টিলাগড়ে তুচ্ছ কারণে অস্ত্রের মহড়া ও খুন – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

টিলাগড়ে তুচ্ছ কারণে অস্ত্রের মহড়া ও খুন

প্রকাশিত: ৯:৪৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০

টিলাগড়ে তুচ্ছ কারণে অস্ত্রের মহড়া ও খুন
  • হত্যাকারীদের গ্রেফতার দাবিতে বিক্ষোভ

  • আলোচনা আজাদ-রঞ্জিত

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সিলেটের টিলাগড় আলোচিত একটি এলাকা। তুচ্ছ কারণে এখানে হয় খুনাখুনি আর অস্ত্রের মহড়া। উঠতি যুবকদের হাতে থাকে অস্ত্র, থাকে কর্তৃত্বও। এখানে যারা লাশ হয় তারা অধিকাংশই বয়েসে তরুণ। কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অস্ত্রের মহড়ায় অতঙ্ক ছড়ায় চারপাশে। উদ্দেশ্য অধিপত্যে বিস্তার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করা। আর এসকল ঘটনা ঘটছে গ্রুপিং রাজনীতির কারণে। টিলাগড়ের গ্রুপিং রাজনীতিতে আবারও আলোচনায় আজাদ-রঞ্জিত। গত বৃহস্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে টিলাগড়ে পূর্ববিরোধ থেকে দলীয় কর্মীদের ছুরিঘাতে খুন হন অভিষেক দে দ্বীপ।

ঘটনার পর হত্যায় জড়িত ছাত্রলীগকর্মী সৈকতকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নিহত অভিষেক নগরের শিবগঞ্জ সাদিপুর এলাকার দিপক দে’র একমাত্র ছেলে। গত শনিবার রাতে সৈকতকে প্রধান আসামি করে চারজনের নামোল্লেখসহ আটজনের বিরুদ্ধে শাহপরাণ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত অভিষেকের পিতা দিপক দে। এদিকে কলেজছাত্র অভিষেক দে দ্বীপের হত্যাকারীদের গ্রেফতার দাবিতে নগরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন তার সহপাঠীরা। গত রবিবার নগরের টিলাগড় এমসি কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে টিলাগড় পয়েন্টে যান শিক্ষার্থীরা।

এর আগে টিলাগড় পয়েন্টে মানববন্ধন করতে গেলে পুলিশের অনুরোধে কর্মসূচি পরিবর্তন করে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। নিহত অভিষেকের চাচাতো ভাই বিজয় দে বলেন, পুলিশের অনুমতি নিয়ে পরবর্তীতে তারা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে টিলাগড়ে খুন হয়েছে ছাত্রলীগ কর্মী দ্বীপ। এ খুনের ঘটনায় টিলাগড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। টিলাগড় নগরীর পূর্ব অংশে অবস্থিত। পাশেই সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি ও সরকারি কলেজ। এখন নতুন করে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ গড়ে উঠেছে। ফলে বাইরের শিক্ষার্থীদের অন্যতম জোন হচ্ছে টিলাগড় এলাকা। কয়েক হাজার শিক্ষার্থী টিলাগড়ের বাসাবাড়িতে ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন।

কলেজ রাজনীতিকেন্দ্রিক সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত টিলাগড়। কারণ এমসি কলেজ কিংবা সরকারি কলেজের যত ঝামেলা সব এসে আছড়ে পড়ে টিলাগড়ে। বর্তমানে টিলাগড়ের কর্তৃত্বে রয়েছেন দু’জন। একজন হচ্ছেন মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ ও এডভোকেট রঞ্জিত সরকার। এই দু’জনের গ্রুপিং রাজনীতির কারণে বার বার ঘটছে হত্যাকান্ডেরর মত ঘটনা। তাদের কর্মী বাহিনী চরম বেপরোয়া। অনেক ঘটনার সাথে তাদের দুই জনের স্বজনরা জড়িত রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান। এই দুই জনের গ্রুপিং রাজনীতির কারণে আবার সাধারণ শিক্ষার্থীরাও নির্যাতনে শিকার হন। তাদের গ্রুপিং রাজনীতির কারণে শান্ত টিলাগড় এখন অশান্ত হয়ে উঠেছে। টিলাগড় কেন্দ্রিক ছাত্রলীগের বিতর্কিত কর্মকান্ডেরর কারণে জেলা ছাত্রলীগের কমিটি স্থগিত করা হয়েছিলো।

স্থানীয় সূত্র জানায়, টিলাগড়ে নিয়মিতই ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বেই ২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত এখানে প্রাণ হারিয়েছে ৮ ছাত্রলীগ কর্মী। এই হত্যার মিছিলে সর্বশেষ শিকার অভিষেক দে দ্বীপ। বৃহস্পতিবার রাতে সৈকত রায় সমুদ্রের নেতৃত্বে একদল যুবকের হামলায় অভিষেক দে দ্বীপ নিহত হন। নিহত দ্বীপ গ্রিনহিল স্টেট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। হামলায় নেতৃত্বদানকারী সৈকত সিলেট সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। নিহত দ্বীপ ও অভিযুক্ত সৈকত দু’জনই আওয়ামী লীগ নেতা রণজিৎ সরকার গ্রুপের অনুসারী ছাত্রলীগ কর্মী। নিহত দ্বীপ রঞ্জিত সরকারের নিজের এলাকার বাসিন্দা।

এমসি কলেজ, সরকারি কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সিলেটের টিলাগড়ে ছাত্রলীগের গ্রুপিং ও হত্যার রাজনীতি শুরু হয় ২০০৩ সালে। ওই বছরের ৭ই জানুয়ারি খুন হন আকবর সুলতান নামের এক ছাত্রলীগ কর্মী। একই বছরের ৯ই অক্টোবর খুন হন আরেক ছাত্রলীগ নেতা মিজান কামালী। ২০১০ সালের ১২ই জুলাই উদয়েন্দু সিংহ পলাশ, ২০১৬ সালের ১৬ই আগস্ট করিম বক্স মামুন, ২০১৭ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম, ১৬ই অক্টোবর ওমর আহমদ মিয়াদ, ২০১৮ সালের ৯ই জানুয়ারি তানিম খান এবং সর্বশেষ গত ৬ই ফেব্রুয়ারি রাতে খুন হয়েছেন অভিষেক দে দ্বীপ। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে ছাত্রলীগের এসব হত্যাকান্ডেরর বেশির ভাগ সময়ই খুনিরা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। নিহতের পরিবারে বিচারের আশা তাই থেকে গেছে মাতম হয়েই।

এলাকার লোকজন জানান, খুন ছাড়াও অস্ত্রবাজির ঘটনা ঘটেছে টিলাগড় এলাকায়। ২০১৩ সালের ১৯শে মে, ২০১৬ সালের ৭ই মার্চ, ২০১৮ সালের ৫ই জানুয়ারি টিলাগড় ও এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়ার ঘটনা ঘটে। কিন্তু কেউ আটক হয়নি। টিলাগড় এলাকায় এরকম ৭টি চক্রের কাছে অবৈধ অস্ত্রের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ৫টি চক্রই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার শেল্টারে। গত ১০ বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে টিলাগড় এলাকায় ৪০টির বেশি সংঘর্ষ হয়েছে। প্রতিটিতেই অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে। প্রভাব বিস্তার, সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা কারণে একের পর এক হত্যাকা- ঘটছে টিলাগড়ে। এসব অপকর্ম রোধে কমিটি স্থগিতসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

নগরীর শাহপরান থানার ওসি আব্দুল কাইয়ুম জানান, টিলাগড়ে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সব করছে বলে জানান তিনি। এদিকে শাহপরান থানার অধিভুক্ত টিলাগড় এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন এলাকার মানুষ। তারা বলেন, পুলিশ ফাঁড়ি থাকলে অনেক ঘটনায় তাৎক্ষণিক পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। তবে গ্রুপিং রাজনীতি বন্ধ না করলে হত্যাকান্ডেরর ঘটনা নিয়ন্ত্রন সম্ভব নয় বলে মনে করেন স্থানীয়রা। দুই ব্যক্তির গ্রুপিং রাজনীতির কারণে বার বার হত্যাকান্ডেরর মত বড় ধরণের ঘটনা ঘটছে। যাতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে একটি পরিবার ও পুরো সমাজ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল