জাতির জনক সিলেটে এসেছেন! – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

জাতির জনক সিলেটে এসেছেন!

প্রকাশিত: ১২:৫৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০১৬

জাতির জনক সিলেটে এসেছেন!

syl00বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমি প্রথম দেখি স্কুলে পড়ার সময়। সিলেট রেজিস্ট্রি মাঠে তিনি বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তখনো মানুষ তাঁকে জানত শেখ সাহেব হিসেবে। স্কুলেই জেনেছিলাম, শেখ সাহেব সিলেটে এসেছেন। স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে মঞ্চের একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমরা তিন-চার বন্ধু তাঁর কথা শুনছিলাম। একসময় তিনি বললেন, ‘সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না, আমরা সেটা জানি। আইয়ুব সাহেব, আমরা বাঙালিরা আরও জানি আঙুল কীভাবে ত্যাড়া করতে হয়।’
এই কথায় আমাদের খুব হাসি পেয়েছিল। আমরা হাসছিলাম আর শুনছিলাম কী তেজোদ্দীপ্ত ভাষায় তিনি কথা বলছেন। উঁচু-লম্বা মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু, মাথাভর্তি চুল ছিল, ভারী ফ্রেমের চশমা পরতেন। গলাটা গমগম করত কথা বলার সময়। এই মাঠে স্কুল থেকে ফেরার পথে অনেক নেতার বক্তব্য শুনেছি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মতো আর কেউ এতটা টেনে রাখতে পারেননি। সরল বাক্যেই তিনি কথা বলতেন, সাদাসিধেই ছিল সেই কথার ধরন, কিন্তু সেই কথা মনের ভেতরে গিয়ে অনুরণন তুলত। দ্বিতীয়বার তাঁর বক্তব্য শুনি এই রেজিস্ট্রি মাঠেই, যখন তিনি ছয় দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তত দিনে আমি কলেজে পড়ি, ছাত্ররাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছে, আমার বন্ধুরা ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ শিরোনামের পোস্টারটি দু-এক দেয়ালেও লাগিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শুনতে শুনতে আমাদের মনে হয়েছিল, পাকিস্তানিরা আমাদের সঙ্গে যে আচরণ করে, তার যোগ্য জবাব দিতে হবে। আরও বিশ্বাস হতো, আমাদের ভাগ্য আমাদেরই গড়তে হবে।
স্কুলে পড়ার সময় অনেকেরই সুযোগ ঘটে বড় কোনো ঘটনার সাক্ষী হওয়ার, নামী কোনো মানুষের দেখা পাওয়ার। এসব স্মৃতি সহজে মুছে যায় না। আমি স্কুলে পড়ার সময় পি সি সরকারের এক শাগরেদের ম্যাজিক দেখেছিলাম। ওই জাদুকর হাত আকাশে তুলে উড়তে থাকা এক কবুতরের থেকে একটা ডিম আদায় করে নিয়েছিলেন। সে কথা আজও মনে আছে। কবি জসীমউদ্দীন এসেছিলেন আমাদের স্কুলে এবং শৈলেশ রঞ্জন স্যারের অনুরোধেই ‘কবর’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন। তাঁর উচ্চারিত প্রতিটি পঙ্ক্তি এখনো কানে বাজে। আমার শোনা বঙ্গবন্ধুর প্রথম ভাষণটির অনেক লাইন তাই এখনো ভুলিনি। ছয় দফার পক্ষের বক্তৃতাতেও তিনি গ্রামের প্রচলিত একটা কথা ব্যবহার করেছিলেন। ‘বাঙালিদের সঙ্গে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতো আচরণ করবেন না আইয়ুব সাহেব, ভুট্টো সাহেব।’ এবারও মানুষ হেসেছিল। কিন্তু হাসি থামিয়ে একটি উত্তেজিত হাত ওপরে তুলেছিলেন, যখন বঙ্গবন্ধু প্রশ্ন করেছিলেন, এদের মোকাবিলার জন্য তৈরি আছেন?
আমি শুনেছি, বঙ্গবন্ধু বক্তব্য দেওয়ার সময় পাকিস্তানি গোয়েন্দারা উপস্থিত থাকত, ক্যামেরা আর কাগজ-কলম নিয়ে। তাঁর বক্তব্য তারা লিখে নিত। যেগুলো এত দিন পড়ে ছিল নানা গোয়েন্দা সংস্থার অফিসে ফাইলবন্দী হয়ে, সেগুলো এখন উদ্ধার করা হচ্ছে এবং ছাপার ব্যবস্থা হচ্ছে। যদি তা-ই হয়, অন্তত ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ হলেও, বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা সুন্দর আকর ও আখ্যানসূত্র তৈরি হবে। আর আমার শোনা দুই বক্তৃতার লিখিত রূপ পেলে আমার আনন্দটা হবে ব্যক্তিগতও।
১৯৬৮ সালের সেপ্টেম্বরে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু করেছিলাম। তত দিনে পাকিস্তানিদের মোকাবিলা করা আর আঙুল ত্যাড়া করার বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা হয়ে গিয়েছিল। এবং তা বঙ্গবন্ধুর কারণেই। আইয়ুব খান তাঁকে খুব ব্যস্ত রাখত, সুযোগ পেলেই জেলে ঢোকাত। ১৯৪৭ থেকে ’৭০ সাল পর্যন্ত ২৩ বছরের ১২ বছরই কেটেছে তাঁর জেলে। বিষয়টা আমাকে অবাক করে। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের এতগুলো বছর তিনি অকাতরে কারাগারের ভেতরে কাটিয়ে দিলেন একটা আদর্শকে, একটা স্বপ্নকে ধারণ করে, মানুষের কাছে সেগুলো পৌঁছে দিতে! তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে জানা যাবে, তাঁর কোনো খেদ ছিল না, আত্মপীড়ন ছিল না, কোনো দ্বিধা ছিল না এই কারাবাস নিয়ে। যেন সংগ্রামের পথে নামলে কারাবাস খুবই প্রত্যাশিত একটি ঘটনা, যেন প্রতিটি কারাবাস সামনের পথচলাকে অনেক বেশি প্রত্যয়দীপ্ত করে দেয়।
তারপরও ১২টি বছর, এক জীবনের কারাবাসের মতোই তো! অথচ কারাবাসের কঠিন দিনগুলোতেও তিনি বিচলিত হতেন না। সহবন্দীদের সঙ্গে গল্প করতেন, তাঁদের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন, নিজের ও দলের কাজকর্মের হিসাব নিতেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন, পড়াশোনা আর লেখালেখি করতেন। পড়তেন প্রচুর আর চিন্তার খোরাক পেতেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর একটি গুণ, এসব কারাবাসের বর্ণনায় কঠিন কঠিন বিষয়ের সঙ্গে হাসি আর কৌতুকের উপস্থিতি। বুঝতে পারি জীবনকে তিনি খুব প্রসন্ন দৃষ্টিতে দেখতেন, দুর্বিপাক-বিপর্যয়েও সেই প্রসন্নতা হারাতে দিতেন না। সে জন্য পাকিস্তানি শাসক আর তাদের নাজির-কোতোয়াল-কাজিদের তিনি মোটেও ভয় পেতেন না। মাথাটা উঁচু করে রাখতেন, শিরদাঁড়াটা সোজা করে দাঁড়াতেন। চরম বিপদেও।
আমাদেরও মাথা উঁচু করে রাখাটা তিনি শিখিয়েছিলেন। একটা সময় পর্যন্ত আমরা তো ভালোভাবেই করতে পেরেছিলাম। কিন্তু সেই কাজটি আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ল যখন ভয়ের কাছে, প্রলোভনের কাছে, নানা মোহের কাছে আমরা আত্মসমর্পণ করতে থাকলাম। সেই ভয় আমি বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষদের মধ্যেও দেখেছিলাম পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর, সেই লোভ আর মোহ আমি তাঁর প্রচুর অনুসারীকে গ্রাস করতে দেখেছি চার দশক ধরে। সে জন্য বঙ্গবন্ধুকে যখন ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হলো, তাঁকে প্রায় নির্বাসনেই পাঠিয়ে দেওয়া হলো, তখন প্রতিবাদে জ্বলে উঠতে দেখিনি এমন অনেককেই, যাদের মাথায় বঙ্গবন্ধু স্নেহের হাত বুলিয়েছেন।

২.
এক বৃষ্টির দিনে একটি স্কুলের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় গিয়েছিলাম। বৃষ্টির জন্য একটি দল আসেনি; সে জন্য ছাত্রছাত্রীরা সিদ্ধান্ত নিল, দুজন বক্তা তিন মিনিট করে তার পছন্দের একটি বিষয়ে বলবে। সপ্তম শ্রেণির একটি মেয়ে বলল, সে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বলবে। সময়টা অনুকূল ছিল না। একটা হইচই হলো, এক শিক্ষক এগিয়ে এলেন, কিন্তু মেয়েটি বিনয়ের সঙ্গে বলল, সে কোনো রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বলছে না, বলছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, যিনি আমাদের স্বাধীন একটি দেশ দিয়েছেন। শিক্ষকের দিকে তাকিয়েই সে বলল, বঙ্গবন্ধু আমাদের শিক্ষিত হতে বলেছেন, সত্যের পথে থাকতে বলেছেন, দেশকে ভালোবাসতে বলেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে বলেছেন। তিনি বিনয়ী ছিলেন, মানুষকে ভালোবাসতেন—এসব কথাই সে বলবে।
এগিয়ে আসা শিক্ষক পিছিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরও নিশ্চয় মনে হয়েছিল, এসব বলা থেকে মেয়েটিকে বিরত রাখা যায় না। মেয়েটিও এসবের সঙ্গে আরও কিছু কথা বলে মঞ্চ থেকে নেমে এসেছিল। সে রাজনীতির কোনো কথাই বলেনি, অথচ এই তো ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের মুখে এই অন্যায়কে না মেনে নেওয়া, দেশটাকে ভালোবাসা।
মেয়েটি যথেষ্ট সাহস দেখিয়েছিল, যে সাহস বাংলাদেশের প্রতিকূল সময়গুলোয় অনেক রাজনৈতিক নেতার মধ্যেও দেখিনি।

৩.
১৯৬৮ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের প্রতিদিনের ইতিহাসের কেন্দ্রে। আমরা তাঁর কথা শুনতাম, তাঁকে অনুসরণ করতাম, তাঁর কাজকর্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতাম। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যখন তাঁকে কারাগারে নেওয়া হলো, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে আমরা বোধ হয় হারালাম। এক পাকিস্তানি পত্রিকায় তো লেখাই হয়েছিল, এবার মুজিবের ‘এন্ড-গেম’। খেলা শেষ। আমরাও শঙ্কিত ছিলাম। কিন্তু তাঁকে একটুখানি বিচলিত মনে হয়নি। একসময় প্রায় করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে পাকিস্তানিরা তাঁকে ছাড়ল। আইয়ুবের পতন হলো। আরও কত ঘটনা ঘটল। পাকিস্তানিরা ভয় দেখাল, প্রলোভন দেখাল, নানা ফাঁদ পাতল। আর বঙ্গবন্ধু চললেন তাঁর মতো করেই, মাথাটা উঁচু করে মুখে বিজয়ীর হাসি ধরে রেখে।
সেই বঙ্গবন্ধুকে কি আমরা মনে রেখেছি? এত বড় যোদ্ধা একজন মানুষ, কিন্তু কী বিনয় ছিল কথাবার্তায়, চালচলনে! আইয়ুব-ভুট্টো-ইয়াহিয়ার নামের শেষে ‘সাহেব’ জুড়ে দিতেন। বলতেন, ইয়াহিয়া সাহেব, এত অহংকারী হবেন না। এই সাহেব ডাকে কিছুটা কৌতুক ছিল, ঠাট্টা ছিল, কিন্তু সৌজন্যও ছিল। তাঁর ভাষা ছিল শাণিত, ইস্পাতের ফলার মতো। কিন্তু মার্জিত। প্রতিপক্ষ যে-ই হোক, একটা সৌজন্যবোধ তিনি তাকে দেখাতেন।
সেই বঙ্গবন্ধুকে কি আমরা মনে রেখেছি? যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে প্রথম যে বাজেট দেন বঙ্গবন্ধু, তার ২১ শতাংশ তিনি রেখেছিলেন শিক্ষার জন্য। মাত্র ৮ শতাংশ দিয়েছিলেন প্রতিরক্ষায়। (পরিসংখ্যানটি আমাকে দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মইনুল ইসলাম)। বঙ্গবন্ধু প্রকৃত শিক্ষাবান্ধব ছিলেন, স্বাধীনচেতা ছিলেন, কারও কাঁধে হাত রেখে চলতে তিনি জানতেন না। শিক্ষকদের সম্মান করতেন, সাধারণ কর্মীদের খোঁজখবর রাখতেন, তাদের নামে চিনতেন। তাঁর শিক্ষাচিন্তাটি এখন দূরের স্মৃতি, তাঁর গতিশীল নেতৃত্বও এখন দূরের স্মৃতি। এখন যে বাংলাদেশে আমরা আছি, সেখানে দুর্নীতি একটা সাধারণ নীতিতে পরিণত হয়েছে। এখন ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াটাও স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেশপ্রেম শব্দটি শোনা যায় শুধু বক্তৃতার মাঠে।
এখন রাজনীতি অসহিষ্ণু, পরমত অসহ্য, সমালোচনা শাস্তিযোগ্য। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, কীভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তিনি লড়েছেন। অথচ তাঁর দেশেই আমরা ভিন্নমতকে সম্মান জানাতে ভুলে গেছি।

৪.
বঙ্গবন্ধুর ৯৬তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। একটা মহিরুহের মতো ছিলেন মানুষটি, ছায়া মেলে ছিলেন দুর্বলের আর দরিদ্রের মাথার ওপর। সেই ছায়া সরে যাওয়ায় এই ৪০ বছর তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। তাদের দুর্ভোগ আরও গভীর হয়েছে বৈষম্য বাড়ায়। সম্পদশালীদের অত্যাচার বাড়ায়। আজকের দিনে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানোর একটা পথ হতে পারে দুর্বল আর দরিদ্রদের এই বন্ধুটিকে মনে রেখে তাদের পাশে দাঁড়ানো।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল