তাহিরপুরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হিন্দু বাড়িতে প্রকাশ্যে হামলা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

তাহিরপুরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হিন্দু বাড়িতে প্রকাশ্যে হামলা

প্রকাশিত: ১০:২০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০২১

তাহিরপুরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হিন্দু বাড়িতে প্রকাশ্যে হামলা

 

তাহিরপুর প্রতিনিধি ::

তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের টাকাটুকিয়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বাড়িতে বুধবার দুপুরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে হামলা করেছে পার্শ্ববর্তী টুকেরগাঁও (মুসলিম পাড়া) গ্রামের একদল লোক। মেয়েদেরকে উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় গ্রামীন সালিশ বিচার নিয়ে পূর্ববিরোধের জের ধরে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।

হামলাকারীরা শুকিয়ে যাওয়া বৌলাই নদী পাড়ি দিয়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাড়িতে আসতে দেখে দেবেন্দ্র বর্মণের বাড়ির লোকজন পালিয়ে যাচ্ছিল।

এ সময় তাদেরকে পেছন দিক থেকে তাড়া করে হামলা করা হয়। হামলায় আহত হয়েছেন চার জন। এদের মধ্যে ৩ জনকে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে জেলা শহরে প্রেরন করা হয়েছে। অন্য একজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

তবে তাহিরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অস্টম শ্রেণির ২ ছাত্রী ও জয়নাল আবেদীন কলেজের এক ছাত্রীর ওপরও তারা হামলা করেছে। ঘটনাস্থল টাকাটুকিয়া গ্রাম উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটারেরও কম দুরত্বে অবস্থিত।
প্রকাশ্যে এমন ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়েছেন তাহিরপুরবাসী। আর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

আহতরা হলেন টাকাটুকিয়া গ্রামের দেবেন্দ্র বর্মণের ছেলে বাছিন্দ্র বর্মণ (৪৫), সঞ্জিত বর্মণ (২৪) , বাছিন্দ্র বর্মণের স্ত্রী বিউটি রাণী বর্মণ (৩২) এবং ছেলে বাবলু বর্মণ (১৫)। তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা মির্জা রিয়াদ হাসান জানান, সঞ্জিত বর্মণ ছাড়া সবাইকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা শহরে পাঠানো হয়েছে। সবার পিঠে, হাতে ও মাথায় গুরুতর জখম রয়েছে।

দেবেন্দ্র বর্মণের ছেলে সত্যেন্দ্র বর্মণ (৩৮) জানান, তারা যৌথ পরিবার। দীর্ঘদিন ধরেই স্কুল ও কলেজে আসা যাওয়ার পথে বাড়ির তিনটি মেয়েকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল পাশের গ্রামের কয়েকজন তরুণ । এ নিয়ে একাধিকবার সালিশ হয়েছে।

এ ঘটনার জের ধরে আজ (গতকাল বুধবার) দুপুরে টুকেরগাঁও (মুসলিম পাড়া) গ্রামের ৬০ থেকে ৭০ জন লোকজন আমাদের প্রাণ নাশ করতে বাড়িতে হামলা করে। তিনি বলেন, আমরা পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছি। তবুও ঘরের ভেতর ঢুকে হামলা করে। বাড়ির মেয়েদেরকে আঘাত করেছে।

এলাকাবাসী ও পরিবারের লোকজন জানায়, হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছে টুকেরগাঁও গ্রামের বিল্লাল মিয়ার ছেলে মুছা মিয়া(২১), শহীদ মিয়ার ছেলে রুহিত মিয়া (২২), মুক্তার মিয়ার ছেলে কাশেম মিয়া (২১), পাভেল মিয়া।

গ্রামবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, গত দুই বছর ধরে স্কুল ও কলেজে যাওয়া আসার পথে টাকাটুকিয়া গ্রামের দেবেন্দ্র বর্মণের বাড়ির তিন জন মেয়েকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল পার্শ^বর্তী টুকেরগাঁও গ্রামের কয়েকজন যুবক। টাকাটুকিয়া ও টুকেরগাঁও (মুসলিম পাড়া) গ্রাম দুইটি পাশাপাশি। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা বৌলাই নদীর পশ্চিমপাড় হচ্ছে টাকাটুকিয়া। আর পূর্বপাড় হচ্ছে টুকেরগাঁও গ্রাম। মরা নদী বৌলাই’র এপার ওপার হলো তাদের বাড়ি।

টাকাটুকিয়া গ্রামের সাহারুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ বাড়ির মেয়েদেরকে স্কুল কলেজে যাওয়া আসার পথে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে আসছিল টুকেরগাঁও গ্রামের চিহিৃত কয়েকজন যুবক। এ ঘটনায় কয়েকবার সালিশ হয়েছে। কিন্তু কোন কিছুই এদের থামাতে পারছিল না।

একই গ্রামের ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল চালক সুহেল মিয়া বলেন, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার কারণে গ্রাম থেকে আমরা একাধিক দিন তাড়িয়ে দিয়েছি।

আক্রান্ত পরিবারের আত্মীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক,টুকেরগাঁও (হিন্দু পাড়া) গ্রামের বাসিন্দা নারায়ণ বর্মণ বলেন, ইজ্জত আর জানের ভয়ে নানা অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছি। এলাকাবাসী বিচার সালিশ করেছে কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টাকাটুকিয়া গ্রামের বাসিন্দা জানান, শালিস বিচারের কারণেই বিক্ষুব্ধ হয়ে হামলা করেছে এ সকল তরুণ ও তাদের স্বজনরা।

তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন বলেন, বিগত ১৫ বছর আগেও আজকের(গতকালের) হামলাকারী পরিবার হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করেছিল। আজও একই পরিবারের নেতৃত্বে ৬০ থেকে ৭০ জন মানুষ নদী পার হয়ে দেবেন্দ্র বর্মণের বাড়ির ঘরের ভেতর ঢুকে হামলা করেছে। ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় দৌড়ে এসে ঘরের ভেতর তারা হামলা করে। এমন একেকটি ঘটনা আমাদের দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি, অর্জন নষ্ট করে দেয়। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি চাই।

তাহিরপুর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ তরফদার বলেন, ইভটিজিং নিয়ে বহু আগের বিরোধ ছিল। আজো সঞ্জিত বর্মণের সাথে মুছা, রুহিত ও কাশেমের ঝগড়া হয়। আর এ ঘটনার প্রেক্ষিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি এই মুহুর্তে শান্ত রয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল