ডিজিটাল ট্রাফিকের এনালগ হয়রানি – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ডিজিটাল ট্রাফিকের এনালগ হয়রানি

প্রকাশিত: ৭:১৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০১৬

ডিজিটাল ট্রাফিকের এনালগ হয়রানি

*সময়মতো কাগজ পাচ্ছেন না গাড়ির মালিকরা

*যানবাহনের মামলা রুজু ডিজিটাল পদ্ধতিতে হলেও জরিমানা পরিশোধের পর জব্দকৃত কাগজপত্র ফেরত দেয়ার বিষয়টি পুরোপুরি এনালগ হওয়ায় হয়রানি বেড়েছে

দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে যানবাহনের মামলার জরিমানার অর্থ পরিশোধের ভোগান্তি ও দালাল চক্রের হয়রানি ঠেকাতে বছর দুয়েক আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের ডিজিটাল প্রযুক্তি (পস মেশিন) ব্যবহার শুরু করলেও তা উল্টো পরিবহন মালিক-শ্রমিকের ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও জরিমানা পরিশোধের পর তাদের ব্যাংক ও কুরিয়ার সার্ভিসকে বাড়তি ফি দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে বিক্ষুব্ধরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ করলেও এ কার্যক্রমের বিশেষ সুবিধাভোগীদের চাপে চলমান পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং ক্ষেত্রবিশেষ হয়রানির মাত্রা দিনে দিনে আরও বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি ব্যাংক এবং একটি কুরিয়ার সার্ভিসকে বিশেষ সুবিধা দিতেই এ সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। এর নেপথ্যে আর্থিক লেনদেনের বিষয় রয়েছে বলেও অনেকে অভিযোগ তুলেছেন।
অথচ ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের শীর্ষস্থানীয়রা এর দায় একে অপরের ঘাড়ে চাপিয়ে বরাবরই দায়িত্ব এড়িয়ে চলছেন। তাদের ভাষ্য, উপর মহলের ‘সিদ্ধান্ত’ তারা শুধু তা বাস্তবায়নে কাজ করছেন; এখানে তাদের নিজস্ব কোনো পরিকল্পনা তৈরির সুযোগ নেই। যানবাহনের মামলা রুজু ডিজিটাল পদ্ধতিতে হলেও জরিমানা পরিশোধের পর জব্দকৃত কাগজপত্র ফেরত দেয়ার বিষয়টি পুরোপুরি এনালগ হওয়ায় এ হয়রানি হচ্ছে বলে ট্রাফিক কর্মকর্তারা নিঃসংকোচে স্বীকার করেন। তবে ‘উপর মহল’ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে কেউ রাজি হননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, মামলা রুজু থেকে শুরু করে জরিমানা আদায় ও জব্দকৃত কাগজপত্র ফেরত দেয়ার গোটা কার্যক্রমই ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা সম্ভব। অথচ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ চক্রের বিশেষ স্বার্থ থাকায় তা করা হচ্ছে না। এ নিয়ে ট্রাফিক বিভাগের বিভিন্ন বৈঠকে দফায় দফায় আলোচনা হলেও ওই সুবিধাভোগীদের অপতৎপরতায় তা ভেস্তে যাচ্ছে বলে জানান মাঠপর্যায়ের মধ্যম সারির ওই ট্রাফিক কর্মকর্তা।
ভুক্তভোগীরা জানান, আইন অমান্যকারী মালিক-শ্রমিক এবং ত্রুটিপূর্ণ পরিবহনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে (পস মেশিনে) মামলা করার পর ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে নির্ধারিত সময় জরিমানা শোধ করা পর সার্জেন্ট কর্তৃক জব্দকৃত কাগজপত্র ফেরত পেতে দিনের পর দিন ট্রাফিক অফিস ও কুরিয়ার সার্ভিসের এ ব্রাঞ্চ থেকে ও ব্রাঞ্চে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। সময় মতো কাগজপত্র হাতে না পাওয়ায় অনেকে সময়মতো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস ফি জমা দিতে পারছে না। এতে তাদের মোটা অংকের বিলম্বিত জরিমানা (লেট ফাইন) দিতে হচ্ছে। এছাড়া জরিমানার অর্থ পরিশোধের শেষ দিনের পর গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে না থাকায়ও অনেক পরিবহন মালিক-শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে।
এদিকে ট্রাফিক সার্জেন্টরা পস মেশিন ব্যবহার করে মামলার বিবরণ ও জরিমানার পরিমাণ উল্লেখ করে যে ডিজিটাল সস্নিপ ধরিয়ে দিচ্ছেন তা নিয়েও নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা জানান, দু’চারদিন না যেতেই ওই সস্নিপের পুরো লেখা সহজেই মুছে যাচ্ছে। আর এতে ওই মামলা সংক্রান্ত তথ্য খুঁজে বের করে জরিমানা পরিশোধ করা দুস্কর হয়ে পড়ছে। এ সুযোগে ট্রাফিক অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরিবহন মালিক-চালকদের কাছ থেকে উৎকোচ আদায় করছে।
পান্না গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্টিজের প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম মৃধা জানান, তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের বীমার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় গত সেপ্টেম্বর মাসে কমলাপুরের টিটিপাড়া এলাকায় কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্ট পস মেশিনে মামলা করেন। এতে ২০ দিনের মধ্যে ইউ-ক্যাশের মাধ্যমে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে বলা হয়। অথচ ৭/৮ দিন পর তিনি ওই সস্নিপটি মানিব্যাগ থেকে বের করে দেখেন তাতে সব লেখা মুছে গেছে। পরবর্তীতে তিনি পল্টনস্থ ট্রাফিক অফিসে যোগাযোগ করলে তার মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন নাম্বার দেখে মামলার নতুন সস্নিপ দেয়া হয়। তিনি তাৎক্ষণিক ইউ-ক্যাশের মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধ করলে পরবর্তী ৪/৫ দিনের মধ্যে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে জব্দকৃত বস্নুবুক তার বর্তমান ঠিকানায় পেঁৗছে যাবে বলে জানিয়ে দেয়া হয়। অথচ এর দেড় মাস পরও কাগজপত্র হাতে না পেঁৗছায় আশিকুল ইসলাম প্রথমে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মুগদার ব্রাঞ্চ অফিস এবং পরবর্তীতে মতিঝিলের প্রধান কার্যালয়ে যান। সেখান থেকে জানানো হয়, ট্রাফিক অফিস থেকে এ কাগজ তাদের দেয়া হয়নি। পরে ট্রাফিক অফিসে গিয়ে তিনি তার মোটরসাইকেলের জব্দকৃত বস্নুবুক সংগ্রহ করেন।
আশিকুল ইসলাম জানান, মামলার নাম্বার খুঁজে পেতে এবং বস্নু-বুক সংগ্রহ করতে ট্রাফিক অফিসে তার মোটা ৬ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। এছাড়াও সেখানে কর্তব্যরত একজন কর্মকর্তা তার কাছ থেকে তিনশ টাকা ঘুষ নিয়েছে।
নরসিংদীর বাসিন্দা আরিফুর রহমান খানও পস সস্নিপের লেখা মুছে যাওয়া, দু’দফা ট্রাফিক অফিসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এবং নির্ধারিত সময়ের এক মাস পর কাগজ হাতে পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
এদিকে তৌহিদুল হাসান নামের একজন ব্যবসায়ী জানান, জরিমানার অর্থ পরিশোধ করার একমাস পরও প্রাইভেট কারের জব্দকৃত বস্নুবুক তিনি হাতে পাননি। অথচ এরমধ্যে তার ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ পার হয়ে যাওয়ায় তাকে মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হয়েছে।
ক্ষুব্ধ ওই ব্যবসায়ী জানান, তিনি বিষয়টি ডিসি ট্রাফিককে অবহিত করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার অনুরোধ জানান। তবে ডিসি এ ব্যাপারে তার কিছুই করার নেই বলে অপারগতা প্রকাশ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু আশিকুল, আরিফুর কিংবা তৌহিদুল হাসানই নন, প্রতিদিন হাজার হাজার পরিবহন মালিক-শ্রমিক এ ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগী অনেকেই ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিতও করেছেন। কিন্তু দু’বছরেও এ সঙ্কটের কোনো সুরাহা হয়নি।
ট্রাফিক পুলিশের এসি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, জরিমানার অর্থ পরিশোধের পরও জব্দকৃত কাগজ ট্রাফিক অফিস কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের প্রধান কার্যালয় বা ব্রাঞ্চ অফিসে ফেলে রাখার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়টি মনিটর করে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের একটি নজিরও নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ট্রাফিক কর্মকর্তা জানান, ডিএমপিতে প্রতিদিন গড়ে চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার যানবাহন ও চালকের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। এ হিসেবে শুধুমাত্র ইউ-ক্যাশ করেই ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক মাসে নূ্যনতম পঞ্চাশ থেকে ৬০ লাখ টাকা কমিশন পাচ্ছে। আর জব্দকৃত কাগজ গাড়ির মালিকের কাছে পেঁৗছে দিয়ে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস নূ্যনতম ২৪ লাখ টাকা ফি আদায় করছে। যার পুরোটাই গাড়ির মালিক-শ্রমিকদের পরিশোধ করতে হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ইউ-ক্যাশের মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধ করতে মাত্র আড়াইশ টাকাতেই ২৫ টাকা কমিশন দিতে হচ্ছে। এ অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কমিশনও বেশি দিতে হয়। আর প্রতিটি গাড়ির জব্দকৃত কাগজ পেঁৗছানো বাবদ গাড়ি মালিককে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসকে ২০ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ সম্পূর্ণ ডিজিটাল করতে সব ধরনের গাড়ির মামলা-জরিমানা ডিজিটাল পয়েন্ট অব সার্ভিস (পস) মেশিনে করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চীন থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ৪৫০টি পস মেশিন আমদানি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ডিজিটাল এ পদ্ধতিতে মামলা রুজুর কার্যক্রম শুরু করে।
রাস্তায় সার্জেন্টের কাছে থাকা পস মেশিনে গাড়ির নাম্বার, মামলার কারণ ও জরিমানার পরিমাণসহ সব ধরনের তথ্য এন্ট্রি করার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক ডিএমপির কেন্দ্রীয় সার্ভার ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনারের কার্যালয়ে জমা হয়।

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল