জেলখানা থেকে মা’র চিঠিঃ পর্ব ১ ও ২ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

জেলখানা থেকে মা’র চিঠিঃ পর্ব ১ ও ২

প্রকাশিত: ৭:০০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৮

জেলখানা থেকে মা’র চিঠিঃ পর্ব ১ ও ২

জেলখানা থেকে মা’র চিঠি

১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮
রোজ শনিবার
সময়ঃ রাত ১১টা ৪০ মিনিট
স্থান : বকশীবাজার, পরিত্যাক্ত কেন্দ্রীয় কারাগর
ঢাকা, বাংলাদেশ।

আমার প্রিয় সন্তানেরা
অনেক আদর ও ভালোবাসা রইল। আশাকরি মহান রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতের ছায়া তলে সকলে আছো। আমিও আছি তোমাদের দোয়ায়।
অনেক অনুরোধ করে দু দিন পর আজ কাগজ কলম পেয়েছি। তাই তোমাদেরকে লিখতে পারছি।
চারিদিকে শুন শান। একটি মাঝারি আকারের রুমে আমাকে রাখা হয়েছে। দিন বা রাতের তেমন কোন পার্থক্য বোঝা যায় না। রুমের ৩টি জানালা আছে যা বাইরে থেকে বিশেষ ভাবে আটকানো। খোলা যায় না, কিছুই দেখা যায় না।রাত বা দিনের পার্থক্য বুঝতে হয় খুব কষ্ট করে।
স্যতসেতে মেঝে, গুমট দুর্গন্ধ। কত দিন কত কাল এ ঘরে মনে হয় কেউ ঢোকেনি। কাঠের একটি চৌকি তার ওপর একটি চাদর, তিনটি কম্বল। একটি চেয়ার, একটি টেবিল আছে। মাথার ওপর তীব্র আলোর একটি লাইট, যা জ্বলে থাকে ২৪ ঘণ্টা। অনুরোধ করেও রাতের বেলায় কিংবা ঘোমানোর সময় এটি বন্ধ করাতে পারিনি। তাই গত ২ দিন এক প্রকার না ঘুমিয়ে আছি। তন্দ্রায় যখনই চোখ বুজে এসেছে দেখেছি তোমাদের মুখ। চোখ বুজলেই আমি দেখতে পাই তোমাদের। দেখতে পাই উত্তাল সমুদ্রের মত তোমারা ছুটে আসছো তোমাদের মায়ের কাছে। শুনতে পাই মায়ের জন্য তোমাদের আকুলতা ব্যকুলতা আর পাথর চাপা কান্না। বুকের মধ্যে হু হু করে ওঠে তোমাদের জন্য।
আমার আদরের সন্তানেরা
এই নির্জনতায় আজ দু দিন ধরে চিন্তা করেছি আমার অতীত আর তোমাদের ভবিষ্যতের কথা। সময়ের হিসেব না রেখেই নামাজ পড়ছি, মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে কাঁদছি, তোমাদের জন্য, দুখী বাংলাদেশের জন্য। যদিও ওজু করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। পানি বেশ ঠাণ্ডা। গরম পানির কোন ব্যাবস্থা নেই। চাইলেও পাওয়া যায় না। বাথরুমের বেসিনটা সম্ভাবত খুলে নিয়ে গেছে, অথবা আগে থেকেই হয়ত ছিলো না। ৩টি পত্রিকা পেয়েছি কিন্তু পত্রিকার ভেতরের পৃষ্ঠা গুলি রেখে দিয়েছে। একটি টিভি আছে যা দিয়ে শুধুমাত্র বিটিভি দেখা যায়। টিভি ছাড়লেও বিশ্রী শব্দ হতে থাকে। বাইরে কিছু প্রহরী আছে, ডাকলে সহজে কেও আসে না। দু বার ইউনিফর্ম পরা কিন্তু মুখ ঢাকা দুই তরুনী এসেছিলো। কথা বললে ওরা কোন উত্তর দেয় না। হয়তো ওদের ওপর এমনই নির্দেশ আছে। মনে হয়েছে ওদের লজ্জিত ছল ছল চোখ কিছু বলতে চায় কিন্তু পারে না। আসলে আমার ওপর চরম মানসিক নির্যাতন করার জন্যই বিনা ভোটের সরকার এ সব করছে। মানছে না কোন জেল কোড, কোন আইন, কোন কানুন।
কেননা আমি ৩ বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আমি একটি বৃহৎ দলের নেত্রী, আমি সাবেক সেনা প্রধানের স্ত্রী,আমি সাবেক প্রেসিডেন্টের স্ত্রী। সর্বোপরি আমি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বাধীনতার ঘোষকের স্ত্রী, আমি একজন বীর মুক্তি যোদ্ধার স্ত্রী এ সবের কোন কিছু ওরা বিবেচনায় না আনলেও অন্তত আমার বয়সের বিষয় ওদের চিন্তায় আসার কথা। আমাকে এখনো কোন ডিভিশন দেয় নি। আমি একজন ৭৩ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা। যার পায়ে সমস্যা,চোখে সমস্যা।আমার মত একজন বর্ষিয়ান মায়ের ওপর, ওরা যে মানসিক চাপ তৈরী করছে তা সহ্য করা খুব কষ্ট কর। শারীরিক কোন কাজ করার শক্তি আমার না থাকলেও মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা আমার মানসিক শক্তি যেন তিনি আগের চাইতে আরো মজবুত করে দেন।
মনে পড়ে, আমার বয়স যখন মাত্র ১৫ বছর তখন আমার বিয়ে হয়েছিলো। ২১ বছর বয়সে মা হয়েছি। এর পরে ২ সন্তানের জননী। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে হয়েছি বিধবা। কাজ পাগল স্বামী আমার দেশ গড়ার কাজে, দেশের মানুষের সেবায় আমৃত্যু সময় দিয়ে গেছেন। যে উন্নত সুখী সুন্দর বাংলাদেশের স্বপন তিনি দেখেছিলেন,গড়তে চেয়েছিলেন তা এগিয়ে নেবার জন্য তাঁর সহকর্মীদের সাথে আমিও তাঁর অসমাপ্ত কাজে যোগ দেই। কিন্তু যতই দিন গড়িয়েছে দেখেছি কাছের মানুষদের বিশ্বাস ঘাতকতা, শঠতা আর দলের প্রতি দেশের প্রতি মোনাফেকদের মোনাফিকতা। দেখেছি কত অল্প প্রাপ্তিতেই তারা নিজদেরকে বিকিয়ে দিয়েছে স্বৈর শাসকের হাতে।কত দ্রুত তারা রং বদলিয়েছে। আবার কত দ্রুত তারা মানুষের হৃদয় থেকে হারিয়ে গিয়েছে।
একা হয়ে পড়েছি কিন্তু অন্যয়ের সাথে আপোষ করিনি। যত জন দল ছেড়ে চলে গেছে তার চেয়ে লক্ষ গুন মানুষ দলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। যত বেশী দল ভাঙ্গতে চেয়েছে তত বেশী দল মজবুত হয়েছে। দলের ঐক্য গড়ে উঠেছে। দল ও দেশের প্রতি নিবেদিত প্রান নেতা-কর্মি সৃষ্টি হয়েছে। এমন ঘটনা ঘটেছে বার বার বহুবার। কিন্তু ওরা কখনই আমাকে আমার আদর্শ থেকে আমার বিশ্বাস থেকে টলাতে পারেনি।
আমাকে আমার স্বামী-সন্তানের সৃতি বিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে। জেলে দিয়েছে। আমার দুই সন্তান কে বন্দি করে নির্যাতন চালিয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য করতে চেয়েছে। বার বার একই কথা বলেছি, বাংলাদেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নাই। বাংলাদেশ আমার প্রথম ও শেষ ঠিকানা। আমি আমার বন্দি দশায় মা হারিয়েছি, ভাই হারিয়েছি , হারিয়েছি দলের অনেক সন্তানকে। তবুও হারায়নি আমার মনোবল। মইনুদ্দিন-ফকরুদ্দিনের অগণতান্ত্রিক অপকর্মের বৈধতা না দিয়ে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছি প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ। অবিচল দাঁড়িয়ে থেকেছি দেশ, দেশের মানুষ ও গণতন্ত্রের পক্ষে। যন্ত্রণার হা হা কারের তীব্র কষ্ট বুকে বেঁধে দাঁড়িয়ে থেকেছি নয়নের মনি ছোট ছেলের কবরের পাশে। তার পরেও মাথা নত করিনি অন্যায়ের কাছে, গনতন্ত্রের হত্যাকারকদের কাছে। দেশের মানুষের ওপর ওদের অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়নের প্রতিবাদ করেছি। দেশের মানুষকে সাথে নিয়ে গনতন্ত্রের মুক্তি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছি। কোন লোভ লালসা, ভয় ভীতি ষড়যন্ত্র কোন কিছুই আমাকে আমার দেশের মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। ইনশাআল্লাহ্‌ পারবে না।
আমার দেশপ্রেমী সন্তানেরা
তোমাদের সাথে আমার এখন যে বিচ্ছিন্নতা তা খুবই সাময়িক। আমি জানি আমার জন্য তোমাদের কষ্ট হচ্ছে। যে দু হাত দিয়ে এই দেশ গড়তে চেয়েছি সেই হাতে ওরা হাত কড়া পরাতে চাইছে। যে পায়ে হেটে বেড়িয়েছি গ্রাম থেকে গ্রামান্ত

জেলখানা থেকে মা’র চিঠি
পর্ব : ২
———————————
(চার পাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার আলোকে কল্পনা প্রসূত লেখা। এর দায় দায়িত্ব সম্পুর্ন লেখকের। এ লেখা তাদের জন্য যাদের হৃদয়ে রয়েছে বন্দিনী মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। এ লেখা তাদের জন্য নয় যারা মতলব বাজ ও এক চোখা – আশিক ইসলাম)

১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮
রোজঃ শুক্রবার
সময়ঃ রাত ৯টা ২০মিঃ
স্থানঃ বকশীবাজার, পরিত্যাক্ত কেন্দ্রীয় কারাগর
ঢাকা, বাংলাদেশ।

আমার আদরের সন্তানেরা
প্রায় দুই শত বছরের পুরাতন জরাজীর্ণ পরিত্যাক্ত জেলখানার ময়লা গুমোট একটি ভবনে আজ ৯ দিন তোমাদের মা বন্দী। তোমাদের বৃদ্ধা এই মা প্রতিদিন আশায় থাকেন আগামীকাল হয়তো আমি আমার সন্তানদের কাছে ফিরে যেতে পারবো। আমি আমার দুচোখ ভরে ঐ সন্তানদেরকে দেখবো, যারা ম্যাডাম থেকে আমাকে মা’র আসনে বসিয়েছে, মায়ের মত ভালোবাসে, মায়ের জন্য লড়াই করে। আমি দু হাত বাড়িয়ে ঐ সন্তানদের আদর করবো যারা মায়ের জন্য কাঁদছে, কষ্ট পাচ্ছে, অস্থির হয়ে আছে। আমি জানি, মা বিহীন সন্তান ভালো থাকে না, ভালো থাকতে পারে না। আমিও কাঁদছি প্রতি নিয়ত তোমাদের জন্য। তোমাদের কথা মনে হতেই ঝাপসা হয়ে আসে আমার দু চোখ। মনের চোখে তোমাদেরকে দেখতে পাই, তোমাদের সাথে কথা বলি।
আমার সন্তানেরা
প্রতিহিংসার নিষ্ঠুর অবিচারে নির্জন নিঝুম এক ভৌতিক পরিবেশে বন্দী করে রাখা হয়েছে তোমাদের মা’কে। কোথাও কোন মানুষ নেই, শুন-শান চারিদিক। জনমানব শুন্য এতো বড় কারাগারে একমাত্র বন্দী আমি। আমাকে রাখা হয়েছে নারী সেলের দোতালার ডে কেয়ার কক্ষে। হাসপাতালের ওয়ার্ডের মত বিশাল এই রুমটি অপরিস্কার নোংরা। সব কটি দরজা-জানালা বিশেষ ভাবে বন্ধ করার কারনে উৎকট ভ্যাপসা গুমট কূট গন্ধ পুরা ঘরে। চারদিক বন্ধ থাকার কারনে ঘরের ভেতরে বেশ গরম। নেই কোন ফ্যান। একটি এসি আছে যা নষ্ট। বলেছে, উপরের নির্দেশ না পেলে মেরামত করা যাবে না। ভয়াবহ মশার উপদ্রব, নিয়ন্ত্রনের কোন উপায় নেই। দু চোখে ঘুম নেই বললেই চলে। লাল ইটের পরিত্যক্ত ভবনের দেয়ালের খসে পড়া চুনশুড়কি যেন আমাকে পরিহাস করছে। মনে করিয়ে দিচ্ছে – ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ধানমণ্ডির সুধা সদনের বাসা থেকে যখন শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো তখন তার মুক্তি দাবি করে আমি বিবৃতি দিয়ে বলেছিলাম “শেখ হাসিনাকে মুক্ত রেখে আইন পরিচালনা করা হলে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ, সামাজিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক হানাহানির আশঙ্কা কমে আসবে”। আমি আরো বলেছিলাম- “শেখ হাসিনা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় নেতার কন্যা এবং দেশের সম্মানিত নাগরিক। তাকে গ্রেফতার করায় বিবেকবান নাগরিকেরা আহত হয়েছেন। এর ফলে দেশে বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে”।
অথচ আজ শুধুমাত্র রাজনৈতিক ভাবে আমাকে এবং আমার দলের নেতা-কর্মীকে বিপর্যস্ত করার জন্য, কোণঠাসা করার জন্য এই অন্যায় অবিচার আর ষড়যন্ত্র চলছে। ষড়যন্ত্র চলছে জিয়া পরিবারকে ধংসের জন্য। ষড়যন্ত্র চলছে বিবেকবান দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তি শুন্য নব্য বাংলাদেশের। এই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে বুঝে না বুঝে আবার কেউ কেউ বিবেক বন্ধক রেখে পা দিয়েছেন। একজন বিচারক বিচার করে থাকেন আইন ও বিবেক দিয়ে। একমাত্র মহান রাব্বুল আলামীন বলতে পারবেন আমার বিচারের ক্ষেত্রে আইন,বিবেক,ন্যায়-নিষ্ঠা, সত্য-মিথ্যা, প্রতিহিংসা -জিঘাংসার মধ্যে কোনটার প্রতিফলন ঘটেছে। সেই সাথে বলতে পারবেন স্বয়ং বিচারক নিজে। যিনি নিজেও একদিন মহা পরাক্রমশীল ন্যায় বিচারকের সামনে আসামী হয়ে দাড়াবেন।
আমার প্রিয় সন্তানেরা
মনে পড়ে, রায় ঘোষণার আগের দিন সংবাদ সম্মেলন করে দ্বিধাহীন কণ্ঠে স্পষ্ট ভাষায় আমি বলেছিলাম, “ আপনাদের খালেদা জিয়া কোন অন্যায় করেনি। কোন দুর্নীতি করেনি”। আজ গোটা বাংলাদেশ এ কথা বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের মানুষ সহ বিশ্ব দেখছে ওদের অন্যায় অবিচার আর প্রতিহিংসার বিষাক্ততা। আর তাই গ্রেফতার জুলুম নির্যাতন উপেক্ষা করে মানুষ পাশে এসে দাড়িয়েছে। জানতে পেরেছি ওরা তোমাদের ওপর জবরদস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। শান্তিপুর্ন কোন কর্মসুচী করতে দিচ্ছে না। মানব বন্ধন থেকে অনশন সব কিছুতে ওরা ভীত হয়ে পড়ছে। গায়ের জোরে যা খুশী তাই করতে চাইছে। কিন্তু ওরা ভুলে গেছে , জবরদস্তি চলে পশুর সাথে মানুষের সাথে নয়। ওরা ভুলেগেছে জোর খাটানে যায় অবুঝ বোবা জানোয়ারের ওপর বিবেকবান মানুষের ওপর নয়। ক্ষমতার দম্ভে ওরা ভুলে গেছে, বাংলাদেশের মানুষ জন্তু জানোয়ার নয়, নয় কোন কীট পতঙ্গ। মহান আল্লাহতালা মানুষকে বানিয়েছেন সৃষ্টির সেরা হিসাবে। সেই বিবেকবান মানুষ যদি একবার রুখে দাঁড়ায় পৃথিবীর কোন স্বৈরশাসকের ক্ষমতা নেই তা রুখবার। মানুষ যদি একবার ক্ষেপে যায় তার পরিনিতি হয় ভয়াবহ। রাজনীতি মানুষের জন্য, রাজনীতি দেশের জন্য, উন্নয়নের জন্য। দোয়াকরি মহান সৃষ্টি কর্তা যেন ওদেরকে শুভ বুদ্ধি দেন।
আমার আদরের সন্তানেরা
অনেক কথা বলতে চাই তোমাদের কিন্তু কেন জানি খুব ক্লান্ত লাগছে। পায়ের ব্যথা বেড়েছে। হাটতে খুব কষ্ট হচ্ছে। খাবারে রুচি নেই বললেই চলে। আমার সাথে কাওকে দেখা করতে দিচ্ছে না। আমার ওপর মানসিক চাপ বাড়ানোর জন্য এক অস্বাভাবিক পরিবেশ তৈরী করা হয়েছে। মানা হচ্ছে না নুন্যতম আইন কানুন বা জেল কোড। এমনকি আমার ডাক্তাররা এসেছিলো আমার শারীরিক অবস্থা দেখতে। সারাদিন জেলগেটে বসে থেকে অনুমতি না পেয়ে ফিরে গেছে। আমি জানি তোমাদের এই ৭৩ বছরের বৃদ্ধা মাকে নিয়ে তোমরা খুব চিন্তায় আছো। দেশে-বিদেশে আন্দোলন করছো। রহমানের রাহীমের কাছে মা’য়ের জন্য যে ভাবে পারছো দোয়া করছো, কাঁদছ, রোজা রাখছো। আল্লহর কাছে দোয়া করো, তিনি যেন তোমাদের এই মাকে সুস্থ রাখেন, মানসিক শক্তি আরো দৃঢ় করে দেন, দ্রুতই তোমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনেন। রাব্বুল আলামীন যেন আমাকে অতীতের মত ন্যায় নিষ্ঠা এবং সততার সাথে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকবার শক্তি দেন।
আমি তোমাদের মাঝে ফিরে আসতে চাই। আমি জানি আমার সন্তানেরা আমারই মত মাঠের লড়াকু সৈনিক। তারা আমারই মত আপোষহীন, তাদের শীর উন্নত। তারা তাদের মা’কে মুক্ত করে আনবে ইনশাআল্লাহ্। কিন্তু তার জন্য দরকার কঠিন ঐক্য। একমাত্র তোমাদের ঐক্যই পারে আমাকে তোমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনতে। আমাদের সকলের ঐক্যই পারে বাংলাদেশ নামক বর্তমানের এই বৃহৎ বন্দী দশা থেকে সকলকে মুক্ত করতে। তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যকে দোষারোপ করো না। একে অপরের দোষ খুজতে যেও না। মনে রেখ সবার শক্তি সামর্থ সমান হয় না। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর সহ মর্মিতার হাত বাড়িয়ে দাও। যে দুর্বল তাকে অবহেলা না করে, কটুক্তি না করে শক্তি যোগাও। পরিবারের সবার শক্তি, সামর্থ, বুদ্ধি, যোগ্যতা সমান থাকে না। কিন্তু তাই বলে এক ভাই আপর দুর্বল ভাই বা বোনের হাত ছেড়ে দিও না। মনে রেখো, মায়ের চোখে তার সব সন্তান সমান। আমি আমার সব সন্তানকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি, ভালোবাসি আমার দেশবাসীকে। দোয়াকরি দুখী এই বাংলাদেশে আমার সন্তানেরা সহ সকলের সন্তান শুখে থাকুক। ভালো থাকুক।

ইতি
তোমাদের বন্দী মা।
————————-