দেশি জঙ্গিদের বিদেশে যোগাযোগ রয়েছে, সন্দেহ নেই – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

দেশি জঙ্গিদের বিদেশে যোগাযোগ রয়েছে, সন্দেহ নেই

প্রকাশিত: ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ, মে ৬, ২০১৬

দেশি জঙ্গিদের বিদেশে যোগাযোগ রয়েছে, সন্দেহ নেই

nesadisaiদেশি জঙ্গিদের বিদেশি যোগাযোগ বা নেটওয়ার্ক থাকার কথা আবারও সরকারকে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের কর্মী জুলহাজ মান্নানসহ সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জঙ্গি কায়দায় একের পর এক হত্যার প্রেক্ষিতে বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে গেছেন ঢাকা সফরকারী দেশটির সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বিশেষ বার্তা নিয়ে গত বুধবার ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। গতকাল সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক এবং একান্ত সাক্ষাৎ ছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে তার। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা শেষে দুপুরে গণমাধ্যমের মুখোমুখিও হন তিনি। এখানে বিভিন্ন ঘটনায় আইএস বা আল-কায়েদার মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর দায় স্বীকারের বিষয় যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনায় নিয়ে থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো সন্দেহ নেই, ওই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো হয় এখানে ঘটনা ঘটাচ্ছে কিংবা এখানকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাদের একটা যোগসূত্র রয়েছে। অবস্থা যাই হোক, এই যোগাযোগ এখনই ভেঙে দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের মতো সুন্দর দেশে যাতে আন্তর্জাতিক কোনো সন্ত্রাসী  গোষ্ঠীগুলো শিকড় বিস্তার করতে না পারে সেজন্য তার দেশে সব রকম সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান মার্কিন মন্ত্রী। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৈঠকে জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভাঙতে মার্কিন সহযোগিতা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও বিষয়টি এসেছিল। সেখানে আগামী দিনে জঙ্গিদের যে কোনো আক্রমণ ঠেকাতে মার্কিন মিশন কর্মী জুলহাজ মান্নান এবং অন্য হত্যাগুলোর রহস্য উন্মোচনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব দেয়া হয়। সরকার প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ সংক্রান্ত এক টুইট বার্তায় নিশা লিখেন- ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে জুলহাজ মান্নান এবং অন্য হত্যার তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, যাতে অন্য হামলাগুলো ঠেকানো যায়।’ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকগুলোতে উপস্থিত ছিলেন এমন এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, নিশার সফরে মোটা দাগে ৪টি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। জুলহাজ মান্নানের হত্যার স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে আসা, ঘটনাটি ঢাকায় থাকা দেশি-বিদেশি মার্কিন কর্মীদের আতঙ্ক বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে, সেটি সরকারকে জানিয়ে দূতাবাসসহ সব কর্মীর নিরাপত্তা বাড়ানোর অনুরোধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনায় মার্কিনিরা টার্গেট কি-না? সেটি জানার চেষ্টা করেছেন মন্ত্রী নিশা। যে কোনো হত্যার পর আইএস বা আন্তর্জাতিক জঙ্গিরা দায় স্বীকার করে যে বার্তা দেয় তাকে যুক্তরাষ্ট্র আমলে নেয় বলে জানানো হয়েছে। এ নিয়ে দেশটির পক্ষ থেকে যথেষ্ট যুক্তি এবং তথ্য বিনিময় করা হয়েছে। বাংলাদেশে জঙ্গি বিস্ফোরণ ঠেকাতে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সেই সঙ্গে ঢাকা-ওয়াশিংটন সমন্বিত প্রয়াস চালানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। মার্কিনিদের তাগিদের জবাবে সরকারের তরফে সার্বিক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে দফায় দফায়। যুক্তরাষ্ট্রসহ সব বিদেশির নিরাপত্তায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেয়া কড়া নির্দেশনার বিষয়েও অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ধারাবাহিক চেষ্টার অংশ হিসেবে একটি চক্র ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। সেখানে মার্কিনি বা কোনো বিদেশি টার্গেট করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়নি। এখানে আইএস বা অন্য গোষ্ঠী যে দায় স্বীকার করে বার্তা প্রচার করে তা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-নিশা বৈঠকে প্রায় ১৫ মিনিট আলোচনা হয় বলে দাবি করেন সরকারের অন্য একজন প্রতিনিধি।
আইএস-এর অস্তিত্ব নাকচ: মার্কিন মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বাংলাদেশে আইএসের নেটওয়ার্ক বা যোগসূত্রের বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে বলেন, এদেশীয় সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে আমরা মার্কিন প্রতিনিধিদলকে অবহিত করেছি। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের বলেছেন, তারা এফবিআইয়ের মাধ্যমে আমাদের সহযোগিতা করতে চান। আমরা বলেছি, যেখানে এফবিআইয়ের সহযোগিতা লাগবে আমরা  সেখানে সেই সহযোগিতা নেব। আমরা তাদের এটাও বলেছি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তাদের কাছে আগাম কোনো তথ্য থাকলে সেটা যেন তারা আমাদের দেন। তাহলে আমরা সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে পারবো। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের এসব ব্যাপারে আগাম তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে মার্কিন মন্ত্রী নিশা বিসওয়াল বলেন, জুলহাজ মান্নানের হত্যাকাণ্ডে আমরা মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। তিনি মার্কিন সরকারের কর্মী ছিলেন। এরকম আরো অনেক সাহসী বাংলাদেশি যারা বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন, তাদের মৃত্যুতেও আমরা মর্মাহত। জুলহাজ মান্নানের হত্যাকারীদের খুঁজে  বের করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে সরকার যা যা করছে, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে আমাদের যেখানে সহযোগিতা করার সুযোগ আছে, সেখানে আমরা হাত বাড়িয়ে দিতে তৈরি আছি। তবে আমরা এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং  দোষীদের খুঁজে বের করার যে  চেষ্টা বা প্রয়াস চলছে, তার চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে চাই।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নিশা দেশাইর সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরো বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে সন্ত্রাস দমন এবং উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশকে সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। এ বিষয়ে নিশা বলেন, ‘আমরা সন্ত্রাস এবং উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের লড়াইয়ে বিশেষজ্ঞ এবং কারিগরি সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গুপ্ত হত্যার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিসওয়াল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ সন্ত্রাস এবং উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তথ্য আদান- প্রদান করতে পারে। সন্ত্রাস ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তিনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) নিজেও সন্ত্রাসের শিকার, তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকেই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়।’ এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট দিসওয়াল কমিউনিটি পুলিশকে শক্তিশালী করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সদস্যদের জন্য বাংলাদেশ সরকার গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে  সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে অভিবাসী বিষয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের  প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে  কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, তার সরকার সবসময়ই সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। তিনি বলেন, ‘অপরাধী-অপরাধীই, সন্ত্রাসী-সন্ত্রাসীই- তাদের কোনো ধর্ম নেই।’
যুক্তরাষ্ট্রে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ করে হত্যার যে যড়যন্ত্র করা হয়েছিলো তা ব্যাহত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য নিশা দেশাই বিসওয়ালের মাধ্যমে দেশটির সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম এবং ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া ব্লুম বার্নিকাট এ সময় উপস্থিত ছিলেন।