ডিবি পরিচয়ে প্রতারক চক্র : অাপনার করণীয়? – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ডিবি পরিচয়ে প্রতারক চক্র : অাপনার করণীয়?

প্রকাশিত: ৩:১২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮

ডিবি পরিচয়ে প্রতারক চক্র : অাপনার করণীয়?

গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ/থানার সিভিল টিম/র‌্যাব/ সেনা সদস্য পরিচয়ে গুম, চাঁদাবাজি, হত্যাকান্ড সহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে ; এমন তথ্য বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতেই বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু এর বাইরেও যে, কিছু অজানা কারণ থাকতে পারে সেটা নিয়েও সন্দেহের ঘাটতি নেই। ঘটনাগুলো প্রতিরোধে অাইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজনীয় চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও জনগণ নিরাপদ নয় ; ঢাকা সহ সারাদেশে বিগত কিছুদিনের ব্যবধানে ভুয়া পুলিশের পাল্লায় পড়ে সাদা পোশাকে বেশ কয়েকটি তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, ফলশ্রুতিতে অাইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবিরাম প্রচেষ্টায় বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করা গেলেও অনেকেই এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ; এমতাবস্থায় একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে অামাদের প্রত্যেকেরই কিছু করণীয় থাকা উচিত ; প্রথমত, অাপনাকে সর্বাবস্থায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে। সেক্ষেত্রে অতি সাধারণ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী-
(ক) যানবাহন ব্যবহারে সতর্কতা :

১. লোক সমাগম কম এমন জায়গায় একা গমন করা যাবেনা।

২. গণপরিবহন ব্যতীত যেকোন যানবাহন ব্যবহারে অাপনাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন : সিএনজি/অটোরিকশায় ওঠার পূর্বে অাপনাকে খেয়াল রাখতে হবে সেখানে অাগে থেকেই সন্দেহভাজন কেউ বসে অাছে কিনা? অাপনি যেখানেই যাতায়াত করেন না কেন, পরিবারের সদস্যদের অবগত রাখতে হবে ; গাড়িতে ওঠার পূর্বে প্রয়োজনে গাড়ির নম্বরের ছবি তুলে অথবা এসএমএসের মাধ্যমে সেটি অাপনার নিকট অাত্মীয়দের মোবাইলে পাঠানো উচিত।

৩. গাড়িতে অপরিচিত ব্যক্তির নিকট থেকে খাবার/পানীয় গ্রহণে বিরত থাকবেন, ধূলাবালি এবং ছোট্ট কয়েকটি রাসায়নিক দ্রব্য প্রতিরোধে মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।
৪. অাপনার সেলফোন, মানিব্যাগ অথবা অন্য যেকোনো বস্তু সর্বদা নিজ দায়িত্বে রাখবেন ; বাসা থেকে বের হওয়ার পূর্বে মোবাইল ফোনের চার্জ, নিজের পরিচয়পত্র সহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সাথে রাখবেন।
৫. কেউ যদি মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে সন্দেহজনক অাচরণ করে, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সহযোগিতা চাইবেন এবং প্রয়োজনে গাড়ি থেকে নেমে পড়ার চেষ্টা করবেন ; মোটা অংকের টাকা নিয়ে যাতায়াতকালে পুলিশী সাহায্যের জন্য অাবেদন করতে পারেন।
৬. সন্দেহজনক মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী হতে সতর্ক থাকবেন ; প্রয়োজনে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মোকাবেলায় হাতে সময় থাকলে জাতীয় হেল্পলাইন ৯৯৯ ব্যবহার করতে পারেন।
৭. অাপনার সেলফোনে নিকটস্থ থানা, সিটিতে অবস্থান করলে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের নাম্বার সাবধানতার সহীত সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন, র্যাবকে অপরাধ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য দিতে অথবা সহযোগিতা পেতে স্মার্টফোনের Play Store হতে Report 2 RAB অ্যাপটি ডাউনলোড করে রাখতে পারেন, যা অাপনার বিপদের মুহূর্তে কাজে লাগবে। অাইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ইনফর্ম করার পর যথাসম্ভব অাপনার সেলফোন অন রাখার চেষ্টা করবেন।

(খ) সন্দেহভাজন ডিবি ইস্যুতে সতর্কতা :

১. অাপনি কোনো অপরাধ করেন নি, অথচ হঠাৎ একদল লোক পুলিশী পরিচয়ে অাপনার বাসায় ঢুকলো অথবা রাস্তাঘাটে গাড়ি থামিয়ে অাপনাকে অাটক করতে চাইলো অথবা অন্য যেকোনো স্থানে অাপনাকে গ্রেফতার করতে চাইলো ; তখন অাপনি কি করবেন?
প্রথমত, বর্তমান সময়ে ভুয়া পুলিশ চেনা সাধারণ জনগণের পক্ষে অনেকটাই কঠিন, ভুয়া পুলিশ যথেষ্ট স্মার্ট ও অভিনব কায়দায় মানুষকে প্রতারিত করতে পছন্দ করে, ক্ষেত্রবিশেষে অাইনশৃঙ্খলা বাহিনী হতে বহিষ্কৃত সদস্যরাও এই ধরণের কর্মকান্ডে অংশ নেয় বিধায় তারা নিয়মকানুন সম্পর্কে বেশ ভালোই জানে এবং তাদের অাচরণেও কিছু কমন পয়েন্টস লক্ষ্য করা যায়, তাছাড়া তারা সাধারণ ডিবির মতোই ডিবি লিখা জ্যাকেট, বাঁশি, হ্যান্ডকাফ, লাঠি, ওয়াকিটকি,পিস্তল এমনকি তাদের হেয়ার কাট দেখলেও অাপাত দৃষ্টিতে মনে হবে তারা সত্যিকারের ডিবি ; অাজকাল অনেক অাইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও কতিপয় ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থে এসব অপরাধকে নানাভাবে সাপোর্ট করে , যা তীব্রভাবে নিন্দনীয়। তারপরও এমন পরিস্থিতিতে অাপনার উচিত, অাগত সদস্যের পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়া, সাধারণত সাদা পোশাকে পুলিশ কোনো অভিযান পরিচালনা করলে অবশ্যই গায়ে জ্যাকেট পরিধান করবে ও গলায় পরিচয়পত্র ঝোলানো থাকবে, ভুয়া পুলিশের ক্ষেত্রে অনেক সময় দুটোর একটি মিসিং হতে পারে ; নজর রাখুন তাদের ব্যবহৃত ওয়াকিটকির দিকে, দেখুন চালু অাছে কিনা ; তাদের চোখে চোখ রাখুন, সেইসাথে লক্ষ্য রাখুন তাদের আচরণে উগ্রতা বা রুক্ষভাব পরিলক্ষিত হয় কি না? ; খেয়াল করে দেখুন তারা লং অার্মস ব্যবহার করছে কি না, যদি মোটামুটিভাবে ধরতে পারেন যে তারা মেকি পিস্তল ব্যবহার করছে তাহলে অন্যদের সহায়তা নিয়ে তাদের প্রতিহত করুন এবং নিকটস্থ থানায় সোপর্দ করুন।
২. সাধারণ ভুয়া ডিবি অাপনাকে গ্রেফতার করতে চাইলে সবার প্রথমেই অাপনার সেলফোন হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে, যদিও পুলিশ সদস্যরা সাধারণত অপরাধ সাব্যস্ত হওয়ার পর অাসামীর লিখিত স্বাক্ষর গ্রহণ করে একসাথে টাকা পয়সা সহ সকল দ্রব্যাদি জমা রাখেন ; এমতাবস্থায় সন্দেহ হওয়া মাত্রই অাপনার উচিত হবে যতজন সম্ভব লোকজন জড়ো করা, পুলিশ সদস্যদের পরিচয় জানতে চাওয়া এবং কি কারণে অাপনাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে তার স্পষ্ট ব্যাখা জানতে চাওয়া, প্রয়োজনে তাদের নিকট কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা অাছে কিনা তা জানা, যা অাপনার সাংবিধানিক অধিকার ; সম্ভব হলে ছবি তুলে রাখুন, সাদা পোশাকের সদস্যরা যদি অাপনার এলাকায় এসে অাপনার বাসায় প্রবেশ করে তাহলে নিকটস্থ থানায় কল করে জেনে নিন তারা এ ব্যাপারে অবগত কিনা ?
সন্দেহজনক অবস্থায় পতিত হলে, অাপনি বলবেন অাপনি তাদের সাথে একা যাবেন না, অারো দুজন মানুষ নিয়ে যেতে চান (বিশেষত, অাপনি যখন ছাত্র) ; বাইরে থাকলে যতদূর সম্ভব লোক সমাগমের উপস্থিতিতে চেষ্টা করুন ব্যাপারটি সম্পর্কে অাপনার পরিবারকে অবহিত করার ; প্রয়োজনে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করুন এবং Report 2 RAB অ্যাপসের সহযোগিতা নিয়ে নিকটস্থ র্যাব কন্ট্রোল রুমের সহযোগিতা নিন।

৩. আপনার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ দেখাতে না পারলে আপনাকে বিশেষ অাইন ৫৪/৫৭ ধারায় গ্রেফতার করতে চাইবে, কিন্তু মনে রাখবেন এক্ষেত্রেও তারা তাদের পরিচয়পত্র দেখাতে এবং অভিযোগ সংক্রান্ত স্পষ্ট ব্যাখা দিতে বাধ্য থাকিবে। শুধু তাই নয়, অাপনার শরীরে কোনো অাঘাত থাকলে প্রথমে অাপনাকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং চিকিৎসক সনদ গ্রহণ করতে হবে ; অাইনত এই অবস্থায়ও অাপনি পরিবারের সাথে ফোনে কথা বলার সুযোগ চাইতে পারেন, যেই সুযোগ মেকি পুলিশ অাপনাকে দিবে না।
৪. সকল তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যদি পুলিশ সদস্যদের সঠিক মনে করেন, তবে অাপনার সংশ্লিষ্ট অধিকার রক্ষা করে, অাপনার পরিবার, অাইনজীবী সহ অন্যান্যদের অবগত রেখে পুলিশকে সহযোগিতা করুন ; ভুলবশত অাপনাকে গ্রেফতার করা হলে জিজ্ঞাসাবাদে অাপনি সসম্মানে বেরিয়ে অাসবেন।
৫. ডিবি সদস্যরা সন্দেহবশত অথবা ৫৪ ‘র বিশেষ ক্ষমতাবলে হাইকোর্টের বিধি মোতাবেক অাপনাকে গ্রেফতার করলে সাধারণত প্রথমে ডিবি কার্যালয়ে অথবা নিকটস্থ কোনো পুলিশ ফাঁড়িতে এবং থানা পুলিশ গ্রেফতার করলে নিকটস্থ থানায় নিয়ে যাবে ; যদি অভিযোগটি অাপাত বিবেচনায় সত্য মনে হয়, তবে অবিলম্বে অাপনি অাইনজীবীর সাথে দেখা করার সুযোগ চাইতে পারবেন, এক্ষেত্রেও চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আপনাকে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চালান করতে হবে এবং অাপনার কোনো অাত্মীয়কে ইনফর্ম করতে হবে, চব্বিশ ঘন্টা পর ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া পুলিশ আপনাকে আটক রাখতে পারবে না।
৬. সর্বোপরি আপনার নিজের নিরাপত্তা ও এসব প্রতারণাকারী চক্রের হাত থেকে বাঁচতে সবসময় নিজের বুদ্ধি-বিবেক এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা প্রয়োগ করুন এবং এ জাতীয় ঝামেলার মুখোমুখি হলে কৌশলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অথবা নিকটস্থ থানায় অবহিত করুন।
কেউ নিখোঁজ থাকলে পার্শ্ববর্তী থানায় যোগাযোগ করবেন, যদি পাওয়া না যায় তবে জরুরী ভিত্তিতে উচ্চ অাদালতে রীট দাখিল করতে হবে।

মনে রাখবেন-

সাদা পোশাকে গ্রেফতার নয়,

তবুও যদি এমন হয় ;

জানতে হবে,
অাইন মানতে হবে।
অাসুন, অামরা প্রত্যেকে সুনির্দিষ্ট অাইন মেনে চলাচল করি, সেইসাথে অাইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই ; যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধেে সতর্ক থাকি এবং সচেতনতামূলক তথ্যসমূহ অপরের সাথে শেয়ারের মাধ্যমে নিজেদের/অন্যদের নিরাপদ রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখি।

লেখক : এফ এইচ ফারহান, কলামিস্ট ।