জ্যোৎস্না সুন্দরী ও আক্কেল; সিনেমায় কেনো এমন দৃশ্য? – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

জ্যোৎস্না সুন্দরী ও আক্কেল; সিনেমায় কেনো এমন দৃশ্য?

প্রকাশিত: ৮:৩৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১, ২০২০

জ্যোৎস্না সুন্দরী ও আক্কেল; সিনেমায় কেনো এমন দৃশ্য?

ডা. সাঈদ এনাম:
নায়িকা জ্যোৎস্না সুন্দরীকে সাপে কামড় দিয়েছে। সে মাগো বাবাগো বলে একটা চিৎকার দিলো অতঃপর চিৎপটাং। নায়ক আক্কেল তখন ছিলো পাশের টিলায় বাশ বাগানে চুলার আগুনের বাঁশ কাটতে। সে চিৎকারের মুহুর্মুহু প্রতিধ্বনি শুনে ধুমকেতুর মতো দৌড়ে এসে দেখলো নায়িকা জ্যোৎস্না সুন্দরী চিৎপটাং, সাড়া শব্দহীন আর পাশে হেলেদুলে দৌড়ে পলায়নরত একটা কালো রঙের সাপ।

ব্যাস, সাপ দেখে নায়ক আক্কেল এর আর কোন কথা নেই। ঝাপিয়ে পড়লো জ্যোৎস্নার পায়ের উপর। যেখানে সাপ কামড় দিয়েছে ঔখানে ঠোট লাগিয়ে চুষতে থাকলো নায়ক আক্কেল। সে কি জীবন মরণ চুষনি। বুড়ো বাচ্চারা দুষ্টুমি করে যেভাবে চু -চু নিপলবচুষে কিছুটা ওরকম।

আক্কেল চুষছে তো চুষছেই। আর কিছুক্ষণ পর গল গল করে ওয়াক করে মুখ থেকে বের করছে থোকায় থোকায় রক্ত। বিষ মাখানো কালো সে রক্ত। শুরু হয়ে গেলো দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালি। কিছুক্ষণ পর নায়িকা জ্যোৎস্নার জ্ঞান ফিরে আসলো। তার দেহে বা রক্তে আর সাপের বিষ বা বিষক্রিয়া নেই। নায়ক আক্কেল সব বিষ শুষে এনেছে মুখ দিয়ে।

এদিক ওদিক তাকিয়ে নায়িকা রক্ত মাখা আক্কেলের ঠোঁট দেখে আক্কেলগুড়ুম। তাদের চার চোখে একবার চাওয়া চাওয়ি হয়। তারপর পরিচালক ক্যামেরা কে আকাশের দিকে তুলে ধরলেন। আকাশে মুহুর্মুহু বজ্রপাত শুরু হয়ে গেছে তাদের চার চোখের মিলনে। পরক্ষণেই দুজন চিলের মতো উড়ে গিয়ে পড়লো সেই নির্জন বাশ বাগানে যেখানে আক্ষেল কিছুক্ষণ আগে কাটছিলো উনুনের বাঁশ।

ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে বাদ্য বাজনা। বাদ্য-বাজনার তালে তালে তারাও শুরু করে দিলো দিড়িম দিড়িম নাচ, ধস্তাধস্তি আর ক্যারাটে ফাইটিং। ধুমধাম বাজনার তালে তাল দিয়ে একজন গিয়ে পড়ে আরেকজনের উপর, সেই সাথে দর্শকরাও টগবগে উত্তেজনায় একবার এইদিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে’তো আরেকবার ঐ দিকে পড়ে। চলে মুহুর্মুহু করতালি। নায়ক নায়িকার এই হাত পা ছুড়াছুঁড়ি, ধস্তাধস্তি আর একে অপরের উপর গড়াগড়ি দেখে বলা মুশকিল হবে তাদের মধ্যে কাবাডি খেলা হচ্ছে নাকি রেসলিং হচ্ছে।

পাঠক উপরের এই চিত্র হলো আমাদের আবহমান বাংলা বা হিন্দি সিনেমার প্রথম অংশের নায়ক নায়িকার হৃদয়ে হঠাৎ করে প্রেম উৎপাদন হবার কারন। সাপের সব বিষ শুষে নিয়ে আক্কেল মহানায়ক হয়ে গেছে নায়িকার জ্যোৎস্না সুন্দরীর কাছে৷ নায়িকা জ্যোৎস্নার হৃদয়ে তাই তৈরি হয়েছে ভালোবাসার সুনামি।

আমার প্রশ্ন এসব নোংরা ধস্তাধস্তি বা নাচানাচিতে নয়। এ প্রশ্নে লাভ হবেনা, প্রশ্ন হলো আবহমানকাল ধরে সাপে কাটা রোগীর দেহ থেকে বিষ নামানোর এই উদ্ভট পদ্ধতি। এভাবে দেখানো ঠিক হলো?

সাপে কাটার এ ভুল চিকিৎসা দেখানো হচ্ছে বিগত কয়েক যুগ ধরে বাংলার সিনেমাতে! সাপে কাটা রোগীর রক্ত শুষে নিয়ে রুগীকে সুস্থ করে তোলা যায় মেডিকেল সায়েন্সের কোথাও এমন আছে বলে আমার জানা নেই? বছরের পর বছর এরকম একটা ভ্রান্ত দৃশ্যের মঞ্চায়ন শুভকর নয়।

এমনিতে আমাদের দেশ ভন্ড কবিরাজ, ওঝা, আর ফুৎকার বাবাদের ডিপো হয়ে বসে আছে৷ চিকিৎসা পদ্ধতি আর চিকিৎসক দের নিয়ে গ্রামে গঞ্জে আমজনতার মাঝে প্রচলিত আছে নানান রকমের কুসংস্কার। সাপের বিষ চুষে চুষে বের করে রোগী সুস্থ করা সম্ভব নয়। সাপে কাটা স্থান চুষতে গিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। উভয়ের প্রানহানী হতে পারে। লাইন লেন্থ ঠিক রেখে ফার্স্ট বল করলে সমস্যা নাই। সমস্যা যত নো বল কিংবা ওয়াইড বলে। তেমনি নাটক সিনেমার কাহিনীতে বিনোদন, সুখ দুঃখ রাখতে হবে নাহলে আমজনতা খাবেনা। তা বুঝলাম। তাই বলে এভাবে চিত্রায়ণ।

বিনোদন দেখে ভালো অনেক কিছুর চিত্রায়ন সম্ভব। সেটাই করা উচিৎ। আমাদের মতো কুসংস্কার ভরা দেশে আমজনতা কে ভালো জিনিস বেশি বেশী করে দেখানো উচিত। আমজনতার ছবি তো কি হয়েছে,তারাতো জনতারই অংশ। তাই নয় কি। এসব উল্টোপাল্টা দেখেইতো গ্রামে গঞ্জে আমজনতা রোগ হলে প্রথমে দৌড়ায় ওযা, কবিরাজ, ফুৎকার বাবা আর ভন্ডবাবাদের ডেরায়। গিয়ে হয় অবহেলিত।

এসব উদ্ভট দৃশ্যের অবতারণা কেনো?
আসলে যারা এসব কাহিনী দিয়ে ছবি তৈরি করেন থাকেন তাদের এ ব্যাপারে খুব একটা সায়েন্টিফিক জ্ঞান আছে বলে হয়না। আবার অনেকে আছেন কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক এসব দেখানোর ধার ধারেনা। তাদের উদ্যেশ্য কিভাবে ইমোশন কে কাজে লাগিয়ে দর্শককে টেনে আনা যায়। ব্যবসা ভালো হয়।

সাপে কাটা রোগীর কাটা অংশের উপরে হালকা বেঁধে তাকে হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে নিয়ে এন্টি স্নেইক ভেনাম দিয়ে সুস্থ করে তুলতে হয়। কিন্তু পরিচালক সাহেব রা এটা মানতে নারাজ। তাদের ভিন্নমত। দর্শক সাপে কাটা রোগীর হাসপাতালে চিকিৎসা মেনে নেবেনা। হাসপাতালে রোগী সুস্থ হয়, দর্শক নাকি এগুলো ঠিকমতো খায়না।

দর্শকের চাহিদা, পছন্দ এবং আস্থা, নায়ক আক্কেলের সাপে কাটার ‘চুষনি চিকিৎসা’ কিংবা ভন্ড সাধু সন্যাসী বাবাদের ‘হুংকার দিয়ে ফুৎকার’ চিকিৎসা পদ্ধতিতে। তাই তারা এ সব দৃশ্য ছবিতে দেখান। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন টিভি নাটকে নায়ক নায়িকার ডায়লগে ছিলো অমিত বাংলার প্রচলন। আর এখন ‘খাইছি’, ‘গেছিগা’, ‘আছসনা ক্যারে’, ‘যাচ্চা ক্যারে’ এসব ভাড়ামীতে ভরপুর। বিষয়টি খুবই ক্ষুদ্র হয়তো আলোচনায় আসেনা তারপরও আমজনতা’তো আমাদের জনতার অংশ। আমজনতা কে ভুল ম্যাসেজ দেয়া কি ঠিক।

ডা. সাঈদ এনাম
ডিএমসি, কে-৫২ সাইকিয়াট্রিস্ট
সহকারী অধ্যাপক সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •