দেড় বছর নগর পিতা বিহীন সিলেট নগর…! – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

দেড় বছর নগর পিতা বিহীন সিলেট নগর…!

প্রকাশিত: ৪:১৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০১৬

দেড় বছর নগর পিতা বিহীন সিলেট নগর…!

sylhetcity coprকাউন্সিলরদের দ্বন্দ্বের কারণে দেড় বছর ধরে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) চলছে মেয়র ছাড়া। মেয়রের দায়িত্ব কোন প্যানেল মেয়র পালন করবেন, তা নিয়ে কাউন্সিলররা দুই ভাগে বিভক্ত। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালেও অচলাবস্থার নিরসন হয়নি। এতে নগরভবনে যেমন একধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছে, তেমনি নগরের বাসিন্দারা সিটি করপোরেশনের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলার আসামি হওয়ায় ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং একই দিন প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদীকে ওই দায়িত্ব পালন করার জন্য চিঠি দেয়। এর আগে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আরিফুল হক চৌধুরী আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে কারাগারে পাঠান আদালত।
২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। নতুন মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম সভায় যে তিন সদস্যের প্যানেল মেয়র তৈরি করা হয়, তার ১ নম্বরে ছিলেন রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্যানেল মেয়র ছিলেন যথাক্রমে সালেহ আহমদ চৌধুরী ও রোকসানা বেগম শাহনাজ। তাঁরা তিনজনই বিএনপির সমর্থক।
কিন্তু মেয়র হিসেবে আরিফুল হকের কয়েক মাস না যেতেই কাউন্সিলরদের মধ্যে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়। মেয়র আরিফুল ও প্যানেল মেয়র-১ কয়েস লোদীর মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। মেয়র একাধিকবার কাউকে দায়িত্ব না দিয়েই বিদেশে যান। সিলেটে বিএনপির রাজনীতিতে তাঁরা দুজনই এক সময় প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের অনুসারী বলে পরিচিত ছিলেন।
২০১৪ সালের ১০ জুন সিটি করপোরেশনের মাসিক সভায় প্যানেল মেয়র হিসেবে কয়েস লোদীর বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে একটি প্রস্তাব নেওয়া হয়। ৩৬ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ২৬ জনই এর পক্ষে ছিলেন। তবে প্রস্তাবটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেনি। সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, সিটি করপোরেশন আইনে মেয়র ও কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে অনাস্থার বিধান থাকলেও প্যানেল মেয়রের বিরুদ্ধে অনাস্থার বিধান নেই।
মেয়র আরিফুল হক দায়িত্বে থাকাকালেই এক চিঠিতে তাঁর অনুপস্থিতিতে প্যানেল মেয়র-২ সালেহ আহমদ চৌধুরী দায়িত্ব পালন করবেন বলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে জানান। মেয়রের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করেন প্যানেল মেয়র-১ কয়েস লোদী।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাধারণ ২৭টি কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত ৯টি নারী কাউন্সিলর পদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ পদেই জয়ী হন বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা। প্যানেল মেয়র তিনজনই বিএনপির সমর্থক হলেও মেয়রের পক্ষপাত সালেহ আহমদ চৌধুরীর দিকে।
কয়েকজন কাউন্সিলর এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে কয়েস লোদীর দ্বন্দ্বের কারণেই সিলেট সিটি করপোরেশনে সংকট তৈরি হয়েছে। কাউন্সিলররা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের কয়েকজন কাউন্সিলর কয়েস লোদীকে সমর্থন করলেও বিএনপির কাউন্সিলরদের বেশির ভাগ তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এটিকে অনেকে বিএনপির বিরুদ্ধে বিএনপির যুদ্ধ বলেও অভিহিত করেছেন।
মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তিন মাস আগে দেওয়া হাইকোর্টের নির্দেশনায় বলা হয়, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালনা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে আদালত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ১৫ দিনের মধ্যে অচলাবস্থা নিরসন করতে বলেছেন। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে প্যানেল মেয়র-২ আপিল করেছেন, যা শুনানির অপেক্ষায় আছে।
এদিকে কাউন্সিলররা গত শনিবার অনানুষ্ঠানিক এক বৈঠকে বসলেও কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। বৈঠকে উপস্থিত একজন কাউন্সিলর বলেন, তাঁরা একমত হয়েছেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দিয়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। তবে কে প্যানেল মেয়রের দায়িত্ব পালন করবেন, সে বিষয়ে তাঁরা মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেননি। কয়েকজন কাউন্সিলর তিন প্যানেল মেয়রকে সমঝোতার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে আসতে বললেও তাঁরা কেউ নিজের অবস্থান থেকে সরে আসবেন না বলেই সংশ্লিষ্ট লোকজন মনে করছেন।
এ ব্যাপারে সালেহ আহমদ চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, যেহেতু মেয়র তাঁকেই দায়িত্ব পালন করার জন্য চিঠি দিয়েছেন, সেহেতু তিনিই এর হকদার। অন্যদিকে কয়েস লোদী বলেছেন, কাউন্সিলররা সর্বসম্মতভাবে তাঁকে ১ নম্বর প্যানেল মেয়র করেছেন। অতএব, তাঁকে কেন ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে?