থানায় দামি গাড়ির ভাগাড় – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

থানায় দামি গাড়ির ভাগাড়

প্রকাশিত: ১১:২০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০১৯

থানায় দামি গাড়ির ভাগাড়

জব্দ করা গাড়িতে মশার বাড়ি
পার্টস চুরি হয়ে যাওয়ায় গাড়ি নিতে অনাগ্রহ

আহমদ মারুফ
খরস্রোতা সুরমা। তারই উপর দিয়ে বহমান ঐতিহাসিক ক্বীনব্রিজ। পাশেই সারদা হল। নয়নমোহন এমন দৃশ্যের কাছাকাছি সিলেট মডেল থানা। সাইনবোর্ড লেখা সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানা। মূল ফটকে ভেতরে ঢুকতেই ডান পাশে চোখে পড়ে বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে জব্দ করা পুরোনো গাড়ির স্তুপ। রঙ ক্ষয়ে যাওয়া ধুলিমাখা গাড়ির স্তুপ। মরিচা ধরা মোটরসাইকেল, পুরোনো টায়ার, ব্যক্তিগত গাড়ির ভাঙা অংশ। হঠাৎ দেখলে যে কারও মনে হবে এটি একটি পরিত্যক্ত গ্যারেজ। কাছে গিয়ে খেয়াল করলেই চোখে পড়ে এসব আবর্জনার মধ্যে জমে থাকা পানি আর মশা। সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানা ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে।
চরম অযতœ-অবহেলায় অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখার ফলে গাড়িগুলো নষ্ট হতে হতে ব্যবহারের অনুযোগী হয়ে যাচ্ছে। মামলা নিষ্পত্তির পর গাড়িগুলো মালিক ফেরত পেলেও তা ব্যবহার করতে পারবে কি না এনিয়ে রয়েছে সংশয়।
শুল্ক ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে আমদানি, কার্নেট ডি প্যাসেজ সুবিধা, ডিপ্লোম্যাটিক ও প্রিভিলেজ সুবিধার অপব্যবহার করে দেশে আনা হয়েছিল বিলাসবহুল গাড়ি। সিলেটের প্রবাসীদের কেউ কেউ শখের বশে, আবার কেউ কেউ আর্থিক ফায়দা নিতে এসব গাড়ি দেশে এনেছিলেন। এখন শখের বশে আনা এসব গাড়ির ঠাঁই হয়েছে সিলেটের বিভিন্ন থানার কম্পাউন্ডে। খোলা আকাশের নিচে অবহেলা অযতেœ পড়ে থাকা এসব গাড়ি থানার বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মামলায় আটক করা গাড়িও নষ্ট হচ্ছে থানা ও বনবিভাগের কার্যালয়ের সামনে।
শুল্ক গোয়েন্দাদের আটক করা বিএমডাব্লিউ, রেঞ্জ রোভার, পোরশে, পাজেরো, টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার, ল্যান্ড রোভার ও মার্সিডিজ এর মতো দামি গাড়ি রয়েছে। কিন্তু গাড়িগুলো শুল্ক গোয়েন্দা ও অন্যান্য বাহিনী হস্তুান্তর করার পর নির্দিষ্ট কোনো শেড বা অবকাঠামো না থাকায় বিভিন্ন থানার খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়েছে। জব্দ গাড়িগুলোর মামলা নিষ্পত্তি করতেও বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়। আবার অনেক সময় মালিকানা না থাকায় গাড়িগুলোর ব্যাপারে সমস্যায় পড়তে হয়।
সরেজমিনে বিভিন্ন থানা ও বনবিভাগের কার্যালয়ের সামনে দেখা দেখা যায়, উন্মক্ত স্থানে রোদ ও বৃষ্টিতে গাড়িগুলো রাখায় অনেক গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই এতে পানি জমছে। সে পানিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে মশা। এমনকি যেখানে গাড়িগুলো রাখা হয়েছে সেখানে বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় গাড়িগুলো ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার গাড়িগুলোর কোনো সিকিউরিটি ব্যবস্থা না থাকায় অনেক গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরিও হয়ে গেছে।
কোতোয়ালি থানায় দেখা যায়, থানার ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জব্দকৃত অচল গাড়ি। কোনোটির সিট নেই, কোনোটির দরজা নেই, কোনোটির চাকা চুরি হয়ে গেছে, কোনোটির আবার গ্লাস উধাও, আবার কোনোটির শুধু বডিটুকু পড়ে আছে। এগুলো এতোটাই বেহাল ও ভাঙাচোরা যে ভাঙারির দোকানে বিক্রির যোগ্য।
দীর্ঘসময় অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখার ফলে গাড়িগুলো নষ্ট হতে হতে ব্যবহারের অনুযোগী হয়ে যাচ্ছে। মামলা নিষ্পত্তির পর গাড়িগুলো মালিক ফেরত পেলেও তা ব্যবহার করতে পারবে কি না এনিয়ে রয়েছে সংশয়।
সিলেট কোতোয়ালি থানা কম্পাউন্ডে দেখা যায়, বিলাসবহুল এসব গাড়ি দিনের পর দিন পড়ে থাকার কারণে লতাপাতা এমনভাবে ঘিরে ধরেছে দেখলে মনে হবে ছোটোখাটো কোন জঙ্গল। থানার ওসির কক্ষের পাশে ও কোতোয়ালি থানার সহকারি পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সামনে দেখা যায় কোটি কোটি টাকা মূল্যের এসব গাড়ি পড়ে আছে।
এ ব্যপারে কোতোয়ালি থানার থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মালিককে গাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আদালতের নির্দেশ না পাওয়ায় এসব গাড়ি নিলামেও বিক্রি করা যাচ্ছে না। অথচ এসব গাড়ি থানার অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে রাখছে। এতে একদিকে যেমন গাড়ির মালিকরা ক্ষতিগ্রস্তু হচ্ছেন, অন্যদিকে থানার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত একযুগে সিলেটে বেশ কিছু গাড়ি আটক করে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী। এসব গাড়ি আটকের পর পরই থানায় নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর মামলাও হয়। আর মামলার পর পরই এসব গাড়ির ঠিকানা হয় বিভিন্ন থানার খোলা কম্পাউন্ডে। আর খোলা আকাশের নিচে গাড়ি থাকার কারণে এসব গাড়ি অনেকটা নষ্ট হয়ে পড়েছে। আর কিছুদিন এসব গাড়ি খোলা আকাশের নিচে থাকলে নিলামে কিনবে না বলে অনেকেই জানিয়েছেন।
২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর সিলেটের বিয়ানীবাজারের সুতারকান্দি শুল্ক স্টেশন দিয়ে অবৈধভাবে নিয়ে আসা হয় বিলাসবহুল দুটি পাজেরো গাড়ি। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দুই কোটি টাকা মূল্যের ওই দুটি গাড়ি বিজিবির বাধা উপেক্ষা করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিন ব্রিটিশ নাগরিক ভারত থেকে এদেশে নিয়ে আসেন। পরে পুলিশ ওই রাতেই নগরী থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় গাড়ি দুটি উদ্ধার করে। থানার সামনে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে গাড়ি দুটি। ফলে চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। পুলিশি তদন্তে ব্রিটিশ নাগরিক কাবুল মিয়া, আসকির আলী ও অন্তর আলী জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ পায়। মামলা থাকায় গাড়ির বিষয়ে কোনো ফয়সালা হচ্ছেনা।
২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল শুল্ক গোয়েন্দা কার্যালয়ে চিঠি দিয়ে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি একটি লেক্সাস গাড়ি রেখে যান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১১ সালে কার্নেট ডি প্যাসেজ সুবিধার আওতায় গাড়িটি এক বছর মেয়াদের জন্য সিলেটে নিয়ে এসেছিলাম। পরবর্তী সময়ে এ সুযোগ আর বৃদ্ধি করতে পারিনি। এমনকি ট্যাক্স পরিশোধের সক্ষমতা না থাকায় গাড়িটিও আর ব্যবহার করিনি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে গাড়িটি শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কাছে হাস্তুান্তর করলাম। চিঠিতে হয়রানি না করার আহবান জানানো হয়। ওই গাড়িটিও এভাবে নষ্ট হচ্ছে কোতোয়ালি থানায়। নগরীর আম্বরখানা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় তিন কোটি টাকা মূল্যের একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। সেটিও এভাবে নষ্ট হচ্ছে থানায়। গত ৭ বছরে সিলেটে বেশ কয়েকটি গাড়ি জব্দ করা হয়। বর্তমানে এসব গাড়ি খোলা আকাশের নিচে থাকায় নষ্ট হচ্ছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ৬টি থানা ছাড়াও পুলিশ লাইন মাঠে শতাধিক গাড়ি পড়ে আছে বছরের পর বছর ধরে। এক যুগ আগে আটক করা এমন গাড়িও আছে। এসব গাড়িতে লতাপাতা গজিয়েছে। অধিকাংশ গাড়ি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এমনও গাড়ি রয়েছে যার ভেতর-বাইরে লতাপাতা বাসা বেধেছে। কোন কোন গাড়ির যন্ত্রাংশ অনেকটা ক্ষয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুসা জানান, অনেক যানবাহন আলামত হিসেবে জব্দ আছে। কিছু গাড়ি আছে মালিক নেই কিংবা মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে।
এদিকে মামলা-হামলা, দুর্ঘটনা, মাদক পরিবহন, অবৈধ মালামাল বহনসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে পুলিশের হাতে আটক হয়, ট্রাক, প্রাইভেট কার, সিএনজি ও মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি। মামলা শুরু থেকে তার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত থানাগুলোতে শেড বা ছাউনিহীন খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে অযতেœ পড়ে থাকে এসব জব্দকৃত গাড়ি। এক পর্যায়ে এসব যানবাহন নষ্ট হতে হতে ব্যবহার উপযোগিতা হারায়।
চোরাই কাঠ ও মালামাল পরিবহনসহ নানা কারণে বন বিভাগ গত ১০ বছরে শতাধিক যানবাহন আটক করে। সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা থেকে বনবিভাগের লোকজন এসব গাড়ি আটক করে। বনবিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায় বেশ কিছু গাড়ি। এসব গাড়ির বিরুদ্ধে সিলেট মেট্রোপলিটন ও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা চলছে।