‘দেয়ালে হেলান দেয়া ওই জননীর চোখ দুটি কি বলছে’ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

‘দেয়ালে হেলান দেয়া ওই জননীর চোখ দুটি কি বলছে’

প্রকাশিত: ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০১৯

‘দেয়ালে হেলান দেয়া ওই জননীর চোখ দুটি কি বলছে’

ব্যক্তিগত অভিমত শেয়ার করছি। কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বলছি না। শনিবার রাত আনুমানিক ১০ ঘটিকার সময় একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম সিলেটের ‘স্পাইসি’ রেষ্টুরেন্টে। সেখানে রাতের খাবারের দাওয়াত ছিল। স্মার্টদের ভাষায় ‘ডিনার’। আমার দুজন সিনিয়র সাংবাদিক পাভেল ভাই ও বেলায়েত ভাইয়ের সাথে সেখানে যাই। আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে বিলাশবহুল চেয়ারে বসিয়ে আমাদের সামনে খাবার পরিবেশন করা হল। অনেক রিচ ফুড ছিল। যা কখনও গরীবদের সাহসের অন্তর্ভূক্তি হবেনা। কারণ তাদেরকে তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কথা মাথায় রাখতে হয়। সেখানে যাওয়ার পর দেখলাম কনসার্ট চলছে। আমাদের অপেক্ষা করতে হল খাবারের জন্য। সচরাচর আমি কনসার্ট তেমন একটা পছন্দ করি না। কিন্তু অন্যের খুশিতেও বাঁধা দিতে পারিনা। চলে গেলে মন খারাপ হয়ে যাবে যার দাওয়াতে আসলাম। চলে না গিয়ে বসে রইলাম সেখানে।
আমার একটি অভ্যাস আমি সবসময় বয়সের চাইতেও বেশি চিন্তা করি। সামর্থ্য নেই কিন্তু গরিব, অসহায়, বঞ্চিত, নির্যাতিতদের কথা চিন্তা করে রাতে ঘুমটাও পর্যন্ত ঠিকমতো হয়না। আমি যখন কাউকে এই কথাটা বলি তখন বিশেষ করে মুরব্বিরা আমাকে বলেন, ‘বাবা আল্লাহ সবাইকে সবকিছু দান করেন না। তিনি তোমার মন দিয়েছেন কিন্তু ধন দেননি।’
বসে থাকা অবস্থায় হঠাৎ আমার চোখ একজন বিষণ্ন মনে বসে থাকা মহিলার দিকে পড়ল। তিনি বয়সে আমার মায়ের মতো হবেন। কনসার্টে যারা গান গাইছিলেন এবং বিত্তবান যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের দিকে চেয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিলেন তিনি ওয়াশরুমের পাশে। দেখছিলেন সেখানে এসে উপস্থিত হওয়া বাবা-মায়ের সাথে ছোট্ট শিশু সন্তান, ছেলে মেয়েদের আনন্দঘন মূহুর্ত। কি ভাবছিলেন তিনি….!
উনার সাথে আমার কথা হয়নি। তবুও অসহায়দের সেই কষ্টের অনুভূতি থেকে বলছি। উনি দেখছিলেন আর ভাবছিলেন আমার পড়নে যদি দামি পোশাক থাকতো আমি তাদের সাথে বসতে পারতাম, আমার সন্তানদেরকে নিয়ে এখানে এসে উপস্থিত হতে পারতাম। তাকিয়ে ছিলেন ঐ শিল্পীদের দিকে যারা গান গাইছিল। একটা বিষয় উপলব্দি করলাম মানুষই যতই গরীব হোক তার মনও আনন্দ চায়। কিন্তু সে তার সামর্থ্য দিয়ে সেটা করতে পারেনা। তিনি আফসোস করেন আর চিন্তা করতে থাকেন আমিও যদি আমার সন্তানদের এভাবে নিয়ে আসতে পারতাম।
এখানে আমি প্রতিষ্ঠানকে কোনো দোষারোপ করছিনা। অনুষ্ঠান শেষে তিনিও সেখানে রাতের খাবার খাবেন। আমি শুধু উনার বিষণ্ন মনের কথা তুলে ধরলাম। তবে পার্থক্য শুধু একটাই থাকবে যখন উনি খাবারটা খাবেন তখন তিনি ওইসব বিত্তবানদের পাশে বসতে পারবেন না। একা অথবা সাথের যারা শ্রমিক তাদের সাথেই খেতে হবে। আবার অনেকসময় দেখা যায় তিনি নিজে না খেয়ে সন্তানদের জন্য নিয়ে যান।
আমাদের এই সমাজে এরকম লোক শুধু এই এক জায়গায় নয়, প্রতিনিয়ত প্রতিমূহুর্ত তাদেরকে দেখা যায় প্রত্যেক জায়গায়। তাদেরকে দেখা যায় সবজি বাজারে, মাছ বাজারে, দামি শপের বাইরে। তবে প্রয়োজন মেটানোর জন্য নয় তারা শুধু আফসোস করতে থাকে।
আমাদের সমাজে যারা বিত্তবান রয়েছে তাদের প্রতি একটিই অনুরোধ আপনারা একটু সুনজর আর দায়িত্বশীল হন তাদের প্রতি। এই সমাজটা বদলে যাবে।

লেখক : মো.নাঈমুল ইসলাম
সাংবাদিক

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল