিকা। একই সঙ্গে হুমকিতে রয়েছে চেলা নদীর দুই পাড়ের ৩ শতাধিক বাড়িঘর ও স্থাপনা এবং কয়েকশ’ একর ফসলি জমি।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ১৪২৮ বাংলা সনের জন্য চেলা ও মরা নদীর বালু মহাল দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দেন। দরপত্র বিজ্ঞপ্তি শর্তমতে, কোনো ড্রেজার মেশিন বা অন্য কোনো যন্ত্র ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের কথা নয়। পাথরও উত্তোলন করার কথা নয়। বর্তমানে বেআইনীভাবে ড্রেজারের পাশাপাশি শ্যালো ও বোমা মেশিন দিয়ে বালুমহালের ৫০-৬০ ফুট নীচ থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। অবৈধ বোমা ও শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করায় ৫০-৬০ ফুট পানির গভীর হওয়ায় আমাদের বারকি, বেলচা, বালু ও বালতি শ্রমিকরা বালু উত্তোলন করতে পারছেন না। আমাদের শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে চরম মানবেতর জীবন-জীবিকা যাপন করছেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় অবৈধ ও নিয়মবহির্ভূত বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীরবর্তী এলাকার দৌলতপুর গ্রামে একটি মসজিদ ভেঙ্গে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নাছিমপুর, শারপিননগর, রহিমের পাড়া, সোনাপুর, কাজিরগাও, পুর্ব লুভিয়া, চাইরগাও, রহমতপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের রাস্তা ঘরবাড়ি, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্টান, প্রায় ৩ শতাধিক বাড়িঘর নদী ভাঙ্গন ও হুমকির মুখে পড়েছে। ফকির টিলা থেকে সোনালী চেলা রাস্তা ও চারালবাড়ি এবং ক্যাম্পের বাজারে সরকারি রাস্তা ভেঙ্গে যাবার কারণে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের সড়ক যোগাযোগ অচল ও বিচ্চিন্ন হয়ে পড়েছে। ইজারাদারে লোকজন চেলা ও মরা চেলা নদীর ইজারাকৃত জায়গা ছাড়াও সৈয়দাবাদ, নিয়ামতপুর, এমদাদনগর, মাষ্টারবাড়িরসহ বন বিভাগের মুর্তা বাগান, ফসলি জমি থেকে শ্যালো ও বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে পরিবেশের মারাত্নক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। ইজারা চুক্তির ১২ নম্বার শর্ত লঙন করে রাতভর অবৈধ বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করলেও স্থানীয় প্রশাসন নিরব ভুমিকা পালন করছে।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আলাউদ্দিনের ব্যক্তিগত সেলফোনে বারবার কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় মন্তব্য আদায় করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে তাপস চৌধুরীর বিষয়ে দলীয় কর্মীদের একটি অংশ জানায়, মাঠ কাঁপানো ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি থাকলেও তাপস চৌধুরী এখন ভিন্ন রাস্তায় পা রেখেছেন। তিনি দলীয় কর্মীর বিপরীতে অপরাধী চক্রের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেছেন। এই চক্রের সাথে জামায়াত-বিএনপি সকওেলই জড়িত রয়েছেন-এমনটিও জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মীরা। ফলে পৌর মেয়র কালাম চৌধুরীর এক সময় বিশ^স্থজন থাকলেও বর্তমানে কালাম চৌধুরী তাপস চৌধুরীকে এড়িয়ে চলেন। জানা গেছে মেয়র কালাম চৌধুরীর আশির্বাদেই তাপস চৌধুরী বারবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। কালাম চৌধুরীর কল্যাণেই তিনি ছাতক পৌরসভার প্যানেল মেয়র। সুবিধাখোর তাপস চৌধুরী এখন সুযোগ বুঝে যোগ দিয়েছেন মানিক গ্রুপে। তবে গড়ে তোলেছেন জামায়াত-বিএনপি-আওয়ামী লীগ মিলিয়ে তিনি গড়ে তোলেছেন আলাদা একটি সিন্ডিকেট।
অভিযোগের বিষয়ে কাউন্সিলর তাপস চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্থ আছেন জানিয়ে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে পুলিশ এ্যসল্ট মামলার অভিযুক্ত আলাউদ্দিন এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের ছবি নিজ টাইম লাইনে প্রচারের বিষয়ে কথা হয় এমপি মানিকের সাথে। তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে যেকোনো ভোটারের সাথে আমার ছবি থাকতে পারে। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে দলীয় কর্মী হলে, অবশ্যই আমি থাকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনে থাকবো। আলাউদ্দিনের বিষয়ে তিনি বলেন, এই নামে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মী নেই এবং আলাউদ্দিন কোনোদিনই আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল