দ্বিতীয় প্রয়াণ দিবস : অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদ; সিলেটের নারী শিক্ষার অগ্রদূত – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

দ্বিতীয় প্রয়াণ দিবস : অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদ; সিলেটের নারী শিক্ষার অগ্রদূত

প্রকাশিত: ৪:৩১ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৫, ২০২০

দ্বিতীয় প্রয়াণ দিবস : অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদ; সিলেটের নারী শিক্ষার অগ্রদূত

ফরিদা নাসরীন

সুশিক্ষিত দেশ ও জাতি গঠনের এক আলোকিত অভিভাবক অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদ। আজ ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার এই মহিয়সী নারীর দ্বিতীয় প্রয়াণ দিবস। এই দেশপ্রেমী মানুষটিকে সিলেটের নারীশিক্ষা বিস্তারে এক অগ্রদূত সৈনিক চিহ্নিত করা যায়। তিনি তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় নারীদের শিক্ষা, ক্ষমতায়ন, নেতৃত্ব ও সম্মান অর্জন নিয়ে নিরলস কাজ করেছেন। অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদ সকল সময় সমাজে মাথা উঁচু করে সম্মানের আসনে নারীসমাজকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। লোভ, ক্ষমতা কিংবা কোনো ধরণের রাজনৈতিক কুঅভিলাস বা অপকর্ম তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে তাঁর সদর্প বিচরণ ছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন তাঁর স্বামী ডা. শামসুদ্দীন আহমদ। ডা. শামসুদ্দীন আহমদ শহিদ হয়ে যাওয়ার শোককে তিনি শক্তিতে পরিণত করেছিলেন তাঁর আদর্শকে সমুন্নত রাখতে, সমাজকে সুন্দর করে সাজাতে। সুন্দর সমাজ গঠনই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। আমৃত্যু তিনি মানুষের কল্যাণ সাধন করে গেছেন।
পশ্চাৎপদ সমাজে অজ্ঞতা, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার, গোড়ামি এবং রক্ষণশীলতার প্রভাবে পুরুষ প্রধান সমাজ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নারীসমাজের প্রতি উপেক্ষা ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের অনেক যুগেও কোন পরিবর্তন আসেনি। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে একটি নবজাগরণ প্রচলিত সমাজের রক্ষণশীলতা, কুসংস্কার ও ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীজাতির উপর অযৌক্তিক কঠোর বিধিবিধান চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ আন্দোলনের জন্ম দেয়। সিলেটের নারীসমাজও এই নারী জাগরণের প্রভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এই প্রভাবকে যথাযথ ভাবে বিশ্লেষণ করতে গেলে যাঁদের অবদান স্বীকার করতে হয় যাদের নাম কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করতে হয়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন আলোকিত মানুষ অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদ।
হোসনে আরা আহমদের জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ। বাবা আইনজীবী আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী তাঁর স্কুলে পড়ার সময় মারা গেলেন। শিক্ষা অনুরাগী মাতা মুহিবুন্নেসা চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় এক অতিরক্ষণশীল সময়ে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। প্রথমে তিনি মিশনারি স্কুল তারপর তাঁর সময়ে ক্লাসের একমাত্র মুসলিম নারী হিসাবে কৃতিত্বের সাথে সিলেট সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স ও তারপর সিলেট সরকারি মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন। ‘উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে নারীদের শিক্ষাগত মান বাড়াবার’ মায়ের এই অভিপ্রায়ে তিনি সেই ব্রিটিশ আমলে সুদূর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ক্লাসে ভর্তি হন। উল্লেখ্য, তিনিই প্রথম সিলেটের মুসলিম নারী, যিনি মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় এই স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পান। সেই সময়ে ১৯৪৭ সালে ডা. শামসুদ্দিন আহমেদের সাথে তাঁর বিয়ে হয় এবং কলকাতার দাঙ্গার জন্য ক্লাস শেষ হলেও পরীক্ষা বন্ধ থাকে এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।
১৯৫০ সালে স্বামীর সাথে ঢাকায় থাকার সময়ে সিলেটের সরকারি মহিলা কলেজ পাকিস্তান সরকার বন্ধ করে দেয়। সিলেটের শিক্ষানুরাগী মানুষ এটা মেনে নিতে পারেননি। বেসরকারিভাবে কলেজ শুরু করার তৎপরতা শুরু হয়। তখনকার নারীনেত্রী জোবেদা রহিমের আহ্বান ও অনুরোধে হোসনে আরা আহমদ ঢাকা থেকে কর্তব্যের টানে চলে এলেন সিলেটে। কোলে তখন এক কন্যা ও এক শিশুপুত্র। জোবেদা রহিম বলেছিলেন, আর্থিক সংকটের জন্য রিক্শা ভাড়াও দিতে পারব না। স্বামী ডা. শামসুদ্দীন আহমদের উদার মানসিকতার জন্যই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল এমন কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার।
১৯৫০ সালে সিলেট মহিলা কলেজের প্রথমে অধ্যাপক ও পরে অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই থেকে সিলেট মহিলা কলেজের প্রতিটি সুখ-দুঃখের ইতিহাসে জড়িয়েছেন রয়েছেন তিনি। মাত্র কয়েকজন ছাত্রী নিয়ে ভাড়া করা ছোট ঘর থেকে তাঁর দীর্ঘ আমলে সম্মানিত আসন লাভ করেন। শহরে নারী সমাজের উন্নয়নের সাথে তিনি অধ্যক্ষার গুরুদায়িত্ব পালন করে গেছেন। ১৯৬২ সালে কলেজের জন্য বর্তমানের বাড়তি ও শহরের মাঝখানে চার একর বা বারো বিঘা জায়গা প্রথম বারের মতো কলেজের নিজস্ব সম্পত্তি হিসাবে ক্রয় করা হয় তাঁরই তত্ত্বাবধানে। ১৯৬৩ সালে ছাত্রী নিবাসসহ কলেজটি তাঁর নিজস্ব স্থানে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৪ সালে কলেজটিতে বিজ্ঞানবিভাগ চালু করা হয় এবং ১৯৬৭ সালে বিজ্ঞানবিভাগের জন্য দ্বিতল দালানকোঠা তৈরি করা হয়। ১৯৭০ সালে দ্বিতল ছাত্রী নিবাসের প্রথম তলা নির্মিত হয়; এতে করে সিলেট ছাড়াও অন্যান্য জেলার অভিভাবকগণও নিজের মেয়েদের রাজনীতিমুক্ত পরিবেশে হোস্টেলে রেখে পড়াশোনা করানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তিনি জাতীয় শিক্ষা পরিবেশ কমিটিতে বেসরকারি কলেজগুলোর প্রতিনিধি সদস্য মনোনিত হন এবং সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই প্রক্রিয়ায় রাখার জন্য আপসহীন সংগ্রাম করে যান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করে রাখার জন্য তিনি দৃঢ় ভূমিকা রাখেন। তাঁর সময়েই মহিলা কলেজ ফিরে পায় তাঁর জীবনের আসল চেতনা।
অধ্যক্ষ থাকাবস্থায় বেগম হোসনে আরা আহমদ পকিস্তান আমলে ১৯৬২ সালে আমেরিকা সরকারের সোশ্যালিস্ট এক্সচেঞ্জ পোগ্রামে আমন্ত্রিত হয়ে আমেরিকার ১১টি স্টেইটের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। একই বছর টোকিও এবং হংকং-এ তিনি শিক্ষা সফরে যোগ দেন। নারীশিক্ষার অবদানের জন্য সেই সময় সরকার তাঁকে ‘টমগায়ে কায়েদে আজম’ খেতাব প্রদান করা হয়।
সিলেট মাহিলা কলেজ ছাড়াও তিনি সিলেটের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য তাঁর সময় ও মেধা ব্যয় করেছেন নিরলসভাবে। আম্বরখানা গার্লস হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, আম্বরখানা শিশুস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারের যুবকল্যাণ কেন্দ্রের সভানেত্রী, ব্লু-বার্ড স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসহ তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন। কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের সম্মানিত সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন জাতীয় মাহিলা সংস্থার সভানেত্রী, ফেডারেশন অব ইউনিভার্সিটি উইমেন্স-এর সিলেট শাখার সভানেত্রী, জালালাবাদ অন্ধ কল্যাণ সমিতি, টিবি অ্যাসোসিয়েশন-এর সিলেট এডুকেশন ট্রাস্টের একজন সম্মানিত সদস্য। তিনি ওভারসিজ সেন্টারের পরিচালনা কমিটির একজন ট্রাস্টিও। মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীসমাজের পুনর্বাসনের জন্য নারী পুনর্বাসনের জাতীয় কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছেন।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে ব্যংককে অনুষ্ঠিত ইউনেসকো আয়োজিত শিক্ষা সেমিনারে যোগ দেন। মালেয়েশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থাও তিনি পরিদর্শন করেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দল থেকে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলেও রাজনীতির মোহ তাঁকে আকর্ষণ করতে পারে নাই। তিনি অপরাজনীতির মোহ পরিত্যাগ করে নারীজাতির শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকেন। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন ‘শিক্ষা ছাড়া নারী জাতির এগুনোর আর কোন বিকল্প নেই’। ১৯৮০ সালের ১ মার্চ নতুনভাবে সরকারিকরণের আওতায় আসে সিলেট মহিলা কলেজটি আর ১৯৮২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৪০ বছর শিক্ষকতা শেষে বেগম হোসনে আরা আহমদ অবসর গ্রহণ করেন।
দেশ ও দেশের মানুষের জন্য এই মহিয়সী মহিলা শুধু তাঁর নিজের সময় ও মেধা দান করেননি, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকালে হারিয়েছেন একান্ত আপনজনকে। ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল পাকিস্তানী হায়েনাদের হাতে কয়েকজন সহযোগীসহ নিহত হয়েছেন তাঁর স্বামী ডা. শামসুদ্দীন আহমদ। ডা. শামসুদ্দীন আহমদ যে মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন তাঁর থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে হোসনে আরা আহমদের কর্মস্থল সিলেট মহিলা কলেজটি। এই সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একবার বলেছেন ‘আমার জীবনের যে চরম দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেদিন, ঠিক পরের দিন থেকে আমি আমার কর্মস্থলে যোগ দিয়েছি। এই কবরকে সামনে রেখে প্রথম দিন আমার বুকের ভিতর যে রক্তক্ষরণ হয়েছিল তার থেকে শক্তি সঞ্চয় করেই পথ চলেছি আমি, আমার তো হারাবার কিছু নেই।’
২০১৮ সালের ১৬ জুলাই ৯১ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে তার ছেলে-মেয়ে নাতি-নাতনি পরিবেষ্টিত থেকে না ফেরার দেশে চলে যান। আজ তাঁর দ্বিতীয় প্রয়াণ দিবসে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল। তাঁর আত্মার চির মঙ্গল ও চির শান্তি কামনা করছি। তাঁর শোকাহত পরিবারবর্গের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।
সিলেটের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত সমৃদ্ধ করার মানুষটি ওপারে অনেক অনেক ভালো থাকুন। তাঁর শিক্ষা বিস্তারের আদর্শে দেশ ও সমাজ এগিয়ে চলুক সৃজনশীল সুন্দর দিগন্তে।
তথ্যসূত্র: ডা. জিয়াউদ্দিন আহমদ এবং রেনু লুৎফা’র লেখা।
লেখক: সহ-সভাপতি, সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন।