ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদ-উল-আযহা আজ : সিলেটে ঈদের জামাত – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদ-উল-আযহা আজ : সিলেটে ঈদের জামাত

প্রকাশিত: ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১, ২০২০

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদ-উল-আযহা আজ : সিলেটে ঈদের জামাত

নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ শনিবার মুসলিম উম্মাহর বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। বৈশ্বিক করোনা মহামারির মধ্যে ভিন্ন মাত্রা ও আবহে এ বছর আসছে এই ঈদ। করোনার প্রভাব ঈদ পালনের অনুষঙ্গগুলোর ছন্দপতন ঘটাচ্ছে। উত্সবের সেই রোশনাই, বর্ণচ্ছটা ম্রিয়মাণ হয়ে আছে। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগ ও অনুপম আদর্শের প্রতীকী নিদর্শন হিসেবে কোরবানির রেওয়াজ। পবিত্র হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে বিশ্ব মুসলিম ময়দানে নামাজ আদায়ের পর যার যা সাধ্য ও পছন্দ অনুযায়ী পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। আরবি আজহা এবং কোরবান উভয় শব্দের অর্থ হচ্ছে উত্সর্গ। কোরবানি শব্দের উত্পত্তিগত অর্থ হচ্ছে আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, নিজেকে বিসর্জন, নৈকট্য লাভের চেষ্টা, অতিশয় নিকটবর্তী হওয়া প্রভৃতি।

সুরা হাজ্জে বলা হয়েছে, ‘এগুলোর (কোরবানির পশুর) গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, কিন্তু তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে যায়।’ আল্লাহর বান্দারা কে কতটুকু ত্যাগ ও খোদাভীতির পরিচয় দিতে প্রস্তুত এবং আল্লাহপাকের নির্দেশ পালন করেন তিনি তা-ই প্রত্যক্ষ করেন কেবল। প্রত্যেক আর্থিক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি দিল না, সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে (মুসনাদে আহমদ)। আল কোরআনের সুরা কাউসারে বলা হয়েছে, ‘অতএব, তোমার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো।’ সুরা হাজ্জে বলা হয়েছে, ‘কোরবানি করার পশু মানুষের জন্য কল্যাণের নির্দেশনা।’

জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের যে কোনো এক দিন কোরবানি করা যায়। কোরবানিকৃত পশুর তিন ভাগের এক ভাগ গরিব-মিসকিন, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার বিধান আছে। আবার পুরোটাই বিলিয়ে দেওয়া যায়। এদিকে ৯ জিলহজ ফজরের নামাজের পর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তালবিয়াহ পাঠ করা ওয়াজিব। তালবিয়াহ হলো, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’

হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক জাতির বাৎসরিক আনন্দ-ফুর্তির দিন আছে। এই দিনে ধনী-গরিব, বাদশা-ফকিরনির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে ঈদের নামাজ আদায় করে, একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে। ঈদ মুসলিম উম্মাহর জাতীয় উত্সব। আজ থেকে ঈদুল আজহা উপলক্ষে তিন দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে।

দেশবাসীকে পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা এ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

১ আগস্ট শনিবার সিলেটসহ সারাদেশে উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর ত্যাগে ভাস্বর হওয়ার দিন।  ত্যাগে উজ্জীবিত হওয়ার অনন্য এক দিন ঈদুল আযহা। মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব। এদিন সামর্থ্যবানরা পশু কুরবানি করে থাকেন। রাসূল সা. বলেছেন কুরবানি মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম আ. এর সুন্নত। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে হজরত ইবরাহিম আ. আল্লাহর সুন্তুষ্টির জন্য তার ছেলে হজরত ইসমাঈল আ. কে যে কুরবানির করতে যান, সেই স্মৃতির সম্মানে তখন থেকে এই কুরবানির প্রচলন।
ঈদুল আজহা একটি উৎসব দিন হলেও এবার সেই রেশ নেই। আজ এমন এক সময়ে ঈদ পালিত হবে যখন করোনা নামক এক মহামারী প্রায় অচল করে দিয়েছে বিশ্ব। তাই অন্যান্য বারের তুলনায় এবার উৎসবের আমেজ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
স্বল্প আয়ের দেশ হিসেবে সেই রেশ বেশ শক্তভাবে বাংলাদেশের উপর এসে পড়েছে। কমে গিয়েছে লোকজনের আয়, চাকরি ব্যবসা নেই অনেকের। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড়ো একটা অংশ এখন বেকার। এই অবস্থায় এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ পালিত হচ্ছে ঈদুল আজহা।
কুরবানির সময়ের এই চিত্র বিগতদিনে আর কখনো এইভাবে দেখা যায়নি। অনেকই এবার কুরবানি দিতে পারছেন না। যারা কুরবানি দিয়ে থাকেন তাদের কুরবানির টাকার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আসে প্রবাস থেকে। এবার প্রবাস থেকে অন্যান্য বারের মতো টাকা আসেনি। ফলে প্রবাসের টাকা না আসা কিংবা কম আসা আর আয় কমে যাওয়ায় যারা একান্ত কুরবানি দিচ্ছেন তাদেরও এবার সীমিত পরিসরে কুরবানি দিতে হচ্ছে।
প্রতিবছর ঈদের আগে রাস্তায় জোরে হাঁক দিয়ে গরু নিয়ে যেতে দেখা যেতো লোকজনদের। এবার আগের মতো চোখে পড়েনি কুরবানির ঈদের সেই চিরচেনা চিত্র। বাজারে গরু উঠেছে কিন্তু ক্রেতা নেই। বেপারীরা চাতকের মতো অপেক্ষায় শেষ মুহূর্তে হলেও যদি কাক্সিক্ষত মানের ত্রেতা পান সেই আশায়। এরউপর একমাসের মধ্যে টানা তিনবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন খামারিরা। তাছাড়া যারা সারাবছর ব্যক্তি উদ্যোগে পশুপালন করেন কুরবানিতে একটু ভালো লাভের আশায়, তারাও বন্যার জন্য আগেবাগে তাদের পশু নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিতে হয়েছে। শহরে যারা থাকেন তাদের অনেকের কয়েকমাসের বাসাভাড়া বাকি, নিত্যপণ্যের দোকানে বাকি। এই অবস্থায় বাকি রেখে কুরবানির কথা তারা চিন্তাও করতে পারছেন না। চাকরি কিংবা কাজ না থাকায় অনেককেই শহর ছেড়ে পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রামে চলে যেতে হয়েছে।
ফলে শহরে কমেছে কুরবানির সংখ্যা, কমছে কুরবানির পশু কেনার হারও। করোনার এই সময়ে সবচেয়ে নাকাল অবস্থায় মধ্যবিত্তরা। এইশ্রেণি সাধারণত চাকুরি, ছোটোখাটো ব্যবসা ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল। করোনায় তাদের সেই আয় প্রায় শূণ্যের কোঠায়। অনেকের কর্মক্ষেত্রের বকেয়া পাওনাও বাকি, মালিক পক্ষের হদিস নেই। ফলে অন্যান্য সময় তারা হয়তো ছাগল কিংবা ভাগে গরু কুরবানি দিতেন। কিন্তু বর্তমানে জীবনমান নিয়ে তাদের বেঁচে থাকাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাই কুরবানি তাদের জন্য আকাসকুসুম স্বপ্ন। সবকিছু ছাপিয়ে বর্তমানে এমন এক সময় যাচ্ছে যেখানে বেঁচে থাকাটাই যেন সবচেয়ে বড়ো বাস্তবতা। এই বাস্তবতা ছাপিয়ে ঈদ কিংবা কুরবানি সবাইকে অন্যান্য বারের মতো স্পর্শ করবে সেই চিন্তার সুযোগ নেই। তারপরও মানুষ আশায় বাঁচে। করোনার এই করাল গ্রাস একদিন থেমে যাবে।
আবার অশ্রুসজল চোখে দেখা দেবে আনন্দের ঝিলিক। কেটে যাবে বেদনার কালো মেঘ। কবির ভাষায় মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে। যেমন সূরা আলাম নাশরাহ এর ৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই কষ্টের পর রয়েছে সুখ। সেই প্রত্যাশায় এবারে ঈদ যেমন হোক আগামীর দিনগুলো যেন হয় সেই আগের মতো সুন্দর আর উৎসবমুখর। ঈদ মুবারক।

সিলেটে যখন যেখানে ঈদের জামাত

সিলেটসহ সারাদেশে শনিবার পবিত্র ঈদ-উল-আযহা উদযাপন করা হবে। মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে এখন শুধু রাত পোহানোর অপেক্ষা। একইসাথে সিলেটের বিভিন্ন এলাকার লোকদের মধ্যে আছে ঈদের জামাত কখন কোন মসজিদে হবে, সেটা জানার আগ্রহও। জানা গেছে, সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ মসজিদে ঈদের জামাত হবে সকাল ৮টায়। হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার মসজিদে সকাল ৮টায়, বন্দরবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে সকাল ৮টায়, গাজী বুরহান উদ্দিন (রহ.) মাজার মসজিদে সকাল ৯টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

নগরীর বন্দরবাজারস্থ কুদরত উল্লাহ জামে মসজিদে সকাল ৭টা, সকাল সাড়ে ৮টা ও সকাল সাড়ে ৯টায় তিনটি পৃথক জামাত অনুষ্ঠিত হবে। কোর্ট পয়েন্টে কালেক্টরেট মসজিদে ঈদের জামাত হবে চারটি। সকাল ৭টা, ৮টা, ৯টা ও ১০টায় হবে জামাতগুলো।
কাজীরবাজার মাদরাসা মসজিদে ঈদ জামাত সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশ সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ফরিদ উদ্দিনের কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
তিনি বলেন, ‘পুরো সিলেট জেলায় ৭ হাজার ১৩৩টি মসজিদ আছে। এর মধ্যে পাঞ্জেগানা মসজিদ ৮০০টির মতো। এগুলোতে ঈদ জামাত হয় না।’ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে গত ঈদ-উল-ফিতরের মতো এবারের ঈদেও সিলেটের কোনো ঈদগাহেই ঈদ জামাত হবে না।’