টাক মন্ত্রী! – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

টাক মন্ত্রী!

প্রকাশিত: ৭:০১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০১৬

টাক মন্ত্রী!

617cb3438affa742ee985a18da29fbf9-10১৩ অক্টোবর ২০১৬, বৃহস্পতিবার: জামরুল মন্ত্রী হবার আগে থেকেই বংশগত কারণে টেকো ছিলো। ছাত্র থাকা কালে সে একদিন তার ছাত্র সংগঠনের জেলা কার্যালয়ে গেলো জেলা কমিটিতে পদের জন্য লবিংয়ের উদ্দেশ্যে।

সে যখন অফিসে ঢুকে বসল তখন থেকেই কিছু উঠতি ছাত্র যুবক তাকে দেখে হাসছিলো। তাদের ভাবলেশহীন তাচ্ছিল্যের হাঁসির জন্যে জামরুল মনে মনে ফুঁসতে লাগলো এবং একপর্যায়ে সে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে যুবকদের মধ্যে সবচেয়ে নাদুস-নুদুস যুবকটিকে দাবাং স্টাইলে ঘুসি মেরে বসলো, ঘুসি খেয়ে যুবকটি তীব্র চিৎকারে মাটিতে পড়ে গেলো। মুহূর্তেই ব্যাপারটি অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল এবং পড়ে যাওয়া যুবকটিকে ঘিরে জটলা তৈরি হলো। সকলেই অজানা কৌতূহলে জামরুলকে দেখতে লাগলো, এরই মধ্যে পিয়নের তথ্যে নিজ কক্ষ থেকে মূল সংগঠনের জেলা সভাপতি বসাক চন্দ্র হাজির হলো এবং তার অতি আদরের সন্তান লিটন ঘুসি খাওয়া রক্ত রঞ্জিত ভোতা নাকে হাত দিয়ে মেঝেতে পড়ে আছে; চোখ বড় বড় করে সবাইকে দেখছে আর কাঁদছে। এই ঘটনায় বসাক সাহেব বিব্রত হলেন না নিজের ছেলেকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠালেন এবং জামরুলকে সবার সামনে ক্ষমা করে দিয়ে মহত্ত্বের ভাব ধরলেন।

রাতে…

সবার সামনে মহত্ত্বের ভাব ধরলেও বসাকের তার অতি আদরের সন্তানের গায়ে হাত তোলা জামরুলের মুখ মনে করে তার ঘুম আসছিল না, ঐ অপরিণামদর্শী ছেলেটিকে তার পিষে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। পরে তিনি একটি সুন্দর ফন্দি আঁটলেন এবং প্রচুর হুইস্কি ও বিয়ার খেয়ে বেড রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লেন।

পরদিন সন্ধায়…

জামরুল বসাক সাহেবের জরুরী ডাকে জেলা কার্যালয়ে হাজির। তাকে বসাক সাহেব ব্যক্তিগতভাবে নিজ মুখে জানালেন যে, সে জেলা কমিটির ৩নং সহকারী অফিস সম্পাদক পদে সিলেক্ট হয়েছে আর অফিস সম্পাদক করা হয়েছে বসাক সাহেবের ছেলে লিটনকে। এতে জামরুলের কোন উৎকোচ দিতে হবেনা; তবে একটা ছোট শর্তে সে এই পদ পাবে বলে তাকে জানালেন বসাক সাহেব। জামরুল খুশিতে গদগদ হয়ে… ‘স্যার যে কোন শর্তই আমি মানতে রাজি’ এই বলে সে আশে পাশে তাকিয়ে নেতাজির পা চেপে ধরল এবং বলল কি সেই ছোট শর্ত? বসাক সাহেব জানালেন তার ছেলে লিটন বায়না ধরেছে প্রতিদিন অফিসে আসার পর এবং যাওয়ার সময় সে জামরুলের তাকে একটি করে মধ্য আঙুলের মাঝারি মানের টোকা মারতে চায়। এই শর্তের কথা শুনে জামরুলের হাঁসি হাঁসি তৈল মার্কা চেহায়ায় হটাৎই ঘোর অন্ধকার নেমে এল।

কিছুক্ষন দুজনই নিরব…

হঠাৎ জামরুল জানালো স্যার আমি রাজি। বসাক সাহেব বললেন তাহলে তো ভালোই দেখো তুমি কিন্তু এমনিতে সদস্যও হতে পারতে না শুধু আমার ছেলের উদার ইচ্ছায় তুমি ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা…সর‍্যি দলের তিন নাম্বার অফিস সম্পাদক হয়েছ।

আবার রুমে নিরবতা ফিরে এল…

কিছুক্ষন পর জামরুল বললো স্যার আমি যদি উইগ পড়ে আসি তবে কি আমি টোকা থেকে বাঁচবো?

বসাকঃ না তুমি বাঁচবে না, তবে তুমি যদি চিকিৎসা করে মাথায় চুল তুলতে পারো তবে তুমি বাঁচতে পারবে (যা অসম্ভব মনে মনে ভাবলেন বসাক সাহেব); জামরুল শেষ কথাটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলো এবং মনে মনে ভাবলো আমার মত ছেলে এত ভালো পদে পদায়ন হতে যাচ্ছে! এই অল্প লজ্জা ভোগ করলেও সমস্যা নেই পরে বড় নেতা হলে তো প্রতিশোধও নেয়া যাবে। পরক্ষনেই সে বসাক সাহেবকে অনুরোধ করলো স্যার আমি রাজি তবে আপনার কাছে ছোট একটা অনুরোধ,

বসাকঃ কি?

জামরুলঃ স্যার ছোট সাহেব বাড়ি দিলেও যেন সবার সামনে না দেয় এটাই অনুরোধ রইল।

বসাকঃ (মুচকি হেঁসে) তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বললেন ওকে তুমি এবার আসতে পারো।

জামরুল এবার বসাক সাহেবের পা ছেড়ে উঠে পড়লো।

জামরুল বসাক সাহেবের রুম থেকে বের হবার সময় দেখলো সবাই তাকে দেখে মুখ চেপে চেপে হাঁসছে এবং সে পেছনে দেখলো কালো গ্লাসের পর্দা সরানো থাকায় সবাই ব্যাপারটি উপভোগ করেছে। এতে সে একটু লজ্জা পেলেও হঠাৎ নেতা হবার আনন্দে সে মনের অজান্তেই হেঁসে উঠল, ঠিক এ সময় ভেতর থেকে বসাক সাহেবের আওয়াজ এলো নেক্সট; জামরুল এবার বুঝতে পারলো বসাক সাহেবের রুমের আভ্যন্তরীণ সাউন্ড সিস্টেম অন ছিল এবং সবাই তাদের কথাগুলো শুনতে পেয়েছে।

সারারাত মনের কষ্টে জামরুল ঘুমাতে পারছিলো না তবুও নেতা হবার লোভে কমিটি থেকে পদত্যাগ করার চিন্তা মনেও আনলো না। সে সিদ্ধান্ত নিল যত টাকাই লাগুক প্রয়োজনে তাদের বাড়ীর মহিষ গুলো বেচে দিয়ে হলেও টেকো মাথা চুলে ভরাতেই হবে। নেতা যেহেতু হয়েই গেছে দল ক্ষমতায় গেলে টাকার সমস্যা থাকবে না কত্তো চাঁদা খাওয়া যাবে! এই ভেবে সে আয়েসে গাঁজার কল্কিতে প্রয়োজনীয় সুখটান দেয়ার পর চোখ বুজে এক ঘুমে রাত পার করলো।

আজ সকালে জামরুল প্রতিদিনের মতো কোন না কোন বন্ধুর টাকায় নাস্তা না খেয়ে নিজের টাকায় নাস্তা খেয়ে নিলো এবং চুল গজানোর চিকিৎসা কোথায় ভালো ভাবে করা যায় এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান খুঁজতে বের হলো। সারাদিন খুঁজে সে ৫টি প্রতিষ্ঠান পেলো এবং বিবেচনা করে একটি প্রতিষ্ঠান ঠিক করলো এটির নাম গুপ্ত হারবাল সেন্টার। এই প্রতিষ্ঠানের রঞ্জিত গুপ্তের কথাই তার খুব ভালো লেগেছে, যদিও দাম কিছুটা বেশী তবুও মাত্র ১মাসে চুল গজানোর জেলটি তার মনে ধরেছে।

পরদিন সকাল সকাল জামরুল বাড়ীতে গেলো এবং মা-বাবার অসম্মতিতে জোর করে ৬টি মহিষের মধ্যে ৩টি বিক্রয় করে সন্ধ্যার মধ্যেই জেলা শহরে ফিরে এল।

সকালে…

আজকে জামরুল খুবই খুশী সে নেতাও হলো! আবার টাকের সমস্যার সমাধানও পেলো! দেরি না করে নাস্তা করেই সে গুপ্ত হারবালে গেলো এবং একমাসের জন্য বড়ি ও জেল কিনলো সাথে ডাক্তার রঞ্জিত গুপ্তের প্রেসক্রিপশন পেলো। প্রেসক্রিপশন দেখে তো জামরুলের চক্ষু চড়কগাছ, হায়! একি! চুল গজানোর জন্য মোট ১৫ টি কঠিন শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে এখানে, যা তার বাউন্ডুলে জীবনে মানা খুবই কষ্ট হবে। ডাক্তারের দিকে তাকাতেই ডাক্তার বলল অতি সহজে কেষ্ট মেলেনা বাপু কষ্ট করতে হয়; এই প্রেসক্রিপশন স্টিকলি ফলো করতে হবে তবেই কেষ্ট বাপুর দেখা মিলবে। জামরুল বুঝে নিলো টেকোত্ব ঘোচাতে এর বিকল্প নেই তাই সে শর্ত মেনে নিয়েই বাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো।

পরদিন…

ডাক্তার গুপ্তের কাছে জামরুলের ৫ জন দূত এসে ডাক্তারকে জানালো আপনাকে ভাই ডাকছে এবং এখনই যেতে হবে। ডাক্তার বললো কেন কি হয়েছে ভাই! ছেলেগুলো জানালো তার দেয়া প্রেসক্রিপশন ফলো করতে গিয়েই আজকে জামরুল জেলা সদর হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। তাই ছেলে গুলো ডাক্তারকে একপ্রকার জোর করেই উঠিয়ে নিয়ে গেলো এবং জেলা সদর হাসপাতালের চতুর্থ তলার জেনারেল বেড নং ৪২০-এ নিয়ে গেলো।

গুপ্ত বাবু যখন জেনারেল ওয়ার্ডে ঢুকলেন তখন দেখলেন জামরুল হাত-পা ভাঙ্গা অবস্থায় হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে। সে গুপ্ত বাবুকে দেখেই রাগ্রত চোখে তাকাতে লাগলো এবং তার তাকানো দেখে বাকি ৫ যুবক শার্টের হাতা গুটাতে লাগলো…

খুব সল্প সময়ের মধ্যেই ৪২১নং বেডে গুপ্ত বাবুকে ভর্তি করা হলো; কিন্তু গুপ্ত বাবু এখনও জানে না তার প্রেসক্রিপশনের এমন কি ছিলো যা জামরুলকে এই অবস্থায় হাসপাতালে এনেছে!?

চারদিন পর…

গুপ্ত বাবু ও জামরুল উভয়েই কথা-বার্তা বলতে পারছে তবুও গুপ্ত বাবু ভয়ে জামরুলের সাথে কথা বলছিলো না। এরই মধ্যে ডিউটি ডাক্তার এলো (জামরুলের দূর সম্পর্কের আত্মীয়); ডাক্তার জামরুলকে বললো টাকের জেল ও বড়ি গুলো কি ফেলে দিয়েছেন? জামরুল বললো আপনি যখন বলেছেন এগুলো খুব ক্ষতিকর এবং গুপ্ত হারবাল অনেকবার জরিমানার শিকার হয়েছে তখনই আমার মা ওগুলো ফেলে দিয়েছেন। ডাক্তার বললেন… ভালো করেছেন এখনই পুলিশ আসবে প্রতারক গুপ্তকে ধরতে। অপেক্ষা করুন ওর ভালো শাস্তি হবে এবং আপনার টাকাও জরিমানাসহ উসুল হবে।

পুলিশ আসার কথা শুনে গুপ্ত বাবু ভয় পেলেও তার কৌতূহল কাটলো না। কিভাবে তার ঔষধে জামরুলের হাত-পা-মাথা ভাঙলো ! সেই কৌতূহল মেটাতেই সে জামরুলকে বলল; ভাই আমি আপনাকে ভুয়া ঔষধ দিয়েছি তাই আপনার ডাক্তার আত্মীয় আমাকে পুলিশে দিচ্ছেন ঠিক আছে কিন্তু মা কালির দিব্বি আমি বুঝতে পারছিনা আমার ঔষধে কিভাবে আপনার হাত-পা ভাঙল!?

জামরুলঃ (রাগ্রত স্বরে) ধুর ফাউল তুমি না আমাকে বলেছ প্রেসক্রিপশন কঠোর ভাবে ফলো করতে?

গুপ্তঃ বলেছি এতে কি হল!?

জামরুলঃ তোমার ওইখান থেকে ঔষধ নিয়ে রিকশা নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ শুরু হল কাল বৈশাখী দমকা হাওয়া। পাশ দিয়ে যাচ্ছিল ৫০-৬০ টি গরুর পাল। গরু দেখতে দেখতে বাতাসে প্রেসক্রিপশন উড়ে পড়লো চলমান গরুর পালে আর তোর কথামত প্রেসক্রিপশন ফলো করতে গিয়ে আমিও ঝাপিয়ে পড়লাম গরুর পালের মাঝখানে; তখন গরু গুলো ভয়ে এদিক সেদিক দৌড়াতে লাগলো আর আমি পড়ে গেলাম পরক্ষনেই যখন উঠতে গেলাম দেখলাম বিশাল একটি ষাঁড় রেগে আমার দিকে তেড়ে আসলো এবং তিব্রভাবে শিংয়ের গুতা খাওয়ার পর আমার আর কিছু মনে নেই। হুঁশ ফিরেছে পরদিন সকালে।

এই শুনে গুপ্ত বাবু হাসতে হাসতে কাহিল হয়ে পরল আর পুলিশ আসার আগেই হৃৎপিণ্ডে প্রচণ্ড ব্যাথা অনুভব করে হার্ট এ্যাটাকে মারা গেলো। তবে গুপ্ত বাবুর মুখটি মৃত্যুর পরেও শেষকৃত্যের আগ পর্যন্ত হাঁসি মাখাই ছিল।

কে জানে গুপ্ত বাবুর আত্মা এখনও হয়ত টেকো জামরুলের আশে পাশে ঘুর ঘুর করে হাসতে থাকে! অন্তত সেদিনের পর জামরুলের এমনই মনে হয়। কারন সে মাঝে মাঝেই সেই দিনের ঐ মৃত্যু হাসিটি শুনতে পায় যা আর কেউ শোনে না।

(বিঃদ্রঃ এই গল্পটির স্থান-কাল-পাত্র সবই উর্বরতাহীন মস্তিষ্কের অলিক কল্পনা মাত্র! কারো সাথে মিলে গেলে তার জন্য দুনিয়ার কেউ দায়ী নয়)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল