ধর্ষকদের লাগাম টানবে কে – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ধর্ষকদের লাগাম টানবে কে

প্রকাশিত: ১:০৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৮, ২০২০

ধর্ষকদের লাগাম টানবে কে

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

 

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারি চাঁদ কলেজে (এম সি কলেজ) যে পৈশাচিক ঘটনা কয়েকজন নরপিশাচ ঘটাল তা শুধু ওই কলেজের বহু যুগের ঐতিহ্যকেই খ-িত করেনি, কলঙ্কিত করেছে দেশের ভাবমূর্তিকে। স্নাতক শ্রেণির ছাত্ররা কীভাবে এ ধরনের পাশবিকতা ঘটাতে পারে তা কিন্তু সবারই প্রশ্ন। এই নরদানবদের সবাই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা খন্ডিত কেউ করেননি। তবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। এজাহারনামীয় সব আসামি গ্রেফতার হয়েছে এবং তাদের রিমান্ডে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এক নববিবাহিত দম্পতি কলেজের দৃষ্টিনন্দন ছাত্রাবাস এলাকায় বেড়াতে গেলে অভিযুক্ত নরমুদের দল স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে, যার জন্য তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই ওই পৈশাচিক ঘটনা গোটা জাতির ঘৃণা এবং ক্রোধের কারণ ঘটিয়েছে। প্রতিটি মানুষ নিরাপত্তার হুমকিতে হয়ে পড়েছে উৎকণ্ঠিত। আর এটা যে শুধু এম সি কলেজে ঘটিত একটি মাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা তা নয়, এর কদিন পরই বেগমগঞ্জে ঘটল এক তরুণীর ওপর নারকীয় নির্যাতন। প্রতিদিন পত্রিকায় চোখ বুলালেই বহু ধর্ষণের কুৎসিত ঘটনার খবর পাওয়া যায়। তা ছাড়া বহু ধর্ষণের কথা খবরের অন্তরালেই থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষকরা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী হলেও ধর্ষণ যে শুধু তাদের দ্বারাই হয় তা নয়। ধর্ষকদের এক বড় অংশ বাসচালক, হেলপার, গার্মেন্টকর্মী, বাস্তুহারা টোকাই, স্যুট-কোট পরিহিত অফিসের বড় কর্মকর্তাও, রয়েছে বাড়িওয়ালা এমনকি ধর্মের অভিভাবকত্বের দাবিদার হুজুররাও। আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় সে দলের ছাত্ররা যেমন ধর্ষণে এগিয়ে, বিগত সময়ে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের ছাত্রসংঠন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও একইভাবেই ধর্ষণকান্ডের মগের মুল্লুক সৃষ্টি করেছিল। ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের পত্রপত্রিকা খুললেই এসব খবর পাওয়া যাবে। দুর্ভাগ্যবশত অতীতের সরকার ও তাদের ছাত্রসংগঠন, ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের কঠিন সাজায় আনা বা তাদের লাগাম টানার চেষ্টা করেনি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এদের অনেকেই দল পরিবর্তন করেছে। যে ধারা এখনো চলছে। কয়েক দিন আগে জাতীয় পরিষদের সদস্যরা এই মর্মে দাবি তুলেছেন যে, ধর্ষকদের যেন ক্রসফায়ারে নির্মূল করা হয়। সংসদ সদস্যদের এই দাবি থেকে বোঝা যাচ্ছে ধর্ষণ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং দেশের মানুষ এ অপরাধের ব্যাপারে কতখানি ক্ষিপ্ত এবং উৎকণ্ঠিত। সংসদে এই দাবির আগে ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশনের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী গুরুতর ধর্ষণের শিকার হলে সারা দেশ অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তবে সেটি যে ছিল ধর্ষণের একমাত্র উদাহরণ তা নয়। প্রতিদিন পত্রিকাসমূহের একাধিক পৃষ্ঠায়ই থাকে সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু ধর্ষণের মতো পৈশাচিক খবর। সংসদের এই দাবি উত্থাপনের পরে আর একটি খবরে জানা গেল এক বাড়িওয়ালা সময়মতো বাড়িভাড়া না দিতে পারায় ভাড়াটিয়া মহিলাকে রাতভর তার সঙ্গীদের নিয়ে গণধর্ষণ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্ষণ অপরাধ কেন এভাবে চলছে, কেন এতে লাগাম টানা যাচ্ছে না? একজন আইনজ্ঞ এবং সাবেক বিচারপতি হিসেবে আমার কাছে মনে হচ্ছে নিম্নবর্ণিত কারণগুলোকে দায়ী করা যেতে পারে-

কিছু পুলিশ সদস্যের উদাসীনতা : অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় ধর্ষণ হচ্ছে দ্বিতীয় শীর্ষ অপরাধ যার অবস্থান হত্যার পরপরই। অনেকেই মনে করেন অপরাধ হিসেবে ধর্ষণ হত্যার চেয়েও জঘন্য, কেননা, ধর্ষণের বহু ভুক্তভোগী বহু বছর, এমনকি আজীবন ধর্ষণ-পরবর্তী মানসিক যাতনা ভোগ করে থাকেন। ধর্ষণ যে শুধু শারীরিক নির্যাতনই ঘটায় তা নয়, এর ফলে যে মানসিক নির্যাতন চলে তা অনেক ক্ষেত্রেই অসহনীয়। যে কারণে অনেকেই আত্মহত্যার পথও বেঁচে নেন। তা ছাড়া এইডস, হেপাটাইটিস বিসহ অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধি, গর্ভধারণের আশঙ্কা ছাড়াও ভুক্তভোগীর দুর্বিষহ সামাজিক পরিণতি তো রয়েছেই। কোনো অবিবাহিত নারী ধর্ষিত হলে তার বিয়ের সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায় চলে আসে আর ভুক্তভোগী বিবাহিতা হলে স্বামী কর্তৃক তাকে বিচ্ছিন্ন করার সম্ভাবনাও অনেক। এ অপরাধটি এত জঘন্য হওয়া সত্ত্বেও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়েরের সংখ্যা যেমন কম তেমনি কম হচ্ছে আদালত কর্তৃক শাস্তি প্রদানের সংখ্যা। অনেক পুলিশ কর্মকর্তা একে হালকা অপরাধ মনে করে তেমন তৎপর হন না। শাস্তি প্রদানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্যকে সতর্ক করা যাতে তারা অপরাধ থেকে বিরত থাকে। তাই যখন কোনো অপরাধমনস্ক ব্যক্তি দেখে ধর্ষণ করেও সাজা হয় না, তখন সে অপরাধ করতে ভয় পায় না। আমি হাই কোর্টে বিচারপতি থাকাকালে একদিন পত্রিকায় দেখলাম, নারায়ণগঞ্জে ধর্ষণের ঘটনার কথা জেনেও পুলিশ এজাহার করেনি। জেলা এসপি এবং ঢাকা বিভাগের ডিআইজিকে হাই কোর্টে তলব করলে তারা বললেন, ধর্ষিতার পক্ষে তো কেউ মামলা করেনি। তাদের কথায় অবাক হয়ে বললাম ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী পুলিশ কোনো আমলযোগ্য অপরাধের খবর পেলে তাদের ওপরই এজাহার করার দায়িত্ব বর্তায় অন্য কেউ এজাহার না করলেও। আমি পুলিশের আইজি সাহেবকে তখন নির্দেশ দিয়েছিলাম সব থানায় এ খবর জানিয়ে নির্দেশ দিতে। আইজি সাহেব সব থানায় সে মর্মে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেটা এখন পালিত হচ্ছে কিনা জানি না। বহু ধর্ষিতা এবং তাদের পরিবার অনেক ক্ষেত্রে ভয়ে, অনেক ক্ষেত্রে লজ্জায়, অনেক ক্ষেত্রে সমাজপতিদের চাপে এজাহার করেন না এবং এ কারণেই পুলিশের ওপর অধিক দায় বর্তায় নিজ উদ্যোগে এজাহার করার।
বিশেষ পুলিশ ইউনিট : দেশে বহুকাল থেকেই ধর্ষণ লাগামহীন অবস্থায় থাকার কারণে প্রতিটি থানায় একটি বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত পুলিশ কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ ইউনিট রাখা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট পুলিশদের ধর্ষণ সম্পর্কীয় সব বিষয়ে প্রশিক্ষিত হতে হবে, যেমন ডিএনএ, মেডিকেল জুরিসপ্রুডেন্স মনস্তাত্ত্বিক পরিচর্যা ইত্যাদি বিষয়ে। এসব ইউনিটে মহিলা সংখ্যাধিক্য থাকা বাঞ্ছনীয়।

সাজার হার এত কম কেন? : আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় বাদীকে অপরাধ প্রমাণ করতে হয় যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে। সাধারণত ধর্ষিতা ছাড়া ধর্ষণের কোনো সাক্ষী থাকে না বলে এ অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ দুরূহ ব্যাপার। অতীতে ধর্ষিতার সাক্ষ্য গুরুত্বহীন বলে বিবেচিত হলেও ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের অনুসরণে আমাদের হাই কোর্ট বিভাগ বরিশালের স্মৃতিকণা মামলায় এই মর্মে রায় দেন যে, ধর্ষিতার সাক্ষ্য নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হলে তার একক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা না দেওয়ার কোনো কারণ নেই। আপিল বিভাগও এ রায় বহাল রেখেছেন। তা ছাড়া ধর্ষিতা ধর্ষণের পরপরই যদি ধর্ষণের ঘটনা কারও কাছে ব্যক্ত করেন তাহলে সেই ব্যক্তির সাক্ষ্যও হিয়ারছে বলে বিবেচিত হবে না, বরং গ্রহণযোগ্য হবে। ধর্ষিতা সাধারণ মা-বোন-বান্ধবীসহ নিকটজনদের কাছে ঘটনার কথা বিনাবিলম্বে ব্যক্ত করে থাকেন। এদেরও সাক্ষীর তালিকায় আনা অপরিহার্য। আইনজ্ঞদেরও জানানো দরকার যে এরা হিয়ারছে বিধির ব্যতিক্রম হিসেবে গ্রহণযোগ্য সাক্ষী। অনেকে অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই সাক্ষ্য দিতে ভয় পান। অনেক আসামি সাক্ষীদের প্রতিরোধ করার জন্য ভয় দেখায়, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করে। অনেকে টাকার বিনিময়ে আপস করে। অনেক সময় গ্রামছাড়া করে।

ডিএনএ প্রোফাইল : ১৯৮৪ সালের ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আলেক্স জেফরি ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী মিস পেটেলের সহায়তা নিয়ে ডিএনএ প্রোফাইল আবিষ্কার করেন। ডিএনএ প্রোফাইল, যাকে অকাট্য সাক্ষ্য বলে বিবেচিত করে ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টও বলা হয়, তার আবিষ্কার বহু অপরাধে অপরাধী শনাক্তকরণের এবং সাজা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ঘটনা বলেই বিবেচিত। ডিএনএ রিপোর্ট দ্বারা যেসব অপরাধের অপরাধীকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা এবং তার সাজা নিশ্চিত করা সম্ভব তার মধ্যে ধর্ষণ অন্যতম, কেননা ডিএনএর রিপোর্ট সাক্ষ্য হিসেবে এক রকম অভেদ্য বলেই বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। ডিএনএর জন্য যে শুধু অপরাধীর বীর্যই প্রয়োজন, তা নয়, অপরাধস্থল বা ভুক্তভোগীর দেহে বা পরিধেয় বস্ত্রে ফেলে যাওয়া অপরাধীর বীর্য ছাড়াও লালা, চুল, নখের অংশ চামড়ার ক্ষুদ্র অংশ রক্ত থেকেও ডিএনএ বের করা সম্ভব। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী ধর্ষণের পরপরই গোসল করার কারণে বা তার পরিধেয় বস্ত্র ধুয়ে ফেলা বা ফেলে দেওয়ার কারণে নমুনা রক্ষিত থাকে না। এজন্য পুলিশের উচিত অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভুক্তভোগীকে ডাক্তারি পরীক্ষা এবং ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া, যেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকার এবং হাই কোর্টের সুনির্দিষ্ট আদেশ থাকলে তদন্তকারীরা ত্বরিত ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে বাধ্য থাকবেন। খুন এবং ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিহত করার জন্য ডিএনএ পদ্ধতির বিকল্প নেই বিধায় সরকারের উচিত সরকার নিয়ন্ত্রিত আরও অধিক ডিএনএ গবেষণাগার স্থাপন করা। এ ব্যাপারে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পর্যায়ের সব কর্মকর্তা, পিআইবি কর্মকর্তাসহ যারা অপরাধ তদন্তকার্যে জড়িত থাকেন তাদের ডিএনএ রক্ষা এবং পরীক্ষা পদ্ধতির ওপর মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। শুধু ভুক্তভোগীর দেহ থেকেই নয়, ঘটনাস্থলের আশপাশেও আক্রমণকারীর চুল, নখ, লালা, চামড়ার টুকরা অনেক সময় পাওয়া যায় যাতে ডিএনএ থাকে। ডিএনএ পদ্ধতি ছাড়াও ধর্ষণ কিছুটা হলেও নিশ্চিত করা যায় মেডিকেল জুরিসপ্রুডেন্সে বর্ণিত অন্যান্য পদ্ধতি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। তাই উল্লিখিত পুলিশ কর্মকর্তাদের মেডিকেল জুরিসপ্রুডেন্সও প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। ধর্ষিত মহিলা গর্ভবতী হয়ে গেলে বা যৌনব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও ডিএনএর পরীক্ষার দ্বারা ধর্ষককে চিহ্নিত করে তা সাক্ষীতে আনা সহজ। গণধর্ষণে একাধিক ধর্ষকের বীর্য থাকলেও ডিএনএ পদ্ধতির মাধ্যমে সবাইকে আলাদা চিহ্নিত করা সম্ভব।

সিসি টিভি : পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিটি সড়কে বর্তমানে ক্লোজ সার্কিট টিভি ক্যামেরা বা সিসি টিভি বসানো হয়েছে যার ফলে বিভিন্ন অপরাধীকে সহজেই চিহ্নিত করে তাদের সাজা নিশ্চিত করা যাচ্ছে। ন্যায়বিচার এবং ধর্ষণসহ অন্যান্য গুরুতর অপরাধ কমিয়ে ফেলার স্বার্থে আমাদেরও উচিত যথাসম্ভব বেশি সড়কে সিসি টিভি বসানো।

শালিসকারীদের সাজা : ধর্ষণ হত্যার মতোই একটি আপস-অযোগ্য অপরাধ। কিন্তু তার পরও আপস করে এই গুরুতর অপরাধ থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রবণতা বেশ সচল। এক ধরনের তথাকথিত সমাজপতি মূলত ধর্ষকদের বাঁচানোর জন্য এটি করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা তাদের তথাকথিত শালিসের মাধ্যমে কিছু টাকা ধর্ষকের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সেটি ধর্ষিতাকে দিতে বলেন। অনেক সময় দরিদ্র ধর্ষিতা বা তাদের পিতা-মাতা কিছু টাকা পেয়েই খুশি হয়ে যান। এই বেআইনি সংস্কৃতি বন্ধ করার জন্য প্রয়োজন তথাকথিত সমাজপতিদের, যারা শালিস করে থাকেন, তাদের ফৌজদারি বিচারের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করা। মনে রাখা প্রয়োজন, আপস-অযোগ্য অপরাধে আপসের চেষ্টা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ব্যাপারে মোবাইল আদালতসমূহ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। এমনও দেখা গেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশও দরিদ্র ধর্ষিতাকে মামলা না করে আপসের পরামর্শ দিয়ে থাকে। এমন পুলিশের বিরুদ্ধেও আইনগত এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ধর্ষণ এবং ধর্ষিতা ও তার পরিবারে এর প্রতিক্রিয়ার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া। আরও প্রয়োজন এটা বলা যে, আপস-অযোগ্য অপরাধে আপসের চেষ্টা করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমি হাই কোর্টের বিচারপতি থাকাবস্থায় এ ধরনের বহু আপসকারী সমাজপতি ও পুলিশ কর্মকর্তাকে বিচারের আওতায় এনেছিলাম।

বিলম্বিত বিচার : বিলম্বিত বিচার সব অপরাধের বেলায়ই ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা। তবে ধর্ষণের ক্ষেত্রে এ কথা আরও বেশি প্রযোজ্য। অনেক ধর্ষিতাই বিলম্বের ভয়ে মামলা করেন না। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রতি জেলায় আরও অধিকসংখ্যক নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত প্রতিষ্ঠা যেমন প্রয়োজন তেমনি ধর্ষণের অপরাধ ঠেকাতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলা পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। একজন ধর্ষিতার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা। এ ধরনের সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা আবশ্যক। তবে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় বিলম্বের দুটি বড় কারণ হলো পুলিশি তদন্তে বিলম্ব এবং যথাসময়ে সাক্ষী হাজিরে ব্যর্থতা। ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রতি থানায় বিশেষ ইউনিট করা হলে বিচারের বিলম্ব হ্রাস পাবে।

সাক্ষ্য আইনে পরিবর্তন : একটি প্রচলিত কথা হলো, ধর্ষিত নারী আদালতে সাক্ষ্য দিতে এলে জেরার মাধ্যমে পুনরায় ধর্ষিতা হন। কথাটি অত্যন্ত যৌক্তিক। পৃথিবীর অনেক দেশেই এমন আইন করা হয়েছে যাতে ধর্ষিতার ব্যক্তিগত চরিত্র বা তার ব্যক্তিজীবন বা যৌনজীবন নিয়ে জেরার মাধ্যমে কোনো প্রশ্ন করা না হয়। আমাদের আইনে এ পরিবর্তন অপরিহার্য বলে যারা মনে করেন তাদের যুক্তি খুবই প্রশংসনীয়। এ ছাড়া ধর্ষিতা ধর্ষককে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দেখলে তার মনের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ধর্ষণের বিচারে ধর্ষিতাকে আদালত কক্ষের বাইরে রেখে ভিডিও পদ্ধতির মাধ্যমে তার সাক্ষ্য নেওয়ার পক্ষেও শক্তিশালী যুক্তি থাকায় বহু দেশেই এর প্রচলন করা হয়েছে। আদালতে ধর্ষিতা ধর্ষককে সামনে রেখে সাক্ষ্য দিতে গেলে তার মনে ভয় জাগা স্বাভাবিক। অবশ্য ধর্ষককে আদালতে চিহ্নিত করতে হয় ধর্ষিতাকে। বিচারের শুরুতেই এই উদ্দেশ্যে ধর্ষিতাকে শুধু কয়েক মিনিটের জন্য আদালতে আনা যেতে পারে।

ধর্ষিতা এবং অন্য সাক্ষীর নিরাপত্তা : সব ধরনের মামলায়ই ভুক্তভোগী এবং অন্য সাক্ষীদের ভয়ভীতি বা লোভ দেখিয়ে প্রভাবিত করে মামলার গতি পরিবর্তন করার অপচেষ্টা আমাদের সমাজে বহুলভাবে প্রচলিত আছে বিধায় সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্য কঠোর আইন এবং ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে।

জামিন : জামিন একটি স্পর্শকাতর বিষয়। জামিন-অযোগ্য অপরাধেও জামিন দেওয়া না দেওয়ার ক্ষমতা একান্তই আদালতের, বিশেষ করে উচ্চ আদালতের। আদালতের এ ক্ষমতা কোনো আইন বা পদ্ধতি দ্বারাই খর্ব করা সম্ভব নয়। এমন কোনো আইন প্রণয়ন করা সম্ভব নয় যে আইনে কোনো বিশেষ ধরনের আসামিকে জামিন না দেওয়ার বিধান থাকবে, কেননা তা হবে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং বেআইনি। গবেষণাভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, জামিনে মুক্তি পেয়ে বহু ধর্ষক পুনরায় ধর্ষণ করে অথবা সাক্ষীদের ভয় দেখিয়ে ন্যায়বিচারে অন্তরায় ঘটায়। যেহেতু বিষয়টি একান্তই বিচারক-বিচারপতিদের সিদ্ধান্তের ব্যাপার তাই তাদেরই জামিন দিলে সমাজে কী ধরনের ভয়াল পরিণতি হতে পারে এ কথা গভীর বিবেচনায় এনে যত কম জামিন দেওয়া যায় তাই করা উচিত। এ ব্যাপারে আপিল বিভাগও স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে রায় দিলে তা ফলপ্রসূ হতে পারে। ধর্ষণ মামলায় জামিনের বিরোধিতা করার জন্য নিম্ন আদালতে পিপি, এপিপি এবং উচ্চ আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের আইন কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশ দিতে হবে। তারা জোরালোভাবে জামিনের বিরোধিতা করলে অনেক ক্ষেত্রেই জামিন বন্ধ করা যাবে। ধর্ষণের আসামি যেন আগাম জামিন নিতে না পারে আইন কর্মকর্তাদের সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আগাম জামিন রিমান্ড বন্ধ করে দেয় অথচ ধর্ষণের আসামিদের রিমান্ডে নেওয়া খুবই জরুরি।

সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা : ধর্ষণ কমাতে সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্ষিতার পরিচয় উল্লেখ না করে যত বেশি সম্ভব ধর্ষণের ঘটনা প্রচার করা উচিত যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। একই সঙ্গে তাদের উচিত কোনো পুলিশ কর্মকর্তা ধর্ষণের ব্যাপারে গাফিলতি করলে তাও সবার নজরে আনা। ধর্ষণের অপরাধের শাস্তিপ্রাপ্তদের নামসহ বিস্তারিত প্রাত্যহিকভাবে প্রকাশ করা যাতে ধর্ষণের অভিপ্রায় রয়েছে এমন লোক ভয়ে ধর্ষণ থেকে নিবৃত্ত থাকে। কোনো প্রভাবশালী ধর্ষক প্রভাব খাটিয়ে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর চেষ্টা করলে সংবাদমাধ্যমের উচিত তাদের পরিচয় জনসম্মুখে প্রকাশ করা।

সাজার পরিমাণ : অনেকে মনে করেন, ধর্ষণ, বিশেষ করে গণধর্ষণের একমাত্র সাজা হওয়া উচিত মৃত্যুদন্ড। কঠিন সাজার ব্যবস্থা থাকলে যে অপরাধের সংখ্যা কমে তার প্রমাণ পাওয়া যায় সৌদি আরব, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, আফগানিস্তান, কোরিয়া, মিসর, চীন, ইরান, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশ থেকে। কিন্তু আমাদের আপিল বিভাগ এই মর্মে রায় দিয়েছেন যে, কোনো অপরাধের জন্য বাধ্যতামূলক মৃত্যুদন্ড অর্থাৎ মৃত্যুদন্ড একমাত্র সাজা বেআইনি। তাই বাধ্যতামূলক মৃত্যুদন্ডকে সাজা হিসেবে রেখে কোনো আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। তবে মৃত্যুদন্ডকে অন্য সাজার সঙ্গে, যথা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সঙ্গে বিকল্প সাজা হিসেবে রাখা সম্ভব। বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ ধারায় ধর্ষণের সাজা যাবজ্জীবন কারাদ-। তবে গণধর্ষণের ধর্ষিতার মৃত্যু হলে অথবা গণধর্ষণের ফলে সে আহত হলে যাবজ্জীবন অথবা মৃত্যুদন্ড যে কোনো সাজা দেওয়া যেতে পারে। ৯ ধারার পরিবর্তন করে সব ধর্ষণের সাজাই মৃত্যুদন্ড বা বিকল্পে যাবজ্জীবন করলে তা বৈধ হবে এবং এতে ধর্ষণের সংখ্যা কমতে বাধ্য। এরই মধ্যে দু-একটি দেশ আইন করেছে ধর্ষকদের নপুংসক করার জন্য। আমাদের উচ্চ আদালত সম্ভবত এ ধরনের আইনকে বৈধতা দেবে না। তবে যদি দেয় তাহলে এ ধরনের আইন ধর্ষণের সংখ্যা হ্রাস করতে সহায়ক হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। বহু দেশ যারা আগে মৃত্যুদন্ড বাতিল করে আইন প্রণয়ন করেছিল, তারা আবার মৃত্যুদন্ড বহাল করতে বাধ্য হয়েছে অপরাধ বেড়ে যাওয়ার কারণে।

ডিএনএ ব্যাংক : পৃথিবীর বহু দেশে ধর্ষণের দায়ে দন্ডিতদের ডিএনএ রক্ষণ করা হয়। আমাদের দেশেও এটি করা উচিত।

রাজনীতিবিদদের ভূমিকা : সিলেটের ঘটনার পর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, পুলিশ এবং র‌্যাবের প্রশংসনীয় ভূমিকার কারণে আসামিরা ত্বরিতগতিতে ধৃত হয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো যদি এ ধরনের ভূমিকা পালন করে ধর্ষকদের পক্ষ না নিয়ে তাদের বর্জন করে এবং ধরিয়ে দিতে সহায়তা করে তাহলে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর বখে যাওয়া নেতা-কর্মীদের কাছে এ মর্মে স্পষ্ট বার্তা চলে যাবে যে, তারা সরকারি দলের অনুকম্পা পাবে না আর এ ধরনের বার্তা নিশ্চিতভাবে সরকারি দলের উচ্ছৃঙ্খল সন্ত্রাসী এবং অপরাধমূলক ছাত্রদের দ্বারা ধর্ষণসহ অনেক অপরাধ কমে যাবে।

মাইনরদের দায় : ইংলিশ কমন লতে একটি তত্ত্ব আছে, আইনের ভাষায় যাকে ‘ডলি ইনপেকেস্ক’ বলা হয়। সে তত্ত্ব অনুযায়ী ১০ বছরের নিচ কোনো শিশু অপরাধ করতে অক্ষম। আর ১০ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের বেলায় কথা ছিল তারা অপরাধের তাৎপর্য বুঝতে সক্ষম কিনা তা প্রমাণের দায়িত্ব প্রসিকিউশনের ওপর। পরবর্তীতে ১০-১৪ বছরের শিশুদের ও বয়স্ক ব্যক্তিদের একই পর্যায়ে আনা হয় এই মর্মে প্রমাণ পেয়ে যে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়স্ক বহু বালক বহু ধর্ষণ এবং হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছে। তবে আমাদের দেশের মতো বহু দেশে ১৭-অনূর্ধ্বদের জন্য বিচার প্রক্রিয়া এবং সাজা প্রদানের ব্যাপারে বিশেষ বিধান রয়েছে। এদের বয়স্কদের মতো সাজা দেওয়া যায় না, পাঠাতে হয় কারাগারের পরিবর্তে শোধনাগারে সর্র্বোচ্চ তিন বছরের জন্য। কিন্তু এখানেও দেখা যায় বহু ধর্ষণ এবং খুন করেছে ১৭-অনূর্ধ্বরা। দিল্লিতে নির্ভয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার মূল হোতারা ছিল ১৭-অনূর্ধ্ব যার জন্য তাদের ফাঁসি দেওয়া যায়নি, তিন বছরের জন্য সংশোধনাগারে পাঠানো হয়, যার কারণে বহু আন্দোলনও হয়েছিল। মাইনরদের বিচার প্রক্রিয়া এবং শাস্তির ব্যাপারে বিশেষ ব্যবস্থার আমি বিপক্ষে নই, তবে খুন এবং ধর্ষণের অপরাধে তাদের বয়সসীমা ১৫-তে নামিয়ে আনা বাঞ্ছনীয়, কেননা সে বয়সের অনেকেই খুন ধর্ষণ করে থাকে আর এ বয়সের ছেলেরা যদি জানে তাদের চরম সাজা পোহাতে হবে না তাহলে তারা ধর্ষণ করতে উৎসাহিত হবে।

আশ্রয়দাতাদের দায় : আইন বলে অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পিতা-মাতাও এই শ্রেণিভুক্ত। অথচ এ আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। এম সি কলেজের প্রায় আসামিকেই আত্মীয়দের বাড়ি থেকে ধরা হলেও আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি।

লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।
সুএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল