ডিজিটাল ম্যাপে খুলছে গবেষণার দুয়ার – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ডিজিটাল ম্যাপে খুলছে গবেষণার দুয়ার

প্রকাশিত: ৩:০০ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৮, ২০২১

ডিজিটাল ম্যাপে খুলছে গবেষণার দুয়ার

স্বাধীনতার পাঁচ দশকেও একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা নিয়ে সরকারি উদ্যোগে হয়নি বস্তুনিষ্ঠ কোনো গবেষণা। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ :দলিলপত্রে’র ১৫ খণ্ড প্রকাশিত হলেও প্রাসঙ্গিক বিধায় তাতে গণহত্যার পুরো চিত্র আসেনি। যেমন খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর এলাকায় সংঘটিত সবচেয়ে বড় গণহত্যার তথ্যই ওই গ্রন্থে স্থান পায়নি।

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে একাত্তরের গণহত্যা, গণকবর, বধ্যভূূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত হলেও তা একই মলাটে উঠে আসেনি কখনও। তবে এই প্রথম দেশের ২৮টি জেলায় পাওয়া তথ্যাদি নিয়ে ‘গণহত্যার জরিপ ও ডিজিটাল ম্যাপ’ প্রকাশ করেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গণহত্যা জাদুঘর।

ডিজিটাল ম্যাপে গণহত্যা জাদুঘরের উদ্যোগে পাওয়া গণহত্যার স্পটের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তি ও বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে পাওয়া স্পটও চিহ্নিত করা হয়েছে। যার সংখ্যা এখন পর্যন্ত এক হাজার ৪০০টি। যে কেউ http://mapsgenocidemuseumbd.org লিঙ্কে গিয়ে একাত্তরের গণহত্যার এই স্পটগুলোতে ক্লিক করে তথ্যাদি দেখতে ও জানতে পারবেন। এটি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য অনন্য তথ্যভাণ্ডার। ডিজিটাল ম্যাপে গণহত্যার স্থান, বধ্যভূমি, গণকবর ও নির্যাতন কেন্দ্রগুলো বিভিন্ন রঙে চিহ্নিত করা আছে।

এ প্রসঙ্গে গণহত্যা জাদুঘরের সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন সমকালকে বলেন, ‘গণহত্যায় নিহত মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার অনুসারীদের বিতর্ক করার অন্যতম প্রধান কারণ গণহত্যাকে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহের কেন্দ্রে রাখা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ শুধু বিজয়গাথা নয়; এটি বেদনারও। তাই গণহত্যা-নির্যাতন সম্পর্কে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও যেটি পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। আমরা গণহত্যার জরিপের পাশাপাশি ডিজিটাল ম্যাপ প্রণয়ন করে সে চেষ্টাই করছি।’ তার মতে, ডিজিটাল ম্যাপ প্রণয়ন শেষ হলে আর কেউ শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার দুঃসাহস দেখাতে পারবে না।

গণহত্যা জাদুঘর ২৮টি জেলা জরিপ করে এ পর্যন্ত গণহত্যার ১৩ হাজার ৮৫৪টি নিদর্শন চিহ্নিত করেছে। তার মধ্যে গণহত্যার ডিজিটাল ম্যাপে এক হাজার ২০০টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ম্যাপে আরও চিহ্নিত করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা নিয়ে ২০০০ সালে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সুকুমার বিশ্বাস রচিত ‘একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণকবর’ এবং ২০১২ সালে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধ কোষে উল্লিখিত পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার নিদর্শনগুলো। সব মিলিয়ে গণহত্যার স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে এক হাজার ৪০০টি।

জাদুঘরের ওয়েবসাইটের লিঙ্কে গিয়ে দেখা যায়, ম্যাপের ভেতর যে কোনো পিনের ওপর কার্সার রেখে ক্লিক করার সঙ্গে সঙ্গে একটি বক্স ওপেন হয়। সেখানে স্পটের একটি ছবি ফুটে ওঠে। ছবিতে আরও একটি ক্লিক করলে আরও একটি ট্যাব ওপেন হয় এবং সেই স্থানে ঘটে যাওয়া গণহত্যা অথবা নির্যাতনের ঘটনার বিস্তারিত জানা যাচ্ছে। এখানে প্রতিটি বিষয়বস্তু আলাদা করে প্রদর্শন করা হয়েছে। রয়েছে গণহত্যা জাদুঘর এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন প্রকাশনাও।

গণহত্যা জাদুঘরের উদ্যোগে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলার ১০০টি স্থানে ঘটে যাওয়া একাত্তরের গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবর নিয়ে ১০০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া প্রকাশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জীবনী, মুক্তিযুদ্ধে স্থানীয় বাহিনী, শরণার্থীদের নিয়ে পৃথক গ্রন্থ। গণহত্যার ডিজিটাল ম্যাপ ইতোমধ্যে গুগল ম্যাপে যুক্ত করতে উদ্যোগ নিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই কার্যক্রম সফল হলে গুগল ম্যাপের সহায়তায় বাংলাদেশের গণহত্যার তথ্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। এ ছাড়া চিহ্নিত প্রতিটি গণহত্যা, গণকবর ও বধ্যভূমি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুক্তবিশ্বকোষ ‘উইকিপিডিয়া’য় কনটেন্ট তৈরির কাজও শুরু হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আশির দশকে স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবু মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত অনেক তথ্য-উপাত্ত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন অন্তত জাতীয় ইতিহাসের স্বার্থে তথ্য-উপাত্তগুলো ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা উচিত। তাহলে মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা আরও বিস্তৃত হবে এবং তরুণ প্রজন্মও ইতিহাসের সত্য জানতে পারবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগ্রহ রয়েছে। এ জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় তাদের আগ্রহ ধরে রাখা যাচ্ছে না। বর্তমানে বিশ্বের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে একাত্তরের গণহত্যা পড়ানো হচ্ছে। একাধিক বিদেশি গবেষকও একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করছেন। দেশে ২০১০ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ নামে একটি অনুষদ খোলা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণহত্যা বিষয়টি পড়ানো হয় না। তবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ২০১৪ সালে ‘সেন্টার ফর স্টাডি অন জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস কোর্স’ এবং গণহত্যা জাদুঘরের উদ্যোগে ২০১৭ সালে ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১’ পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ট্রেনিং (পিজিটি) কোর্স চালু রয়েছে। যার মধ্যে গণহত্যা জাদুঘরের উদ্যোগে সাতটি ব্যাচে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে প্রায় ৫০০ জনকে। এ ছাড়া গণহত্যা জাদুঘরের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ ফেলোশিপ চালু করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে গণহত্যা নিয়ে এখনও দৃশ্যমান কোনো গবেষণাকাজ শুরু হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্নিষ্টরা মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কী ধরনের কাজ হতে পারে, সেটিই হয়তো ভেবে দেখেননি। কিন্তু এখানে নানা বিষয়ে অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী  বলেন, ‘গণহত্যা জাদুঘর যে কাজগুলো শুরু করেছে সেটি অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। কারণ সারাদেশে এমন কোনো জেলা ও উপজেলা নেই; যেখানে বধ্যভূমি নেই, মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন নেই। এগুলো চিহ্নিত করে সংরক্ষণের গুরুত্ব অনেক।’

তিনি আরও বলেন, ‘গণহত্যার ঘটনায় বলতে গেলেই দুটি বিষয় উঠে আসে। এক. পাকিস্তানিদের নৃশংসতা এবং দুই. শহীদ পরিবারগুলোর দুঃখ-বেদনা। তা ছাড়া এখন মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন আমাদের সামনে এসেছে। এ জন্য গণহত্যার যথেষ্ট গবেষণা প্রয়োজন। যাতে প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণও থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে গবেষণায় যাতে চৌর্যবৃত্তি না হয়, সেদিকেও সজাগ থাকতে হবে। নয়তো গবেষণার উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।’

গণহত্যার গবেষণা প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, ‘গবেষণাকাজ বেসরকারি উদ্যোগে হলেই ভালো হয়। এসব খাতে কেউ সহযোগিতা চাইলে মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ‘মন্ত্রণালয় যতটা সম্ভব গণহত্যা জাদুঘরসহ এ ধরনের কাজ যেসব প্রতিষ্ঠানে রয়েছে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিক। এটি অব্যাহত থাকবে।

SR