ছাত্রলীগের অপকর্মঃ চোখ নিয়ে শঙ্কা ঢাবি ছাত্র এহসানের – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ছাত্রলীগের অপকর্মঃ চোখ নিয়ে শঙ্কা ঢাবি ছাত্র এহসানের

প্রকাশিত: ৭:৩২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮

ছাত্রলীগের অপকর্মঃ চোখ নিয়ে শঙ্কা ঢাবি ছাত্র এহসানের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাম মুসলিম (এস এম) হলে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত নেতাদের পিটুনির ঘটনায় আহত এহসান রফিকের চোখের আঘাতের কোনো উন্নতি হচ্ছে না।

এহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের দুয়োগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। গত মঙ্গলবার দিবাগত গভীর রাতে আঘাত পাওয়ার পর থেকে বাম চোখ খুলতে পারছেন না এহসান। প্রচণ্ড আঘাতের ফলে স্বাভাবিক নড়াচড়ার ক্ষমতা হারানো চোখের লেন্সগুলো এখনও ফিরছে না আগের অবস্থায়।

পিটুনির পর রাতে এবং পরের দিন সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুইবার চিকিৎসা হয়েছে এহসানের। পরে আরও কয়েকটি চক্ষু বিশেষজ্ঞকে দেখিয়েছেন তিনি। কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো লাভ হচ্ছে না। এর মধ্যে আবার আজ শুক্রবার সকাল থেকে নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে এহসান রফিকের, থেমে থেমে হচ্ছে বমি।

এহসানের বাবা বৈশাখী টেলিভিশনের ঝিনাইদহ প্রতিবেদক রফিকুল ইসলাম  এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এহসানের কাছ থেকে একটি ক্যালকুলেটর ধার নিয়েছিলেন বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুক। মঙ্গলবার গভীর রাতে ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়া নিয়ে দুইজনের মধ্যে বাদানুবাদের এক পর্যায়ে মারামারিতে রূপ নেয়।

পরে ওমর ফারুক তার সাঙ্গপাঙ্গরা এহসানকে আটকে নিয়ে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেলের কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে শিবির কর্মী কি না তা যাচাইয়ের চেষ্টা চলে।

সেখানে শিবির কর্মী হিসেবে স্বীকারোক্তি আদায়ে এক দফা পেটানো হয়। কিন্তু স্বীকার না করার পর মোবাইল ফোন, ফেসবুক আইডি পরীক্ষা করে শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পরে এহসানকে হল থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দেন তাহসান রাসেল। হলের গেটে আসার পর রুহুল আমিন, ওমর ফারুক ও মেহেদী হাসান হিমেল তাকে বড় দিয়ে বেদম পেটান বলে অভিযোগ করেছেন এহসান। এ সময় তিনি চোখে মারাত্মক আঘাত পান। আর অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর একজন নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেলে।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতের কথা বলে চিকিৎসা করার পর আবার এহসানকে এসএম হল ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান রাসেলের কক্ষে নেয়া হয়। এরপর সকালে চোখের অবস্থা আবার খারাপ হলে আরেক দফা ঢাকা মেডিকেল নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। পরে আবার হলে ফিরিয়ে নিয়ে ছাত্রলীগ নেতার কক্ষে রাখা হয়। গভীর রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত কোনো খাবার দেয়া হয়নি তাকে। এরপর এহসান কৌশলে পালিয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিতে গিয়ে অভিযোগ করেন।

এহসানকে মারধরের ঘটনায় বুধবার এসএম হল ছাত্রলীগের তিন নেতাকে বহিষ্কার করেছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। এদের মধ্যে রুহুল আমিন ও ওমর ফারুক হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। আর মেহেদী হাসান হিমেল করছিলেন উপ-প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদকের।

এরই মধ্যে এহসানকে নিয়ে ব্লেইম গেইম মেতে ওঠেছে হল ছাত্রলীগের মধ্যে দুটি পক্ষ। একপক্ষ তাকে শিবিরকর্মীর অপবাদ দেয়ার চেষ্টা করছে, আরেক পক্ষ ঘায়েল করার চেষ্টা করছে প্রতিপক্ষকে।

এস এম হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্পাদক পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা বলছেন, এহসান শিবির করেন, এর প্রমাণ তাদের কাছে আছে। যদিও এর আগে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ নিজেও সাংবাদিকদের মুঠোফোনে বলেছিলেন, ‘ছেলেটি ভাল ছেলে, সে শিবির করে না’।

এহসানের বাবা রফিকুল ইসলাম  বলেন, ‘ছেলেটার চোখ নিয়ে অনেক বিপদে আছি। একটার পর একটা ডাক্তার পরিবর্তন করছি, তারপরও কেন জানি কোনো উন্নতি হচ্ছে না। জানি না, আদৌ আমি ছেলেটার চিকিৎসা দেশে করাতে পারব না কি বাইরে নিতে হবে।

এহসানের বাবা বলেন, ‘আজ  (শুক্রবার) সকালেই এহসানকে নিয়ে ভিশন আই চক্ষু হাসপাতালের মনিরুল ইসলামের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু সন্তুষ্ট হওয়ার মতো কিছুই বলেননি ডাক্তার।’

ধার নেয়া ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের এক শিক্ষার্থীকে শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা দফায় দফায় মারধর করে রক্তাক্ত করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত থেকে আজ বুধবার দুপুর পর্যন্ত ওই শিক্ষার্থীকে তিন দফায় মারধর তারা। এতে ভুক্তভোগীর চোখের কর্ণিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আঘাতের ফলে ওই শিক্ষার্থীর মুখে বেশ কয়েকটি ক্ষত চিহ্নসহ শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

ভুক্তভোগী ঢাবির দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এহসান রফিক। মারধরকারীরা হলেন- হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেলের অনুসারী।

হল ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, মারধরের পরে অন্য হলের বন্ধুদের সহযোগিতায় আজ দুপুর আড়াইটায় পালিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে এহসান। এর আগে তাকে হলের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। বারবার ক্ষুদা-তৃষ্ণায় চিৎকার করলেও তাকে কোনো ধরনের পানি বা খাবার দেয়নি তারা।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, মার্কেটিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ওমর ফারুক প্রায় তিন মাস আগে তার কাছ থেকে একটি ক্যালকুলেটর ধার নেয়। প্রায়ই তা ফেরত চাইলেও ফেরত দেয়নি। সর্বশেষ গতকাল রাতে ক্যালকুলেটর দাবি করলে ওমর ফারুক তাকে মারধর করে।

পরে হল ছাত্রলীগের সহসভাপতি আরিফের (আইইআর) মাধ্যমে এহসানকে টিভি রুমে ডেকে নেয়। এসময় টিভিরুমে উপস্থিত ছিলেন হল সহসভাপতি তানিম, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আনিম ইরতিজা শোভন ও আবু তাহের। তারা এহসানকে শিবির অপবাদ দিয়ে মোবাইল কেড়ে নিয়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট চেক করে। কিন্তু এর মাধ্যমে কোনো প্রমাণ বের করতে পারেনি। পরে জোরপূর্বক শিবির স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাকে বেদম মারধর করে। হল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে হল গেটে বের করে দেয় তাকে।

সেখানে আরেক দফায় হল শাখার সহ সম্পাদক ওমর ফারুক ও রুহুল আমিন, সদস্য সামিউল ইসলাম সামী, আহসান উল্লাহ, উপসম্পাদক মেহেদী হাসান হিমেলের নেতৃত্বে রড, লঠি সোটা দিয়ে বেদম প্রহার করা হয়। মরধরের এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এহসান। অবস্থা বেগতিক দেখে আরিফ রাত সাড়ে তিনটায় এহসানকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নিয়ে এসে হল শাখা সভাপতি তাহসান আহমেদের (১৬ নম্বর) কক্ষে মারধরের তথ্য প্রকাশ না করতে হুমকি দিয়ে আটকে রাখা হয়। সকালে এহসানের অবস্থা খারাপ হলে তাকে আবার ঢাকা মেডিক্যালে নেয়া হয়। সেখান থেকে হলে এনে একই কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে দুপুর আড়াইটার দিকে হল থেকে পালিয়ে আসে এহসান। সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন এহসান।

এ বিষয়ে এহসানের পিতা চিকিৎসকের বরাত দিয়ে বলেন, এহসানের চোখের কর্ণিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ সময় অপরাধীদের বিচার দাবি করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বাবাকে তার সন্তানকে এভাবে নির্যাতিত না দেখতে হয় সেজন্য আমি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

এ বিষয়ে হল শাখা সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেল বলেন, আমি অভিযুক্তদের হল থেকে বের করে দিয়েছি। আমি সোহাগ ভাইকে (কেন্দ্রীয় সভাপতি) বিষয়টি অবহিত করেছি। তাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধরণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্সকে একাধিকবার ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি।

পরে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম জোয়ারর্দার জানান, অভিযোগ পেয়েছি, ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, এর আগেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মোবাইল-ল্যাপটপ ও টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিতে বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীদের শিবির অ্যাখ্যা দিয়ে মারধর করে ছাত্রলীগ। সম্প্রতি বিজয় একাত্তর হলের দুটি ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মারধর করে মোবাইল-ল্যাপটপ হাতিয়ে নিয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। অভিযোগ আছে হল সভাপতি ফকির রাসেলের অনুসারী একটি চক্র এ ব্যাপারে খুবই সক্রিয়।